মাহমুদ তার অভিজ্ঞতা বলে বুঝে ফেলেছে, সাদিয়া দুশমনের ক্রীড়নক নয়। কর্তব্যের পথে প্রতিবন্ধক না হলেও আরো আগেই মাহমুদ মেয়েটিকে এলাকায় নিয়ে যেত। তাছাড়া মসজিদের ইমাম তারই বিভাগের একজন অফিসার, যার উপস্থিতিতে সে কর্তব্যে অবহেলা করতে পারে না। ইমাম তাকে এ-ও বলেছিলেন যে, তুমি আমার সঙ্গেই থাক। মাহমুদের দৃষ্টিতে এটি তার প্রতি তার অফিসারের নির্দেশ।
একদিন হঠাৎ গ্রামে হুলস্থুল শুরু হয়ে যায়। কিছু অপরিচিত লোকের চেহারা চোখে পড়তে শুরু করে। সকলের মুখে একই কথা–তিনি আসছেন। তিনি আকাশ থেকে এসেছেন। মৃতকে জীবন দানকারী আসছেন…।
আজ গ্রামের প্রতিটি মানুষ বেজায় খুশি। তারা বলছে, তাদের উদ্দেশ্য পূরণকারী আসছেন।
সাদিয়া দৌড়ে আসে। মাহমুদ বিন আহমদকে বলে, শুনেছ, তিনি আসছেন। তুমি কি জান, আজ আমি তার কাছে কি চাইব? আমি তাকে বলব, মাহমুদ যেন আমাকে এখান থেকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যায়। তারপর তুমি আমাকে নিয়ে যাবে।
মাহমুদ কোন জবাব দিতে পারল না। এখনও সেই রহস্যময় লোকটিকে দেখেনি সে। মাহমুদের ডিউটি এলাকায় এই প্রথমবার-ই আসছেন তিনি। তার কেরামতের কাহিনী এ এলাকার মানুষ শুনেই আসছে শুধু।
মাহমুদ বাইরে বেরিয়ে পড়ে। অপরিচিত লোকদের মধ্যে তার দুজন গোয়েন্দা সহকর্মী দেখতে পায়। তাদের কর্মস্থল অন্য এলাকা। মাহমুদ তাদেরকে এখানে কেন এসেছে জিজ্ঞেস করে। তারা বলে, আমরা গায়েবজানা লোকটিকে দেখতে এসেছি। তবে তারা এসেছে গুপ্তচর হিসেবে নয়। তারা লোকটির দ্বারা চরমভাবে প্রভাবিত। তারা কোথাও লোকটির কারামত দেখেছে। সেই কাহিনী তারা মাহমুদের কাছে এমনভাবে বিবৃত করে, যেন এতে তাদের বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। তাদের বিবরণে মাহমুদও প্রভাবিত হয়ে পড়ে। মাহমুদের এ দুসহকর্মী গায়েবজানা লোকটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। মাহমুদ ভাবে, আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গোয়েন্দারা যার দ্বারা প্রভাবিত হয়, সে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে পারে না।
সাদিয়া যেখানে উট-বকরী চরানোর বাহানা দেখিয়ে মাহমুদের সঙ্গে মিলিত হত, মাহমুদ সেই সবুজঢাকা এলাকায় চলে যায়। কিন্তু এখন সেখানে ভিন্ন পরিবেশ। দুব্যক্তি দূরে থাকতেই তাকে থামিয়ে দেয় এবং বলে, খোদার প্রেরিত পয়গাম্বর আসছেন। এ জায়গা তার জন্য পরিস্কার করা হচ্ছে। তিনি এখানে অবস্থান করবেন।
মাহমুদ দূর থেকে তাকিয়ে দেখে, টিলার ভিতরে গুহামত কি যেন তৈরী করা হচ্ছে এবং জায়গাটা সমতল করা হচ্ছে। এখন সেখানে কারো যাওয়ার অনুমতি নেই। গ্রামের মানুষ কাজ-কর্ম ত্যাগ করে সেদিকে ছুটছে আর নির্দিষ্ট স্থানে এসে জড়ো হচ্ছে। জায়গাটা পরিচ্ছন্ন করা ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা পালাক্রমে এসে এসে জনতাকে আগন্তুকের অলৌকিক কাহিনী শোনাচ্ছে। মানুষ আনন্দিত ও অভিভূত হচ্ছে।
রাতেও মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটির প্রতি তাদের ভক্তি বিশ্বাসের অবস্থা এই যে, সেদিন তারা মসজিদে যাওয়ার কথাও ভুলে যায়। পরদিন ভোর হতে না হতেই মানুষ আবার সেখানে সমবেত হতে শুরু করে। রাতে আপরিচিত লোকদের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। তারা সেখানে গর্তও খনন করছিল। তাদের সঙ্গে কয়েকটি উটও আছে, যেগুলো মালামাল দ্বারা বোঝাইকরা। মালপত্র নামানোর কাজ শুরু হয়। তার মধ্য থেকে অনেকগুলো তবু বেরিয়ে এল। তারা তাঁবুগুলো স্থাপন করতে শুরু করে।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। তারপর রাত। অন্ধকার রাত। তিনি অন্ধকার রাত ছাড়া মানুষকে সাক্ষাৎ দেন না। সন্ধ্যার পরও মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। উৎসুক জনতার একধারে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো মেয়ে। তাদের মধ্যে আছে সাদিয়াও।
মেহমানদের জন্য যে জায়গাটা পরিস্কার করা হচ্ছিল, সেখানে প্রদীপ জ্বলছে। সাদিয়া যে মেয়েদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, দুজন লোক তাদের পিছনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েগুলো তাদের দেখেনি। সম্মুখে আছে তিন-চারজন। এরা অপরিচিত। মেয়েদের কাছে এসে তারা বলে উঠে, এই,তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তারা মেয়েগুলোকে সরাবার জন্য তাড়া দেয়। মেয়েরা ছুটে পালাতে উদ্যত হয় এবং এক একজন এক একদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একজন পিছন থেকে সাদিয়ার গায়ের উপর কম্বল ছুঁড়ে মারে। শক্ত দুটি বাহু দ্বারা তার কোমর ঝাঁপটে ধরে। তারপর কম্বল পেছানো অবস্থায় কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত কেটে পড়ে। এক তো অন্ধকার। দ্বিতীয়ত সঙ্গী মেয়েরা যার যার মত পালিয়ে গেছে। তাই সাদিয়ার অপহরণ ঘটনা দেখেনি কেউ।
পরদিন ভোরবেলা। চারণভূমি অভিমুখে মানুষের ঢল নেমেছে যেন। জনতার বিশাল এক মিছিল এগিয়ে চলছে চারণভূমির দিকে। মিছিলের সম্মুখে ষোল-সতেরটি উট। প্রতিটি উটের উপর একটি করে পালকি। প্রতিটি পালকি পর্দা দ্বারা ঢাকা। তার কোন একটিতে তিনি উপবিষ্ট। সামনে বাজছে দফ ও সানাই। দফ-সানাইয়ের বাজনার তালে গুনগুন করে কি যেন গাইছে কিছু মানুষ। উটগুলোর ঘাড়ে ঝুলন্ত বড় বড় ঘন্টার আওয়াজ সেই বাজনার-ই অংশ বলে মনে হচ্ছে। জনতার এত বিপুল সমাগম, কিন্তু কোন হৈ হুল্লোড়, চেঁচামেচি নেই। নিঝুম-নীরব এগিয়ে চলছে সকলে। এটি মুরীদ ও ভক্তদের মিছিল। এরা কোথা কোথা থেকে পীর সাহেব-এর পিছনে পিছনে হেঁটে চলছে। এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেন পালকি বহনকারী উটটি আকাশ থেকে অবতরণ করছে।
