ঝুলন্ত পর্দাগুলো একটু নড়ে উঠে। পর্দার আড়াল থেকে এক ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে। আকারে-গঠনে তিনি মানুষ বটে, কিন্তু বাজনামুখর, ভীতিপ্রদ ও আলোক-উজ্জ্বল এই পরিবেশে তাকে কোন এক ঊর্ধ্ব জগতের প্রাণী বলে মনে হল। তার মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত দীর্ঘ। রেশমের ন্যায় চিক চিক করছে চুলগুলো। কাজল কালো। গোলগাল পরিপুষ্ট সুদর্শন মুখমণ্ডল। মুখে দীর্ঘ ঘন দাড়ি। গায়ে সবুজ রঙের চোগা, যা পর্দার-ই ন্যায় তারকাখচিত। আলোয় ঝলমল করছে তারকাগুলো। তেমনি চমক বিরাজ করছে লোকটির দুচোখেও। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সর্বাঙ্গে প্রভাব বিরাজ করছে লোকটির, যাতে জনতা বিমুগ্ধ, বিমোহিত। পাশাপাশি বাজছে মিউজিক, আরো নানারকম গুনগুন শব্দ। মানুষ পূর্ব থেকেই তার অনুরক্ত। এখন বিস্ময়কর এক পরিবেশে তিনি তাদের চোখের সামনে উপস্থিত। এতক্ষণ জনতা উপবিষ্ট ছিল মাথানত করে। এখন তারা আরো অবনত আরো ভক্তিবিগলিত।
তিনি পর্দার সম্মুখে দাঁড়িয়ে দুবাহু উপরে মেলে ধরলেন এবং বললেন
তোমাদের উপর খোদার রহমত নাযিল হোক, যিনি তোমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, যিনি তোমাদেরকে দেখার জন্য চোখ দিয়েছেন, শোনবার জন্য কান দিয়েছেন, বুঝবার জন্য মেধা দিয়েছেন ও কথা বলার জন্য জবান দিয়েছেন। কিন্তু তোমাদেরই ন্যায় কিছু মানুষ যাদের চোখ তোমাদেরই ন্যায়, জবানও তোমাদেরই ন্যায়- তোমাদেরকে গোলামে পরিণত করে খোদার নেয়ামত ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। এখন তোমাদের অবস্থা হল, তোমাদের চোখ আছে বটে, কিন্তু তোমরা কিছু দেখতে পাচ্ছ না, তোমাদের কান আছে সত্য, কিন্তু তোমরা সত্য কথা শুনতে পাচ্ছ না। তোমাদের বিবেক আছে ঠিক, কিন্তু তা মিথ্যা ও অলীক বোধ-বিশ্বাসে পরিপূর্ণ। তোমরা কথা বলতে পার ঠিক, কিন্তু সেই লোকদের বিরুদ্ধে তোমরা একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পার না, যারা তোমাদেরকে গোলাম বানিয়ে রেখেছে। তারা তোমাদেরকে, তোমাদের উট-ঘোড়া ও তোমাদের যুবক সন্তানদেরকে ক্রয় করে নিয়েছে। তারা তোমাদের যুবক পুত্রদের দিয়ে এমনভাবে যুদ্ধ করাচ্ছে, যেমনি মানুষ লড়াই করায় দুটি কুকুর দিয়ে। তারা তোমাদের উট ও ঘোড়াগুলোকে তীর-বর্শা দ্বারা ঝাঁঝরা করিয়ে মেরে ফেলছে। তোমাদের সন্তানদেরকে খুন করিয়ে মরুভূমিতে নিক্ষেপ করছে। আমি সেই চোখ, যা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। আমি সেই মস্তিষ্ক, যা বিশ্বমানবতার কল্যাণ নিয়ে ভাবে এবং আমি সেই জবান, যা মানুষকে খোদার বাণী শোনায়। আমি খোদার জবান।
আপনি কি অক্ষয় যে, আপনি কোনদনি মৃত্যুবরণ করবেন না?- সভার মধ্য থেকে একটি আওয়াজ ভেসে উঠে। সব মানুষ নীরব, নিস্তব্ধ। কেউ কেউ ভয়ও পেয়ে গেছে, লোকটার এতবড় দুঃসাহস যে, তার কথার মাঝে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল? এই অপরাধে সকলের উপর গজব নেমে আসবে না তো!
তুমি পরীক্ষা করে দেখে নাও- তিনি বললেন-আমার বুকে তীর নিক্ষেপ কর।
লোকটির কণ্ঠে ও বলার ভঙ্গীতে যাদুর ক্রিয়া। তিনি আবার বললেন, এখানে যদি কোন তীরান্দাজ থাক, তাহলে আমার বুকে তীর চালাও। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে মজলিসে। তিনি ক্ষুব্ধ ও উচ্চকণ্ঠে বললেন, আমি নির্দেশ দিচ্ছি, উপস্থিত লোকদের মধ্যে কারো কাছে তীর-কামান থাকলে আমার সামনে চলে আস।
চারজন তীরান্দাজ- যারা আশপাশের কোন মহল্লার অধিবাসী নয়- ধীরে ধীরে সামনে অগ্রসর হতে শুরু করে। তারা ভয়ে জড়সড় যেন। তিনি বললেন, গুণে গুণে ত্রিশ কদম এগিয়ে এসে তোমরা আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যাও। তারা তা-ই করে। তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে যায়।
ধনুকে তীর সংযোজন কর।
চারজন তৃনীর থেকে তীর নিয়ে যার যার ধনুকে সংযোজন করে।
আমার হৃদপিন্ডকে নিশানা বানাও।
তারা ধনুক তাক করে নিশানা ঠিক করে।
আমি মরে যাব, সে কথা না ভেবে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তীর ছোড়।
তীরান্দাজগণ ধনুক সরিয়ে নেয়। তারা ভাবে, লোকটি মরে যাবে।
আমার হৃদপিন্ডকে নিশানা বানিয়ে তীর ছোঁড়। তিনি গর্জে উঠে বললেন- অন্যথায় যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, ওখানেই অঙ্গার হয়ে যাবে।
তীরন্দাজগণ ভয় পেয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা ধনুক উপরে তুলে নিশানা তাক করে। জনতা নিথর, নিস্তব্ধ, যেন এখানে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নেই। মিউজিক বাজছে। তার সঙ্গে অদৃশ্য কিছু মানুষের গুনগুন শব্দ কানে আসছে। একসঙ্গে চারটি ধনুক থেকে শা করে চারটি তীর বেরিয়ে যায়। তীরগুলো সব তার ঠিক বুকের মাঝখানটায় গিয়ে বিদ্ধ হয়। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। বাহু দুটো উপরে তোলা, ঠিক আগের মতো। ঠোঁটে তার মুচকি হাসির রেখা।
চারজন খঞ্জরধারী এগিয়ে আস- তিনি বললেন- তীরন্দাজরা চলে যাও।
বিস্ময়াভিভূত তীরান্দাজগণ মাথা নিচু করে ফিরে যায়। অন্য চারজন লোক একদিক থেকে এগিয়ে আসে। তিনি বললেন, খঞ্জর হাতে নিয়ে আমার থেকে পনের কদম দূরে গিয়ে দাঁড়াও। তারা তা-ই করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি নিশানায় খঞ্জর নিক্ষেপ করতে জান?
তারা বলল, হ্যাঁ, জানি।
তিনি বললেন, চারজন একসঙ্গে আমার বুকে খঞ্জর নিক্ষেপ কর।
চার খঞ্জরধারী পূর্ণ শক্তিতে তার গায়ে খঞ্জর নিক্ষেপ করে। সবকটি খঞ্জর তার বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়। তিনি পূর্ববৎ সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। চারটি খঞ্জরের আগা তার বুকে বিদ্ধ। তিনি হাসছেন। ভীড়ের মধ্য থেকে আওয়াজ উঠে, শাবাশ…। মৃত্যুর ফেরেশতা তার হাতে।
