তৎকালের ঐতিহাসিক আসাদুল আসাদী লিখেছেন, সুলতান আইউবীর ভাষণ মুসলিম সৈনিকদের অন্তরে তীরের ন্যায় গেঁথে যাচ্ছিল। তাদের চেহারা রক্তিম হয়ে ওঠে এবং তারা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। তাদের হৃদয় থেকে বিদ্রোহের আগুন নিভে যেতে শুরু করে। সুলতান আইউবীর উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায়।
সালতানাতে ইসলামিয়ার মুহাফিজগণ! তোমাদের তরবারীগুলো ভোতা করে দেয়ার জন্য খৃস্টানরা তাদের মেয়েদের ইজ্জত ও হাশীশ ব্যবহার করছে। তোমরা হয়ত জান না, খৃস্টানরা তাদের একটি মেয়ের ইজ্জত বিলিয়ে এক হাজার মুজাহিদকে বেকার করে তুলছে। একটি মেয়েকে দিয়ে আমাদের হাজার মেয়ের চরিত্র নষ্ট করছে। তারা তোমাদের মাঝে একটি চরিত্রহীনা মেয়ে ঢুকিয়ে আমাদের হাজার হাজার মেয়ের চরিত্র বিনষ্ট করছে। তোমরা যাও, আপন বোন-কন্যাদের ইজ্জত রক্ষা কর। তোমরা সেই কার্ক অভিমুখে রওনা হচ্ছ, যেখানে পবিত্র কুরআনের পাতা ছিন্নভিন্ন পড়ে আছে ও কাফিরদের পায়ে দলিত হচ্ছে। যেখানে তোমাদের মসজিদগুলো খৃস্টানদের শৌচাগারে পরিণত হয়েছে। যে খৃস্টানরা তোমাদের ভয়ে থরথর করে কাঁপত, ওখানে তারা তোমাদের নিয়ে ঠাট্টা করছে। শোষক তোমরা জয় করেছিলে; কার্কও তোমাদের-ই জয় করতে হবে।
সুলতান আইউবী বাহিনীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করেননি যে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। তিনি কারো ব্যাপারে সংশয়-সন্দেহের ইঙ্গিতও করেননি। তার স্থলে তিনি বাহিনীর চেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধকে উত্তেজিত করে তোলেন, যার ফলে যে বাহিনী এতক্ষণ এই ভেবে বিস্মিত ছিল যে, এত সাত সকালে কেন আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হল, এখন তাদের বিস্ময়ের কারণ হল, কেন আমাদেরকে এক্ষুণি কার্কের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে না!
সুলতান আইউবীর ভাষণের পর সমস্ত বাহিনী এখন উত্তেজিত। তিনি ঊর্ধ্বতন ও অধঃস্তন কমান্ডারদের ডেকে পাঠান। তারা এলে তিনি তাদেরকে রওনা হওয়া সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বাহিনীকে যে পথে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন, সেটি সেই রাস্তা থেকে অনেক দূরে, যে পথে রণাঙ্গনের বাহিনী ফিরে আসছে। সুলতান আইউবী যে কমান্ডারদেরকে কার্ক থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাদেরকেও রওনাকারী বাহিনীর সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। তাদেরকে তিনি আগেই গোপনে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন। বাহিনী যখন রওনা হওয়ার নির্দেশ পায়, তখন সৈন্যদের তাকবীর ধ্বনিতে কায়রোর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে। আবেগের অতিশয্যে জ্বলজ্বল করে ওঠে সুলতান আইউবীর মুখমণ্ডল।
বাহিনী যখন সুলতান আইউবীর দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়, তখন তিনি একজন দূতকে পয়গাম দিয়ে সেই ছাউনীর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন, যেখানে রণাঙ্গন থেকে আগত বাহিনী অবস্থান নিয়ে আছে। দূতকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার নির্দেশ দেয়া হয়। বার্তা হল, পয়গাম প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীকে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা করাও।
পথের দূরত্ব ছিল আট-দশ মাইল। দূত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তৎক্ষণাৎ বাহিনী রওনা হওয়ার নির্দেশ পায়। সূর্যাস্তের পর বাহিনীর অগ্রগামী ইউনিট কায়রোতে ঢুকে পড়ে। পেছনে পেছনে ঢুকে পড়ে অন্যান্য ইউনিটও। তাদেরকে থাকার জন্য সেই স্থান দেয়া হয়, যেখানে গতরাত পর্যন্ত কার্কের উদ্দেশ্যে রওনাকারী বাহিনী অবস্থান করছিল। কমান্ডাররা সৈন্যদেরকে অবহিত করে যে, এখানকার বাহিনীকে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এরা ছিল ক্ষুব্ধ উত্তেজিত। আলী বিন সুফিয়ান এদেরকে ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছেন।
সুলতান আইউবী পরম বুদ্ধিমত্তার সাথে বিদ্রোহের আশংকাও দূর করে দেন এবং গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাও নিঃশেষ করে দেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কমান্ডার ও সেসব সেনা কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান, যারা সীমান্ত বাহিনীগুলোর জিম্মাদার। সীমান্তে কত সৈন্য আছে এবং কোন্ কোন্ স্থানে আছে জেনে নিয়ে তিনি সে পরিমাণ সৈন্য সকাল সকাল যথাস্থানে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। সুলতানকে অবহিত করা হয়েছিল যে, সীমান্ত বাহিনীগুলো দেশ থেকে খাদ্যদ্রব্য ও সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র বাইরে পাচার করার ব্যাপারে দুশমনের সহযোগিতা করছে। সুলতান আইউবী এই বাহিনীগুলোর কমান্ডারকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন এবং সীমান্ত থেকে প্রত্যাহৃত বাহিনীগুলো সম্পর্কে নির্দেশ দেন, যেন তাদেরকে ওখান থেকেই রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
***
সাদিয়া দুবেলা মসজিদে ইমামকে খাবার দিয়ে যায়। মাহমুদ বিন আহমদ শিষ্য পরিচয় নিয়ে ইমামের নিকট থেকে ধর্মশিক্ষা অর্জন করছে। সাদিয়া যে চারণভূমিতে বকরি চরায়, মাঝে-মধ্যে সেখানেও যাওয়া-আসা করে সে। ওখানে টিলা আছে। জায়গাটা সবুজ-শ্যামল। পানির অভাব নেই। এলাকাটা লোকালয় থেকে খানিক দূরে।
সাদিয়া মাহমুদকে নিজের মোহাফেজ ভাবতে শুরু করেছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, মাহমুদ তাকে কাফেরদের হাত থেকে রক্ষা করবেই। কিন্তু মাহমুদ, এখন-ই তাকে নিজ গ্রামে নিয়ে যেতে রাজি হচ্ছে না। সাদিয়া মাহমুদকে এমনও বলে যে, তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে রেখে এস, তারপর বিদ্যা অর্জন কর। মাহমুদ তাকে বলতে পারছে না যে, তার বাড়ি মিসরের অন্য প্রান্তে, যেখানে ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায় না।
