সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর আগুনের গোলা তৈরির কাজ সমাপ্ত হয়েছে। ঠিক এ সময়ে মিসর থেকে সুলতান আইউবীর প্রেরিত বাহিনীও এসে পৌঁছে। তাদের সম্পর্কে নুরুদ্দীন জঙ্গীকে জানানো হয়েছিল, তারা বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সুলতান জঙ্গীও তাদের মধ্যে বিদ্রোহের আভাষও পেলেন না। সুলতান জঙ্গী সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় বিচক্ষণ ও দূরদর্শী মানুষ। তিনিও এই বাহিনীকে এক জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে শত্রুর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুললেন, যেমনটা জ্বালাময়ী ভাষণে উত্তেজিত করে প্রেরণ করেছেন সুলতান আইউবী।
একদিন। সূর্য ডুবে গেছে। খৃষ্টান ম্রাট ও উচ্চপদস্থ সেনা কমান্ডারগণ দুর্গের ভিতরে বৈঠক করছেন। তাদের কথা-বার্তা প্রমাণ করছে, দুর্গ অবরোধ সম্পর্কে তাদের কোন অস্থিরতা নেই। তারা এ-ওজানে যে, সুলতান আইউবী মিসর চলে গেছেন এবং নুরুদ্দীন জঙ্গী এসে তার দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন। বৈঠকের দিন সকালে তারা জানতে পারে যে, মিসর থেকে নতুন সৈন্য এসেছে। এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য তাদের এ বৈঠকের আয়োজন।
সবেমাত্র তাদের আলোচনা শুরু হয়েছে। এমনি সময়ে বিস্ফোরণের ন্যায় একটি শব্দ তাদের কানে আসে। ধসেপড়া ইট-পাথরের পতনের শব্দও শুনতে পায়। খৃষ্টান সম্রাট ও কমান্ডারগণ দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। তারা যে কক্ষে বৈঠক করছিল, তারই সংলগ্ন অন্য একটি কক্ষের ছাদ ফেটে গেছে। একটি ভারী পাথরের আঘাতে ছাদ ফেটে যাওয়ার শব্দ-ই বিস্ফোরণের মত মনে হয়েছিল। তার-ই সন্নিকটে এসে পড়েছিল আরো একটি পাথর। অবস্থা আশংকাজনক মনে করে খৃষ্টানরা সেখান থেকে সরে যায়। তারা বুঝে ফেলেছে। যে, মুসলমানরা মিনজানীক দ্বারা পাথর নিক্ষেপ করছে। তারা দুর্গের প্রাচীরের নিকট গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে; কিন্তু অন্ধকারের কারণে কিছু-ই দেখা গেল না।
এটি নুরুদ্দীন জঙ্গীর তৈরিকরা মিনজানীকের প্রথম পরীক্ষামূলক ব্যবহার। নুরুদ্দীন জঙ্গী মধ্যরাতের পর পুনরায় অভিযান পরিচালনা করেন। তাতে খৃষ্টানদের প্রধান কার্যালয়ের দুটি ছাদ ধসে পড়ে এবং কয়েকটি কক্ষের দেয়াল ফেটে যায়। এই ক্ষয়ক্ষতি তেমন মারাত্মক না হলেও তাতে খৃষ্টানদের মনোবলে ভাটা পড়ে যায়, তাদের মনে ভয় ধরে যায়। দেয়ালের কয়েকটি ফাটল হেডকোয়ার্টারের রক্ষীসেনা ও অন্যান্য আমলাদেরকে সেখান থেকে পালাতে বাধ্য করে। ভোর নাগাদ নুরুদ্দীন জঙ্গীর এই ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এক ভয়াবহ সংবাদ হয়ে নগরীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অথচ, মধ্য রাতের পর নুরুদ্দীন জঙ্গীর নতুন উদ্ভাভিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর তা অকার্যকর হয়ে যায়।
***
সাদিয়া মহল্লার বাইরে যেখানে বকরী চরাত, সে ভূখন্ড এখন এমন এক জনবসতিতে পরিণত হয়েছে, যার চাকচিক্য তথাকার লোকদের চোখে এক স্বর্গীয় পরিবেশ বলে মনে হচ্ছে। সূর্য অস্ত গেছে বেশ আগে। এখন চারদিক অন্ধকার। উৎসুক জনতা পর্বতময় এলাকার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়ে গেছে। তবে কারো কোন টিলার উপরে ওঠার অনুমতি নেই। একধারে বসিয়ে রাখা হয়েছে সবাইকে। যে যেখানে বসেছে, সেখান থেকে নড়াচড়া করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাউকে কোন নির্দেশ দেয়া হচ্ছেনা; শুধু তার ভয় দেখানো হচ্ছে যে, কারো কোন আচরণে যদি তিনি রুষ্ট হন, তাহলে সকলের উপর বিপদ নেমে আসবে। সবাই নীরব-নিশ্চুপ বসে আছে। কারো মুখে রা নেই।
জনতার অবস্থানের খানিক দূরে বড় বড় দুটি পালংক পাতানো। বেশ চমৎকার পালংক। উপরে জাজিম বিছানো। পালংকের পিছনে কতগুলো পর্দা ঝুলছে। পর্দাগুলোর গায়ে চকমক করছে কতগুলো তারকা। এক স্থানে বিশেষ পদ্ধতিতে স্থাপন করা আছে কতগুলো প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলোতে-ই তারকাগুলো ঝলমল করছে। পর্দার পেছনে কতগুলো টিলা, যার পাদদেশে গুহা খনন করছে অপরিচিত মানুষগুলো। টিলার পিছনে কতটুকু সমতল ভূমি। সেখানে নানা রংয়ের তাঁবু পাতানো।
পরিবেশ পরিস্থিতিতে উৎসুক জনতা এত-ই প্রভাবিত যে, তারা পরস্পর কানে-কানেও কথা বলছে না। যে রাতে সাদিয়া অপহৃত হয়েছিল, এটি তার পরের রাত। জনতার সম্মুখে ঝুলিয়ে রাখা পর্দা ধীরে ধীরে দুলতে শুরু করে। পর্দার তারকাগুলো আকাশের তারকারাজির ন্যায় টিমটিম করছে এবং এমন জনতা এ, তিনি এনেমাগকে সবরকম অবতারণ বাজনা শোনা যাচ্ছে, যা মানুষ ইতিপূর্বে কখনো শুনেনি। যাদুর ন্যায় ক্রিয়া করছে বাজনাটি। পার্বত্য এলাকার নীরব রাতে এই বাজনা জনতার অন্তর ভেদ করছে মনে হচ্ছে। এমনও মনে হচ্ছে যে, বাজনার এই তাল জনতার মাথার উপর দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছে, যা দেখাও যাবে ছোঁয়াও যাবে। ফলে মানুষ বারবার উপরে ও ডানে-বায়ে তাকাতে শুরু করে। কিন্তু তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর যাদুময় এই বাজনার সঙ্গে যোগ হয় অন্য এক গুঞ্জন। স্পষ্ট মনে হচ্ছে, বেশকিছু মানুষ একত্রিত হয়ে একই সুরে গুনগুন করে গান গাইছে। তাতে নারী কণ্ঠও আছে। তার সঙ্গে যখন টিলার সামনে ঝুলন্ত লম্বা পর্দাগুলো দুলতে শুরু করছে, তখন মনে হচ্ছে, যেন রাতের এই পরিবেশের উপর মাদকতা নেমে এসেছে।
উৎসুক জনতা এখন সম্পূর্ণরূপে বিমুগ্ধ, অবচেতন। এমন সময়ে কোথাও থেকে বলিষ্ঠ আওয়াজ উঠে, তিনি এসে পড়েছেন, তিনি আসমান থেকে অবতরণ করেছেন। তোমরা তোমাদের দেল-দেমাগকে সবরকম ভাবনা-চিন্তা থেকে শূন্য কর। তিনি তোমাদের দেল-দেমাগে খোদার সত্য বাণী অবতারণ করবেন।
