কাফেলাটি সবুজ-শোভিত জায়গায় চলে যায়। এলাকাটা চারদিক থেকে টিলায় ঘেরা। একস্থানে অনেকগুলো তাঁবু বসানো আছে পূর্ব থেকেই। তন্মধ্যে একটি তাঁবু বেশ বড়। উৎসুক জনতাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে কেউ দেখতে পেল না পাকি থেকে কে নামল আর কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। ভক্তদের ভীড় দূরে সরে গিয়ে একস্থানে বসে পড়ে। সাদিয়ার গ্রামের মানুষ তাদের থেকে পবিত্র মানুষটির গল্প-কাহিনী শুনতে থাকে। মানুষ যত গোঁয়ার, পশ্চাদপদ ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়, আজগুবি, কল্প-কাহিনীর প্রতি তত দুর্বল হয়। সেই পরিবেশ-ই বিরাজ করছে এখন এখানে।
এ দৃশ্য অবলোকন করছেন ইমামও। দেখছে মাহমুদ বিন আহমদও। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে মাহমুদ। কায়রো থেকে তার এবং তার সহকর্মীদের কাছে নির্দেশ এসেছে, সীমান্ত এলাকায় নতুন এক বিশ্বাসের বিস্তার ঘটছে। সে সম্পর্কে তথ্য নিয়ে রিপোর্ট দাও, সেসমস্ত আসলে কী এবং কারা তার পৃষ্ঠপোষকতা করছে। কায়রো এখনো এ ব্যাপারে কোন তথ্য পায়নি। তার কারণ, রহস্যময় লোকটি এ-যাবত যে কটি এলাকায় গমন করেছে, সেসব এলাকার গুপ্তচররাও তার ভক্তে পরিণত হয়ে গেছে। তারা তার বিপক্ষে কোন কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। সীমান্ত বাহিনীগুলোও তার প্রভাবে প্রভাবিত। পালা। এবার, ইমামের। তিনি যাচাই করে দেখবেন, এসব আসলে কী? ভাওতা? ভন্ডামী? বুযুর্গী? তিনি লক্ষ করছেন, মানুষ শুধু তার গল্প শুনে এত-ই প্রভাবিত হয়ে পড়ছে যে, তারা মসজিদে যাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। লোকটাকে এক নজর দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছে।
ইমাম ও মাহমুদ একস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। সাদিয়ার পিতা এসে তাদের সামনে দাঁড়ান। অস্থিরচিত্তে বললেন, সাদিয়া রাত থেকে নিখোঁজ। তার সঙ্গী মেয়েরা বলছে, রাতে তারা এখানে কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে তাদেরকে সম্মুখ থেকে তাড়া দেয় এবং চলে যেতে বলে। ভয়ে তারা এদিক-সেদিক দৌড় দেয়। এক মেয়ে বলল, সে তাদের পিছনে দুটি লোক দেখেছিল। তারপর কী হয়েছে কেউ বলতে পারেনা।
সাদিয়ার পিতা সাদিয়ার সন্ধানে নেমে পড়ে। মাহমুদও তার সঙ্গ নেয়। এখানে কোথায় পাওয়া যাবে সাদিয়াকে। তারপরও পিতার মন! বেচারা অস্থিরমনে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। মাহমুদও তার সঙ্গে ঘুরছে। হঠাৎ অপরিচিত এক ব্যক্তি তাদেরকে থামতে বলে। তারা থেমে যায়। লোকটি জিজ্ঞেস করে, তোমরা কি কাউকে খুঁজছ? সাদিয়ার পিতা বললেন, হ্যাঁ, গত রাতে আমার একটি মেয়ে হারিয়ে গেছে।
হ্যাঁ, এই একটু আগেই কে যেন আমাকে বলল, তুমি তার বাপ। অপরিচিত লোকটি সাদিয়ার গঠন-আকৃতির বিবরণ দিয়ে বলল- তুমি মেয়েটিকে এখানে খুঁজে পাবেনা। এতক্ষণে সে মিসরের সীমানা পার হয়ে অনেক দূর চলে গেছে হয়ত। গতকাল সন্ধায় আমি একটি ঘোড়া দেখেছিলাম। একটি অতিশয় রূপসী যুবতী মেয়ে তার সঙ্গী মেয়েদের থেকে সরে ঘোড়াটির কাছে চলে যায়। আরোহী ঘোড়ার কাছেই দাঁড়ানো ছিল। মেয়েটি তার সঙ্গে কথা বলে। আরোহী ঘোড়ায় চড়ে কয়েক পা সরে আড়ালে চলে যায়। মেয়েটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার পিছনে পিছনে চলে যায়। নিকটে গিয়ে সে নিজেই আরোহীর সামনে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। আরোহী ঘোড়া হাঁকিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। আজ কে একজন আমাকে বলল, মেয়েটি তোমার কন্যা। এখন আর ওকে তালাশ করে লাভ নেই।
সাদিয়ার পিতার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। মাহমুদ ভাবে ভিন্ন কিছু। সে গোয়েন্দা। তার বিশ্বাস, লোকটি জ্বলন্ত মিথ্যা কথা বলছে। তার বক্তব্যের আগাগোড়া পুরোটাই অসত্য। ঘটনাটা দেখেছে যখন সে একা, তাহলে অন্য কেউ কি করে তাকে বলল, মেয়েটি কার কন্যা? গোয়েন্দাদের বিশেষভাবে এই প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যে, কারো কথা সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করবে না এবং প্রথম প্রথম যে কাউকে সন্দেহের চোখে দেখতে হবে।
মাহমুদ অপরিচিত এই লোকটির পিছু নেয়, লোকটি ভীড়ের মধ্যদিয়ে টিলার পিছনে চলে যায় এবং অসংখ্য তাঁবুর কোন একটির মধ্যে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যায়। মাহমুদ নিশ্চিত, সাদিয়া এসব ভাবুর-ই কোন একটিতে আছে এবং তার অপহরণে এই লোকটির হাত আছে। লোকটি সাদিয়ার সেই কাষ্টমারদেরও একজন হতে পারে, যারা এক পর্যায়ে সাদিয়ার পিতাকে মেয়ের অপহরণের হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু সাদিয়ার পিতা লোকটাকে চিনেনি। সাদিয়ার পিতা যাতে মেয়েকে খুঁজে না বেড়ায়, সেজন্য লোকটি তাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।
মাহমুদ ইবনে আহমদ গভীরভাবে ভালবাসে সাদিয়াকে। সে মেয়েটিকে উদ্ধার করার প্রত্যয় নেয়। মসজিদে গিয়ে ইমামকে বিষয়টি অবহিত করে। ইমাম গোয়েন্দা বিভাগের একজন বিচক্ষণ কর্মকর্তা। তিনিও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই গরীব লোকটিকে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে। মাহমুদ এলাকায় অবস্থানকারী দুগোয়েন্দার কথা উল্লেখ করে বলে, আমি সাদিয়াকে উদ্ধার করব; এ-কাজে আমার ওদের সাহায্যের প্রয়োজন। কিন্তু কাজটা সহজ নয়। এ মুহূর্তে টিলার অভ্যন্তরে যাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।
***
সূলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী তার বাহিনীকে কার্ক অবরোধের দায়িত্বে নিয়োজিত করেন এবং কিভাবে দুর্গ ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করা যায় ভাবতে থাকেন। তিনি প্রথম দিন-ই তাঁর কমান্ডারকে বলে দেন, যে দুর্গ সালাহুদ্দীন আইউবী জয় করতে পারেননি, তা তোমরাও সহজে পদানত করতে পারবে না। সালাহুদ্দীন আইউবী তো অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখানোর মত মানুষ।
