সুলতান আইউবী বলতে বলতে থেমে যান। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, এক্ষুণি আমার ঘোড়া প্রস্তুত কর। তিনি যাদেরকে সঙ্গে নেবেন, তাদের নাম উল্লেখ করে বললেন, চুপিচুপি এদেরকে ডেকে আন এবং বলে দাও তাদের কায়রো যেতে হবে। আমার তবু এখানে এভাবেই থাকবে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে, আমি এখানে নেই।
সুলতান আইউবী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি আপনাদেরকে পরিষ্কার করে বলছি, মিসরের যে বাহিনী বিদ্রোহ করতে চাচ্ছে, আমি তাদের বিরুদ্ধে এ্যাকশনে যাব না। তোমরা কেউ তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে না। আমি এ্যাকশন নেব তাদের বিরুদ্ধে, যারা সেনাবাহিনী ও দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত ও অপদস্ত করার কাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। আমাদের এই বাহিনীই যখন দুশমনের মুখোমুখি হবে এবং দুশমন তীর ছুঁড়ে তাদের অভ্যর্থনা জানাবে, তখন তাদের স্মরণ এসে যাবে যে, তারা আল্লাহর সৈনিক। তখন তাদের মাথা থেকে বিদ্রোহের পোকা বেরিয়ে যাবে। আপনারা যখন নিজ নিজ সন্তানদেরকে তাদের দ্বীনের দুশমনকে দেখিয়ে দেবেন, তখন তাদের চিন্তা চেতনা আপনা-আপনিই জুয়া থেকে সরে গিয়ে জিহাদমুখী হয়ে যাবে। আমি আপনাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বলছি, ইসলাম ও ইসলামী সালতানাতের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষা সেনাবাহিনী ছাড়া সম্ভব নয়। খৃস্টান ও ইহুদীদের প্রত্যয়, তাদের যুদ্ধরীতি ও গোপন তৎপরতার আলোকে আমি বলে দিতে পারি যে, তারা আমাদের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে ইসলামের মূলোৎপাটন করতে চায়। কোন মুসলিম রাষ্ট্র শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। আমাদের আজকের ভুল পদক্ষেপ ইসলামের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেবে। আমি বলতে পারি না, আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর আমাদের বিচ্যুতি, ব্যর্থতা ও সফলতা থেকে লাভবান হতে পারবে কিনা।
মোহতারাম আমীরে মেসের!- এক উপদেষ্টা বলল- আমাদের ভাইয়েরা যদি গাদ্দারীর বিদ্যায়-ই পান্ডিত্য অর্জন করতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ বংশধর গোলাম হয়েই থাকতে বাধ্য হবে। তারা জানবেই না, আযাদী কাকে বলে এবং জাতীয় মর্যাদাইবা কী? আমাদের কাছে কি এর কোন প্রতিকার নেই?
জাতির মন-মস্তিষ্ককে সচেতন কর- সুলতান বললেন- জনগণকে প্রজা বল না। দেশের প্রতিটি মানুষই আপন আপন ক্ষেত্রে রাজা। দেশের একজন মানুষকেও জাতীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত কর না। আমাদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাথায় রাজা ও খলীফা হওয়ার ভূত সাওয়ার হয়েছে। তাই তারা জাতিকে প্রজা বানিয়ে তাদেরকে নিজেদের ক্ষমতা পাকাঁপোক্ত করার কাজে ব্যবহার করতে চায়। মনে রেখ, জাতি শুধু কতগুলো দেহের সমষ্টিই নয়, যাদেরকে তোমরা পশুপালের ন্যায় হাঁকাতে থাকবে। জাতির মধ্যে মেধা মস্তিস্কও আছে। আত্মা আছে। আছে জাতীয় মর্যাদাবোধও। তোমরা জাতির এই গুণগুলোকে শাণিত কর, যাতে তারা নিজেরাই ভাল-মন্দ বিবেচনা করতে শিখে। সচেতন দেশবাসী যদি অনুভব করে যে, দেশে সালাহুদ্দীন আইউবী অপেক্ষা ভাল ও যোগ্য নেতা আছেন, যিনি সালতানাতে ইসলামিয়াকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সমুদ্রের ওপার পর্যন্ত তার বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হবেন, তাহলে যে কেউ আমার পথরোধ করে সাহসিকতার সঙ্গে বলতে পার যে, সালাহুদ্দীন! তুমি মসনদ ছেড়ে দাও, আমরা তোমার অপেক্ষা যোগ্য নেতা পেয়ে গেছি। এমন সচেতনতা ও সাহিসকতা দেশের মানুষের থাকা উচিত। তোমরা দোয়া কর, আমার মধ্যে যেন ফেরাউনী চরিত্র ঢুকে না পড়ে যে, কেউ আমার বিরুদ্ধে কথা বলল আর আমি অমনি জল্লাদ ডেকে তার মাথাটা কেটে ফেললাম। আমার আশংকা, মিল্লাতে ইসলামিয়া এরূপ ফেরাউনদের বলির শিকার হতে যাচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে, এ জাতিকে একদিন প্রজা ও পশুতে পরিণত করা হবে। তখন মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না। থাকলেও থাকবে নামমাত্র। ধর্ম পরিচয়ে তারা মুসলমানই থাকবে, কিন্তু সভ্যতা হবে খৃস্টানদের।
এমন সময়ে এক মোহাফেজ ভেতরে প্রবেশ করে বলল, ঘোড়া প্রস্তুত। যে তিন-চারজন নায়েব সালারকে তলব করা হয়েছিল, তারাও এসে পড়েছেন। সুলতান আইউবী চারজন মোহাফেজ সঙ্গে নিলেন। অন্যদের বললেন, তোমরা আমার এই শূন্য তাঁবুটি পাহারা দাও। কেউ যেন বুঝতে না পারে যে, আমি এখানে নেই। যেসব আমলা তার সঙ্গে যাবে, তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা সাবধানে অমুক স্থানে চলে যাও, আমি যথাসময়ে তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। একজন স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ করে সুলতান আইউবী তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়েন।
***
অন্ধকার মরুভূমি। দ্রুতগতিতে দৌড়াচ্ছে চৌদ্দটি ঘোড়া। সুলতান আইউবী ভোরের আলো ফোঁটার আগেই কায়রো পৌঁছুতে চান। আলী বিন সুফিয়ানকে তিনি সঙ্গে রেখেছেন। চৌকিতে সৈন্যরা ঘুমিয়ে পড়েছিল। জাগ্রত সান্ত্রীরাও টের পায়নি যে, তাদের সালার বেরিয়ে গেছেন। আর কায়রোবাসীদের তো কল্পনায়ও নেই যে, তাদের সুলতান এই মুহূর্তে কায়রো ঢুকে যেতে পারেন।
রাতের শেষ প্রহর। সুলতান আইউবীর কাফেলা কায়রোতে প্রবেশ করে। তাদের কোন সান্ত্রীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হল না। কোন সান্ত্রী ছিলও না সেখানে। সুলতান তার সঙ্গীদের বললেন, এ হল, বিদ্রোহের প্রথম ধাপ। শহরে কোন প্রহরী নেই। বাহিনী ঘুমিয়ে আছে- বেপরোয়া, উদাসীন। অথচ দুটি ময়দানে আমাদের যুদ্ধ চলছে। দুশমনের হামলার আশংকা আছে প্রতি মুহূর্তে।
