আমি প্রস্তুত- মাহমুদ বলল।
তাহলে চলুন-সাদিয়া বলল- আজ রাতেই চলুন।
-মাহমুদ বলে ফেলল-আমি আমার কর্তব্য সম্পাদন না করে যেতে পারব না।
কী কর্তব্য?-সাদিয়া জিজ্ঞেস করে।
মাহমুদ বিন আহমদ অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সাদিয়াকে বলা সম্ভব নয় যে, তার কর্তব্য কী। সে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু সাদিয়া ছাড়বার পাত্রী নয়। মাহমুদের হঠাৎ স্মরণ এসে যায়। বলল, আমি ইমামের কাছে ধর্মশিক্ষা নিতে এসেছি তা সম্পন্ন না করে যাব না।
ততদিন জানিনা আমি কোথায় চলে যাব!-হতাশ কণ্ঠে বলল সাদিয়া।
মাহমুদ বিন আহমদ নিজের কর্তব্যের উপর একটি মেয়েকে প্রাধান্য দিতে পারেনি। তার মনে এই সন্দেহ জাগ্রত হয় যে, এই মেয়েটি দুশমনের চরও তো হতে পারে যে, আমাকে বেকার করে দেয়ার জন্য তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে! মাহমুদ মেয়েটিকে যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজন অনুভব করে।
***
সুলতান আইউবীর বাহিনীর অবস্থান কায়রো থেকে আট-দশ মাইল দূরে। তাকে অবহিত করা হয়েছিল যে, এই বাহিনী উত্তেজিত এবং মিসরের বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত। সুলতান আইউবী সেখানেই ছাউনী ফেলার নির্দেশ দেন এবং নিজে সৈন্যদের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে শুরু করেন। তিনি নিজে সৈন্যদের জযবা যাচাই করে দেখতে চান। তিনি একজন অশ্বারোহী সৈন্যের কাছে গিয়ে দাঁড়ান। সঙ্গে আরো কয়েকজন সৈন্য এসে তার চতুর্পার্শ্বে ভীড় জমায়। তিনি তাদের কুশল জিজ্ঞেস করেন এবং স্বাভাবিক কথা-বার্তা বলতে শুরু করেন। হঠাৎ এক সিপাহী মুখ খুলল। গোস্তাগী মাফ করুন সালারে আজম! এখানে ছাউনী ফেলার প্রয়োজন তো ছিল না। আমরা তো সন্ধ্যা নাগাদ-ই কায়রো পৌঁছে যেতে পারতাম!
তোমরা দীর্ঘদিন লড়াই করে এসেছ-সুলতান আইউবী বললেন-আমি তোমাদেরকে এই খোলা ময়দানে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিতে চাই।
আমরা এসেছি লড়াই করতে, যাচ্ছিও লড়াই করতে।-সিপাহী বলল।
লড়াই করতে যাচ্ছ? কিছুই জানেন না এমন ভান ধরে সুলতান বললেন-আমি তো তোমাদেরকে কায়রো নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে তোমরা তোমাদের বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হবে!
ওরা আমাদের দুশমন-সিপাহী বলল-আমাদের বন্ধুরা বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, এই তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে ওরা আমাদের শত্রু।
খৃষ্টানদের চেয়েও ঘৃণ্য শক্র- আরেক সিপাহী বলল।
কেন সালারে আজম-কায়রোতে গাদ্দারী ও বিদ্রোহ চলছে, একথা কি সঠিক নয়? জিজ্ঞেস করে অন্য এক সিপাহী।
কিন্তু সমস্যা হয়েছে শুনেছি-সুলতান আইউবী বললেন- আমিও দোষীদের শাস্তি দেব।
আপনি সমগ্র বাহিনীকে কী শাস্তি দেবেন? এক সৈন্য বলল- শাস্তি আমরা দেব। আমাদের কমান্ডারগণ আমাদেরকে কায়রোর পুরো ঘটনা শুনিয়েছেন। আমাদের সঙ্গীরা শোবক ও কার্কে শহীদ হয়েছে। কার্ক-শোবকে আমাদের মা-বোন-কন্যাদের সম্ভ্রম লুষ্ঠিত হয়েছে। কার্কে তো এখনো হচ্ছে। আমাদের সঙ্গীরা প্রাচীরের উপর থেকে নিক্ষিপ্ত আগুনে জ্বলে-পুড়ে শহীদ হয়েছে। আমাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস কাফেরদের দখলে। আর আমাদের সেনাবাহিনী কিনা কায়রো বসে মৌজ করছে, আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে! যাদের কাছে শহীদের মর্যাদা নেই, নিজ কন্যার মান-সম্ভ্রমের মূল্য নেই, তাদের বেঁচে থাকারও অধিকার নেই। আমরা খবর পেয়েছি, তারা ইসলামের দুশমনের দোস্ত হয়ে গেছে। যতক্ষণ না আমরা গাদ্দারদের মস্তক ছিন্ন করব, ততক্ষণ শহীদদের আত্মা আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। আমরা যে জখমী ভাইদের সঙ্গে নিয়ে এসেছি, আপনি তাদের প্রতি একটু তাকান। তাদের কারো পা নেই, কারো হাত নেই। এরা কি চিরদিনের তরে এই জন্য পঙ্গুত্ববরণ করে নিল যে, আমাদের সাথী-বন্ধুরা দুশমনের হাতের খেলনায় পরিণত হবে? না, আমরা তা বরদাশত করব না। তাদেরকে আমরা নিজ হাতে শাস্তি দেব।
দেখতে না দেখতে বিপুল সৈন্য সুলতান আইউবীর চারদিকে এসে জড়ো হয়। সকলের চোখে প্রতিশোধের আগুন, মুখে প্রতিবাদী ভাষা। সুলতান আইউবী তাদের এই জোশ এই চেতনা অবদমিত করে তাদের মন ভাঙ্গতে চাইছেন না। তিনি তাদেরকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়ার উপদেশ দিলেন- কোন নির্দেশ দিলেন না।
সুলতান নিজ তাঁবুতে ফিরে আসেন। উপদেষ্টা ও নায়েবদের ডেকে এনে বললেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বাহিনী এখানেই অবস্থান করবে। তিনি বললেন
আমি চাক্ষুস দেখেছি যে, এই বাহিনী মিসর গেলে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে। সেনাবাহিনী যদি পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হয়, তাহলে দুশমন লাভবান হয়। আমি আজ রাতেই কায়রো যাচ্ছি। কেউ যেন টের না পায় যে, আমি এখানে নেই। সৈন্যদের স্পৃহাও দমন করার চেষ্টা করবেন না।
কতিপয় জরুরী নির্দেশ ও পরামর্শ দিয়ে সুলতান আইউবী বললেন
আমাদের কায়রোর যে বাহিনী বিদ্রোহ করতে উদ্যত, আমার দৃষ্টিতে তারা নির্দোষ। জাতির যে যুবক শ্ৰেণী মদ-জুয়া ও মানসিক বিলাসিতায় অভ্যস্ত হতে চলেছে, আমার মতে তাদেরও কোন দোষ নেই। আমাদের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই ভুল তথ্য দিয়ে তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ঐ কর্মকর্তাদেরই ইঙ্গিতে দুশমন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শহরে নগ্নতা ও বিলাসিতার উপকরণ ছড়িয়েছে। দেশের এই নৈতিক অধঃপতন এ কারণেই বিস্তার লাভ করার সুযোগ পেয়েছে যে, আমাদের প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তার দায়িত্ব ছিল এসব প্রতিহত করা, তারাই এ কাজে মদদ যুগিয়েছে। দুশমন তাদেরকে ভাতা দিচ্ছে। যখনই কোন জাতির রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা দুশমনের হাতের খেলনায় পরিণত হয়, তখন সেই জাতির পরিণতি এমনই নয়। আমাদের একদল সৈন্য সুদানের মরুভূমিতে বিক্ষিপ্ত হয়ে না খেয়ে লড়ছে, মরছে আর প্রশাসন তাদের রসদ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে বসে আছে। এসব কি দুশমনের ষড়যন্ত্র নয়, যা সফল করে তুলছে আমাদেরই কর্মকর্তারা আমাদের কোন কোন ভাই মিসরের ক্ষমতা দখল করার স্বপ্ন দেখছে। তারা সর্বাগ্রে সেনাবাহিনীকে জনগণের চোখে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে, যাতে ক্ষমতা দখল করে তারা ইচ্ছেমত শাসন করতে পারে। আমার বন্ধুগণ! আমার ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কোন খায়েশ নেই। আমার বিরুদ্ধবাদীদের কেউ যদি আমাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারে যে, সে আমার লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হবে, তাহলে আমি তার বাহিনীতে একজন সাধারণ সিপাহী হয়ে কাজ করব। কিন্তু এমন লোকটি কে? ওরা অবশিষ্ট জীবন রাজা হয়ে কাটাতে চায়। তার জন্য দুশমনের হাতে হাত মিলাতে হলেও তারা প্রস্তুত। আর আমি আমার জীবদ্দশায়ই জাতিকে এমন এক স্তরে উত্তীর্ণ করতে চাই, যেখানে তারা তাদের দ্বীনের দুশমনের মাথায় পা রেখে রাজত্ব করবে। আমাদের ঐসব লোভী ও গাদ্দার শাসকদের দৃষ্টি বর্তমানের উপর। আর আমার নজর জাতির ভবিষ্যতের প্রতি।
