গন্তব্যে পৌঁছে যান সুলতান আইউবী। মুহূর্ত বিলম্ব না করে তিনি মিসরের অস্থায়ী সেনা প্রধানকে তলব করেন। আল-ইদরীসকেও ডেকে পাঠালেন। সেনাপ্রধান সুলতান আইউবীকে দেখে ভয় পেয়ে যান। সুলতান আল ইদরীসের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। আল-ইদরীস বললেন, আমার ছেলেরা যদি যুদ্ধের ময়দানে নিহত হত, তাহলে আমি আনন্দ পেতাম। কিন্তু আফসোস, ওরা নিহত হল প্রতারণার শিকার হয়ে। তিনি বললেন, এখন পুত্রদের বিরহে মাতম করার সময় নয়। আপনি নিশ্চয়ই আমাকে অন্য উদ্দেশ্যে তলব করেছেন। বলুন, হুকুম কী?
ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান ইসলামের জন্য নিবেদিত মুসলমান। সুলতান আইউবী তাঁদের দুজনের নিকট থেকে কায়রোর আভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট নেন এবং জিজ্ঞেস করেন, আপনাদের দৃষ্টিতে প্রশাসনের কোন্ কোন্ কর্মকর্তা সন্দেহভাজন। তিনি বিশেষ করে সেনা কর্মকর্তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তারা সুলতান আইউবীকে কয়েকটি নাম বলেন। তিনি নির্দেশ দিতে শুরু করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশটি হল, সন্দেহভাজন কর্মকর্তাগণ কায়রোয় কেন্দ্রীয় দফতরেই অবস্থান করবে এবং সকল সৈন্যকে সূর্যোদয়ের আগে আগেই অভিযানে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে। আরো কিছু নির্দেশনা দিয়ে সুলতান আইউবী একটি পরিকল্পনা তৈরিতে নিমগ্ন হয়ে পড়েন। আলী বিন সুফিয়ানকেও কিছু পরামর্শ দিয়ে বিদায় করে দেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাক্যাম্পে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। সৈন্যদেরকে সময়ের আগেই জাগিয়ে তোলা হল। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর হেডকোয়ার্টারে ডেকে নেয়া হয়। তারা ভেবে বিস্মিত যে, এ সব কী হয়ে গেল! তারা শুধু এতটুকু জানতে পেরেছেন যে, সুলতান আইউবী এসে পড়েছেন। তারা সুলতানের ঘোড়াও দেখেছিলেন, কিন্তু তাকে দেখেননি। সুলতানও এসে পরিকল্পনামাফিক নিজেকে তাদের থেকে গোপন রেখেছেন।
ভোরের আলো এখনো ফোটেনি। সৈন্যরা সারিবদ্ধ দণ্ডায়মান। পদাতিক ও আরোহীদের সারির পেছনে রসদ ও অন্যান্য সামানপত্রে বোঝাই উটের বহর। সুলতান আইউবী দেশের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এমনভাবে গঠন করেছেন যে, কখনো তাৎক্ষণিক নির্দেশ পেলে যেন এক ঘন্টার মধ্যে রসদ ও অন্যান্য সামানসহ প্রস্তুত হয়ে যায়। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটল এখানেও। বাহিনী রাত শেষ হওয়ার আগেই রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।
সুলতান আইউবী ঘোড়ায় আরোহন করেন। মিসরের ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধানও তাঁর সঙ্গে। সুলতান সারিবদ্ধ দণ্ডায়মান বাহিনীর প্রতি চোখ বুলান এবং একটি সারির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করেন। মুখে তার হাসি হাসি ভাব। তিনি বলছেন, শাবাশ! শাবাশ! ইসলামের বীর সেনানীরা। তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হোক।
সালাহুদ্দীন আইউবীর ব্যক্তিত্বের কাছে সবাই অবনত। সৈন্যরা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে আছে তাদের মহান সেনাপতির মুখের প্রতি। সেই সঙ্গে তার মুচকি হাসি আর প্রশংসামূলক উক্তি সৈন্যদের আরো প্রভাবিত, আরো উজ্জীবিত করে তোলে। মিসরের গবর্নর ও সালারে আজমের সাধারণ সৈন্যদের এতটুকু ঘনিষ্ঠ হওয়াই ছিল যথেষ্ট।
সমগ্র বাহিনী পরিদর্শন করে এবার সুলতান আইউবী সেনাদের উদ্দেশে উচ্চকণ্ঠে ভাষণ দান করেন। তিনি বললেন
আল্লাহর নামে জীবনদানকারী মুজাহিদগণ! তোমরা শোবকের দুর্ভেদ্য দুর্গ- যা ছিল কুফরের সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা- বালির স্তূপ মনে করে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলে। তোমরা খৃস্টানদেরকে মরুভূমিতে বিক্ষিপ্ত করে হত্যা করেছিলে এবং অনেকে জান্নাতুল ফেরদাউসে স্থান করে নিয়েছ। তোমাদের সঙ্গীরা, তোমাদের বন্ধুরা তোমাদের চোখের সামনে শহীদ হয়েছে। তোমরা তাদের লাশ নিজ হাতে দাফন করেছ। তোমরা সেই কমান্ডো শহীদদের কথা স্মরণ কর, যারা দুশমনের সারির মধ্যে ঢুকে পড়ে শাহাদাতবরণ করেছে। তোমরা তাদের জানাযা পড়তে পারনি, দাফন করতে পারনি। এমনকি তাদের মৃতদেহটা পর্যন্ত তোমরা এক নজর দেখতে পারনি। দুশমন তাদের লাশের সঙ্গে কী আচরণ করেছে, তা তোমরা জান। তোমরা শহীদদের বিধবা স্ত্রী ও এতীম সন্তানদের কথা স্মরণ কর, যাদের স্নেহ-মমতা-ভালবাসা আল্লাহর নামে কোরবান হয়ে গেছে। আজ শহীদদের আত্মা তোমাদের ডাকছে। তোমাদের আত্মমর্যাদা ও পৌরুষকে চীৎকার করে আহ্বান করছে। দুশমন কার্ক দুর্গকে এত দুর্ভেদ্য ও মজবুত করে তুলেছে যে, তোমাদের সঙ্গীরা প্রাচীরের উপর থেকে নিক্ষিপ্ত আগুন ভেদ করে প্রাচীর ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে…।
ইসলামের মর্যাদার প্রহরীগণ! কার্ক দুর্গে তোমাদের বোন-কন্যাদের ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে। বৃদ্ধদেরকে পশুর ন্যায় খাটান হচ্ছে। যুবকদেরকে বন্দীশালায় আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু যে আমি খৃস্টানদের পাথরের কেল্লা ভেঙ্গে চুরমার করেছিলাম, সেই আমি মাটির দুর্গ জয় করতে পারলাম না। আমার শক্তি তোমরা। আমার ব্যর্থতা তোমাদেরই ব্যর্থতা।
সুলতান আইউবীর কণ্ঠস্বর আরো উঁচু হয়ে যায়। তিনি দুবাহু ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বললেন
তোমরা আমার বুকটা তীরের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দাও। আমি ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি। কিন্তু আমার জীবন হরণ করার আগে আমাকে অবশ্যই এ সুসংবাদ শোনাতে হবে যে, তোমরা কার্ক দুর্গ জয় করে নিয়েছ এবং সম্ভ্রমহারা মা-বোন-কন্যাদের উদ্ধার করেছ।
