আমি অক্ষয় কিনা জিজ্ঞেস করেছিলে, জবাব পেয়েছ? বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রশ্ন করেন তিনি।
এক বেদুইন দৌড়ে আসে এবং তার পায়ে সেজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। তিনি ঝুঁকে হাতে ধরে তাকে তুলে দেন এবং বললেন, খোদা তোমার উপর রহম করুন।
তাহলে তো তুমি মৃতকেও জীবিত করতে পার- এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বলল- আল্লাহ আমাকে একটি পুত্রসন্তান দিয়েছিলেন। ছেলেটা মারা গেছে। আমি শুনেছি আপনি মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারেন। আমি বহুদূর থেকে পুত্রের লাশ বহন করে নিয়ে এসেছি। আমি বুড়ো মানুষটার উপর আপনি দয়া করুন, ছেলেটাকে জিন্দা করে দিন। বৃদ্ধ হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
চারজন লোক কাফন প্যাচান একটি লাশ নিয়ে এগিয়ে আসে। লাশটি তার সম্মুখে রাখা হয়। তিনি বললেন, একটি বাতি আন। লাশটি তুলে সবাইকে দেখিয়ে নিয়ে আস, যেন কেউ বলতে না পারে যে, ছেলেটি জীবিতই ছিল।
লাশটি বহন করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখিয়ে আনা হল। তার মুখমণ্ডলের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এক ব্যক্তি বাতি ধরে সবাইকে লাশের মুখমণ্ডল দেখায়। চেহারাটা মৃত মানুষেরই ন্যায় ফ্যাকাশে। চোখ দুটো আধাখোলা। মুখখানা সামান্য হা করা। জনতাকে দেখানোর পর লাশটি নিয়ে আবার তার সম্মুখে রাখা হল। বাজনার লয় পাল্টে গেছে এবং আগের চেয়েও হৃদয়কাড়া হয়ে উঠেছে। তিনি দুবাহু আকাশপানে উঁচিয়ে ধরে উচ্চকণ্ঠে বললেন, জীবন ও মৃত্যু তোমারই হাতে। আমি তোমার পুত্রের পুত্র। তুমি তোমার পুত্রকে কুশ থেকে রক্ষা করেছ এবং আমাকে ক্রুশের মর্যাদা দান করেছ। তোমার পুত্র ও তার ক্রুশ যদি সত্য হয়, তাহলে আমাকে শক্তি দাও, যাতে আমি এই হতভাগ্য বৃদ্ধের পুত্রকে জিন্দা করে দিতে পারি। তারপর লাশের উপরে শূন্যে এমনভাবে হাত ঘুরাতে শুরু করেন, যেন হাত দুটি তার কাঁপছে। কাফনের কাপড়টা ফড় ফড় শব্দ করতে শুরু করে। তিনি শূন্যে আরো বেগে হাত ঘুরাতে থাকেন এবং কাফনও আরো শব্দ করে ফড় ফড় করে উঠে। দর্শকদের অনেকে ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে। মহিলাদের কেউ কেউ হাউমাউ করে চীৎকার জুড়ে দেয়। দৃশ্যটা এ কারণেও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে যে, মৃতকে জীবনদানকারী লোকটির বুকে চারটি তীর ও চারটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে আছে।
কাফনের ভেতরে নড়াচড়া অনুভূত হয়। লাশ উঠে বসে পড়ে। দুহাত কাফনের ভেতর থেকে বের করে আনে। নিজ হাতে মুখমণ্ডল থেকে কাফনের কাপড় সরিয়ে ফেলে এবং চোখ মেলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলে উঠে, আমি কি পবিত্র জগতে পৌঁছে গেছি।
না, জীবিতকারী তাকে ঠেস দিয়ে তুলে দাঁড় করান- তুমি সে জগতেই আছ, যেখানে তুমি জন্ম নিয়েছিলে। যাও, পিতার সঙ্গে বুক মিলাও।
পিতা দৌড়ে গিয়ে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে। অস্থিরচিত্তে পুত্রকে চুম্বন করে আদর দেয়। আবার তাকে ছেড়ে দিয়ে জীবনদানকারীর পায়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। জনতা আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠে। বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায় এবং পরস্পর ফিসফিস করতে শুরু করে। জলজ্যান্ত কাফনে মোড়ানো একটি মৃতদেহ এখন তাদের চোখের সামনে হাঁটছে। মরা মানুষ জীবিত হয়ে গেছে!
কিন্তু আমি আর কাউকে জিন্দা করব না- তিনি বললেন-জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। আমি যে খোদার দূত হয়ে এসেছি, তোমাদেরকে শুধু সে কথাটুকু বুঝাবার জন্য এইমাত্র আমি খোদর নিকট থেকে অনুমতি নিয়েছি যে, আমাকে সামান্য সময়ের জন্য এমন শক্তিদান করুন, যাতে আমি মৃতকে জীবিত করতে পারি। খোদা আমাকে সেই শক্তি দিয়েছেন।
আপনি কি যুদ্ধে নিহত সৈনিকেও জীবিত করতে পারেন? সভার মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞেস করল।
না- তিনি জবাব দেন- যারা যুদ্ধ করে মারা যায়, খোদা তাদের প্রতি এতবেশী অসন্তুষ্ট হন যে, তাকে আর তিনি দ্বিতীয় জীবন দান করেন না। পরজগতে তাকে তিনি নরকে নিক্ষেপ করেন। খোদা মানবজাতিকে কাউকে খুন করার জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং এ জন্য সৃষ্টি করেছেন যে, যেভাবে তোমাকে একজন পিতা জন্ম দিয়েছেন, তেমনি তুমিও অন্যকে জন্ম দিবে। এ জন্যই তোমাদেরকে ঘরে চারটি করে বউ রাখতে বলা হয়েছে। নারী ও পুরুষের কাজ একটাই- সন্তান জন্ম দেয়া এবং সেই সন্তান যখন বড় হবে, তার মাধ্যমেও সন্তান জন্ম দেয়ান। এ-ই তো এবাদত।
***
তিনি যখন একের পর এক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন, ঠিক তখন টিলার পেছনে সে জায়গাটিতে লুকিয়ে আছে দুজন লোক, যেখানে রংবেরঙের তাঁবু খাটান রয়েছে। একটি তাঁবুর মধ্য থেকে কতগুলো মেয়ের কথা ও হাসাহাসির শব্দ কানে আসছে। লোক দুজন হলেন সাদিয়ার গ্রামের মসজিদের ইমাম ও তার শিষ্য মাহমুদ বিন আহমদ। মাহমুদ নিশ্চিত, সাদিয়া এখানেই কোথাও আছে। মাহমুদ ধর্মজ্ঞানে পরিপক্ক নয়। খোদার এই দূতের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সে কোন সিদ্ধান্ত স্থির করার যোগ্যতা তার নেই। ইমাম বলেছিলেন, কোন মানুষ মৃতকে জীবিত করতে পারে না। রহস্যময় এই লোকটি জনতাকে কি সব প্রদর্শন করছে, সেদিকে তার কোন ভ্রূক্ষেপই নেই। তিনি বরং কৌশল অবলম্বন করেছেন যে, মানুষ তার কারামত দর্শনে নিমগ্ন থাকুক, আর এই সুযোগে আমি তার ভেদ-রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাই।
ইমাম ও মাহমুদ সাদিয়াকে খুঁজে ফিরছে। তাঁবুগুলোর জায়গাটা অন্ধকার। কেবল তিনটি তাঁবুতে আলো জ্বলছে। তিনটির সবকটির পর্দা, ভিতর-বাহির উভয় দিক থেকে আটকানো। পাহারার বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। দুতিনজন লোক দূরে একস্থানে বসে কথা বলছে। তারা প্রহরী। দেখে ফেললে বিপদ আছে। টিলার অপরদিক থেকে তার কথা বলার আওয়াজ আসছে এবং বাজনা-মিউজিক-এরও শব্দ ভেসে আসছে। তবে এই বাজনার উৎস কোথায় বুঝা যাচ্ছে না।
