সুলতান আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গীকে অবহিত করে গেছেন যে, তিনি দুর্গজয়ে কি কি পন্থা প্রয়োগ করেছেন। দুর্গের অভ্যন্তরে কি কি আছে, তাও তিনি জঙ্গীকে জানিয়ে গেছেন। খৃষ্টানদের রসদ কোথায়, পশুপাল কোথায়, জনবসতি কোন দিকে সব-ই তিনি জঙ্গীকে জানিয়ে গেছেন। তিনি গোয়েন্দা মারফত এসব তথ্য জেনেছিলেন। তিনি ভিতরে অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার মিনজানীক ছোট হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। তার বিপরীতে খৃষ্টানদের কাছে আছে বড় বড় কামান, যার গোলা বহুদূর পর্যন্ত। পৌঁছে যায়। আইউবীর মিনজানীকের পাল্লা কম। এ কারণে দুর্গের ফটকেও আগুনের গোলা নিক্ষেপ করা সম্ভব হচ্ছে না। কোন দিক থেকে মুজাহিদরা প্রাচীর ভাঙ্গার চেষ্টা করলে উপর থেকে খৃষ্টানরা জ্বলন্ত কাঠ ও অঙ্গারের ড্রাম গড়িয়ে ছেড়ে দেয়।
নুরুদ্দীন জঙ্গী তার নায়েবদের নিয়ে বৈঠক করেন। তিনি বললেন
সালাহুদ্দীন আইউবী আমাকে বলেছিলেন, তিনি বড় মিনজানীক তৈরি করিয়ে ভিতরে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে পারতেন। কিন্তু সমস্যা হল, ভিতরে মুসলমান বসতিও আছে। তিনি এমন কোন পন্থা অবলম্বন করতে চাচ্ছিলেন না, যাতে একজন মুসলমানেরও ক্ষতি হয়। কিন্তু আমি আইউবীর চিন্তাধারার পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি। আমি এত বড় মিনজানীক তৈরি করার ব্যবস্থা করেছি, যার দ্বারা নিক্ষিপ্ত আগুন ও ভারী পাথর বহু দূর গিয়ে পতিত হবে। তাতে ভিতরে দুএকজন মুসলমানের ক্ষতি হলেও বৃহত্তর স্বার্থে তা মেনে নিতে হবে। আমার বন্ধুগণ! তোমরা যদি কার্কের মুসলমানদের প্রকৃত অবস্থা জানতে, তাহলে বলতে, ওদের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল। ওখানে একজন মুসলমানেরও ইজ্জত নিরাপদ নয়। মুসলিম মেয়েরদের খৃষ্টানদের বিছানায় রাতযাপন করতে হচ্ছে। পুরুষরা বন্দীদশায় বেগার খাটছে। তারা হয়ত এ দুআ-ই করছে যে, হে আল্লাহ! আমাদেরকে তুমি দুনিয়া থেকে নিয়ে যাও। আমাদের অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, তাদের দুর্দশাও তত দীর্ঘতর হতে থাকবে। তাছাড়া আমাদের এ অভিযানে মুসলমানদের ক্ষতি হলেও কজনের আর হবে। যতটুক হবে, সে কোরবানী আমাদের দিতেই হবে। আপনারাও তো মরবার জন্যই এসেছেন। ইসলামকে জিন্দা রাখতে হলে কিছু জীবন হারাতে-ই হবে। আমি বিষয়টা আপনাদেরকে এজন্য অবহিত করলাম, যেন আপনারা কেউ আমার উপর এই অভিযোগ আরোপ করতে না। পারেন যে, আমি একটি দুর্গ জয় করার জন্য নিরপরাধ মুসলমানদেরকে পুড়িয়ে মেরেছি।
না, আমরা কেউ তেমনটা ভাবব না- এক সালার বললেন- এখানে আমরা নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে আসিনি। ফিলিস্তীন মুসলমানদের। আমরা এখানে আমাদের রাসূলের বাদশাহী বহাল করতে এসেছি। প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দাস আমাদের- ইহুদী-খৃষ্টানদের নয়।
আমরা ইহুদীদের এ দাবিও সমর্থন করি না যে, ফিলিস্তীন ইহুদীদের আদি জন্মভূমি- অন্য একজন বললেন- আমরা প্রত্যেকে আগুনে পুড়ে মৃতবরণ করতে প্রস্তুত আছি। আমরা এ যুদ্ধজয়ে আমাদের কলিজার টুকরা সন্তানদেরকেও কোরবান করতে কুণ্ঠাবোধ করব না।
সুলতান নুরুউদ্দীন জঙ্গী দুঠোঁটে মুচকি হাসি টেনে বললেন
আপনারা নিশ্চয় জানেন যে, ফিলিস্তীনকে নিজেদের আবাসভূমিতে পরিণত করার জন্য ইহুদীরা কোন্ কোন্ ময়দানে লড়াই করছে। তারা তাদের ধন- সম্পদ ও বোন-কন্যাদের সম্ভ্রম খৃষ্টানদের হাতে তুলে দিয়েছে এসং তাদের দ্বারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাচ্ছে। তারা তাদের সম্পদ ও মেয়েদের মাধ্যমে, আমাদের মধ্যে গাদ্দার সৃষ্টি করছে। তাদের প্রধান টার্গেট সালাহুদ্দীন আইউবী ও মিসর। মিসরের বড় বড় শহরগুলোতে দুশ্চরিত্রা নারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এরা সবাই ইহুদী কন্যা। দুঃখজনক সত্য হল, আমাদের মুসলিম নেতৃবর্গ ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা ইহুদীদের জালে আটকে গেছে। এবার কাফেররা তাদেরকে আপসে সংঘাতে লিপ্ত করবে। যদি আমাদের হুঁশ ফিরে না আসে, তাহলে ইহুদীরা একদিন না একদিন ফিলিস্তীনকে কজা করে নিবেই। আর মুসলমানরা বুঝতেও পারবে না যে, তাদের সেই পারস্পরিক দ্বন্ধের পিছনে ইহুদী ও খৃষ্টানদের হাত আছে। তা হবে অর্থ, নারী আর মদের প্রতিক্রিয়া, যার প্রভাব ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। আমাদের যদি ভবিষ্যৎ বংশধরকে সম্মানজনক জীবন উপহার দিয়ে যেতে হয়, তবে তার জন্য বর্তমান প্রজন্মের কিছু সন্তানকে কোরবান করতেই হবে। আমি আগামী মাসের নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার আগেই কার্ক জয় করতে চাই। হোক তা কার্কের ধ্বংস্তূপ, থাকুক তাতে মুসলমানদের ভস্মিভূত লাশ। আমরা আর অপেক্ষা করতে পারিনা। ইহুদী-খৃষ্টানদেরকে আমাদের রোম সাগরে ডুবাতেই হবে। এ কাজ আমি আমার জীবদ্দশাতে-ই সম্পন্ন করে যেতে চাই। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমাদের পরে ইসলামের পতাকা গাদ্দার ও ক্রুশ-প্রেমিক মুসলমানদের হাতে চলে যাবে।
নুরুদ্দীন জঙ্গী একদল কারিগরও সঙ্গে রেখেছিলেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কারিগরদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা লম্বা লম্বা খেজুরের ডাল কেটে মিনশনীক তৈরি করে। কারিগররা দিন-রাত অবিশ্রাম মিনজানীক তৈরির কাজে ব্যস্ত। তার পাশাপাশি নুরুদ্দীন জঙ্গী ভারী ভারী পাথরেরও স্তূপ তৈরি করে ফেলেন। তাঁর কাছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর রেখে যাওয়া জ্বালানীও রয়েছে। বিপুল পরিমাণ তরল দাহ্য পদার্থ তিনি সঙ্গে করেও এনেছিলেন।
