তারপর আপনি আপনার বয়ানের ধারা পাল্টিয়ে দিয়েছেন?-মাহমুদ জিজ্ঞেস করে।
এক রকম-ইমাম জবাব দেন-এখন আমি দুরকম কথাই বলি। আমার স্বর্ণমুদ্রার নয়-প্রয়োজন শুধু জীবনটার। আমি কর্তব্য পালন না করে মরতে চাই না। গ্রামের বাইরে গিয়ে তোমাকে বা তোমার অন্য কোন সহকর্মীকে খুঁজে বের করাও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সে রাতে আমার দেহরক্ষীরাও আমার কাছে ছিল না। এখন আল্লাহ নিজেই তোমাকে আমার সামনে এনে দিয়েছেন। তুমি আমার কাছে আমার শিষ্য হয়ে থাক। কথা বলবে সরল-সহজ গ্রাম্য মানুষদের মত। গ্রামের চার-পাঁচজন মানুষ এমন আছে, যারা আমাকে সঙ্গ দিতে প্রস্তুত। আমরা যদি কাছাকাছি কোন সীমন্ত রক্ষী বাহিনী পেয়ে যেতাম, তাহলে কাজ হত। তবে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোন কমাণ্ডারের উপর ভরসা রাখাও বিপজ্জনক। দুশমন সোনা-দানা আর নারী দিয়ে অনেককে দলে ভিড়িয়ে নিয়েছে। তারা বেতন খায় আমাদের কোষাগারের, আর কাজ করে দুশমনের।
মাহমুদ বিন আহমদ ইমামের কাছে থেকে যায়। সেদিনই ইমাম তার দুদেহরক্ষীর সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন।
সন্ধ্যার সময় সাদিয়া মসজিদে ইমামের জন্য খাবার নিয়ে আসে। মাহমুদকে দেখে প্রথমে থমকে যায়। তারপর মুচকি হাসে। মাহমুদ জিজ্ঞেস করে, আমার জন্য খাবার আনবে না? সাদিয়া খাবারের পাত্র ইমামের হুজরায় রেখে ছুটে যায়। কিছুক্ষণ পর কয়েকটি রুটি ও এক পেয়ালা বকরীর দুধ নিয়ে আসে।
সাদিয়া চলে যায়। ইমাম মাহমুদকে বললেন, এটি অত্র অঞ্চলের সবচে সুন্দরী মেয়ে। বয়স কম। বুদ্ধিমতীও বটে। মেয়েটির বেচা-কেনার কথা-বার্তা চলছে।
বেচা-কেনা না বিবাহ? বিস্ময়ের সাথে মাহমুদ জিজ্ঞেস করে।
বেচা-কেনা-ইমাম বললেন-তুমি জান না, এদের বিবাহ মূলত ক্রয় বিক্রয়-ই হয়ে থাকে। কিন্তু সাদিয়ার ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে অত্যন্ত সহজ সরলভাবে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের পেরেশান হওয়ার কোন কারণ ছিল না। কিন্তু তার ক্রেতা একজন সন্দেহভাজন মানুষ। লোকটি এখানকার বাসিন্দা নয়। মনে হচ্ছে, যারা আমাকে হুমকি দিয়েছিল, এরা তারাই। তুমি একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে যে, ওরা মেয়েটিকে ওদের রঙে রঙিন করে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। তাই মেয়েটিকে রক্ষা করা জরুরী। তাছাড়া মেয়েটি মুসলমান। সালতানাতের পাশাপাশি আমাদেরকে দেশের মেয়েদের সম্ভ্রমের হেফাজত করাও আবশ্যক। আমি আশা রাখি, এই সওদা হতে পারবে না। সাদিয়ার পিতাকে আমি আমার মুরীদ বানিয়ে রেখেছি। কিন্তু সমস্যা হল, লোকটি গরীব ও নিঃসঙ্গ মানুষ। সমাজের রীতি-নীতি উপেক্ষা করে টিকে থাকার মত শক্তি তার নেই। এক কথায়, জগতে সাদিয়ার মোহাফেজ আমরা ছাড়া আর কেউ নেই।
মাহমুদ ইমামের শিষ্য হয়ে যায়। দিন যেতে থাকে। সাদিয়ার সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ ঘটতে থাকে। মেয়েটি বকরী নিয়ে চারণভূমিতে যায়, মাহমুদও যথাসময়ে সেখানে গিয়ে হাজির হয়। দুজনে কথা হয়, গল্প হয়।
মাহমুদ সাদিয়াকে জিজ্ঞেস করে, ঐ যে কে যেন তোমাকে কিনতে চায়, লোকটা কে?
সাদিয়া তাকে চিনে না। লোকটা অপরিচিত-অন্য এলাকার মানুষ। গরু ও মহিষ ক্রয় করার আগে মানুষ যেভাবে দেখে থাকে, ঐ লোকটাও এসে সাদিয়াকে সেভাবে দেখে গেছে।
সাদিয়ার ভাল করেই জানা আছে যে, সে কারো স্ত্রী হবে না। আরবের কোন বিত্তশালী ব্যবসায়ী-আমীর বা উজীর তাকে নিজের হেরেমে বন্দী করে রাখবে আর কোন পুরুষের স্ত্রীত্বের মর্যাদা না পেয়ে-ই বৃদ্ধা হয়ে মরে যাবে। কিংবা নাচ-গান শিখিয়ে তাকে বিনোদনের উপকরণে পরিণত করবে। মেয়েটি তার গ্রামের সৈন্যদের কাছে এরূপ মেয়েদের অনেক কাহিনী শুনেছে।
একটি অনুন্নত এলাকার বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও সাদিয়া অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। নিজের ভালোমন্দ সম্পর্কে সচেতন সে। প্রথম সাক্ষাতে মাহমুদের মনে স্থান করে নেয়। তারপর যখন বুঝল যে, মাহমুদও তাকে কামনা করতে শুরু করেছে, তখন সে মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে, সে বিক্রি হবে না। মেয়েটি জানত, ক্রেতাদের থেকে রক্ষা পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। একদিন সাদিয়া মাহমুদকে জিজ্ঞেস করে
আপনি কি আমাকে কিনে নিতে পারেন না?
পারি-মাহমুদ জবাব দেয়-কিন্তু আমি যে মূল্য দেব, তা তোমার পিতা গ্রহণ করবেন না।
কত মূল্য দেবেন?
আমার কাছে দেয়ার মত আমার হৃদয়টা ছাড়া আর কিছুই নেই-মাহমুদ জবাব দেয়-জানিনা তোমার হৃদয়ের মূল্য জানা আছে কিনা।
আপনার অন্তরে যদি আমার ভালবাসা থাকে, তাহলে এই মূল্য আমার জন্য অনেক বেশী-সাদিয়া বলল-আপনি ঠিকই বলেছেন যে, আমার পিতা এই মূল্য গ্রহণ করবেন না। কিন্তু আমি একথাও বলে দিব যে, আমার পিতা আমাকে বিক্রি করতে-ই চান না। তার সমস্যা হল, তিনি গরীব এবং নিঃসঙ্গ মানুষ। আমার কোন ভাই নেই। ক্রেতারা তাকে হুমকি দিয়েছে, তিনি যদি তাদের মূল্য গ্রহণ না করেন, তাহলে তারা আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যাবে।
তোমার পিতা এত মূল্য কেন গ্রহণ করছেন না?-মাহমুদ জিজ্ঞেস করে-মেয়েদেরকে বিক্রি করার তো এতদঞ্চলে নিয়ম আছে।
আব্বা বলছেন, ওদেরকে মুসলমান বলে মনে হয়নি-সাদিয়া বলল-আমিও আব্বাকে বলে দিয়েছি, আমি অমুসলিমদের কাছে যাব না। আপনি যদি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে আমি এখনই যেতে রাজি আছি।
