না, সালাহুদ্দীন আইউবী মৃত প্রাণীকে জীবিত করতে পারেন না। মাহমুদ জবাব দেয়।
আমরা শুনেছি, সালাহুদ্দীন আইউবী নাকি জীবন্ত মানুষকে খুন করে ফেলেন! সন্দেহমূলক প্রশ্ন করে সাদিয়া মানুষ এ-ও বলছে, তিনি নাকি মুসলমান এবং আমাদের ন্যায় নামায-কালাম পড়েন?
তোমাকে কে বলেছে যে, তিনি মানুষ খুন করেন? মাহমুদ জিজ্ঞেস করে।
আমাদের গ্রাম দিয়ে অনেক মুসাফির আসা-যাওয়া করে। তারা বলে, সালাহুদ্দীন আইউবী নাকি খুব খারাপ মানুষ। সাদিয়া জবাব দেয়।
তোমাদের মসজিদের ইমাম কী বলেন? মাহমুদ জিজ্ঞেস করে।
তিনি অত্যন্ত ভাল কথা বলেন- সাদিয়া জবাব দেয়। তিনি বলেন, সালাহুদ্দীন আইউবী সমগ্র মিসরে ও সুদানে ইসলামের আলো বিস্তার করার জন্য এসেছেন। তিনি বলেন, ইসলাম-ই আল্লাহ পাকের একমাত্র সত্য দ্বীন।
মাহমুদ বিন আহমদ মেয়েটির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে থাকে। আলোচনা থেকে সে জানতে পারে যে, তার গ্রামে এমন কিছু লোক আসা যাওয়া করে থাকে, যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করে; কিন্তু কথা বার্তা এমন বলে যে, তাতে কিছু লোকের মনে ইসলামের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি হয়ে গেছে। মাহমুদ সাদিয়ার মনের সংশয় দূর করে দিয়েছে এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ও মধুর ভাষায় তার উপর এমন প্রভাব বিস্তার করে ফেলে যে, মেয়েটি অকপটে বলেই ফেলে, আমি এখানে প্রায়-ই বকরী চড়াতে আসি। আপনি এ
পথে আসলে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। মাহমুদ মেয়েটিকে আবেগ ও বাস্তবতার মাঝে ফেলে রেখে তার গ্রামের দিকে রওনা হয়ে যায়।
সাদিয়া একাকি দাঁড়িয়ে ভাবে, লোকটি কে? কোত্থেকে এল? যাচ্ছে-ইবা কোথায়? লোকটির পোশাক অত্র এলাকার বটে, কিন্তু তার গঠন-আকৃতি, তার কথা-বার্তা প্রমাণ করছে সে এখানকার কেউ নয়।
সাদিয়ার সন্দেহ যথার্থ। মাহমুদ অত্র এলাকার মানুষ নয়। বাড়ি তার ইস্কান্দারিয়া। আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ সদস্য। বেশ কয়েক মাস যাবত সে অর্পিত দায়িত্ব পালনার্থে সীমান্তবর্তী পল্লী এলাকায় ঘোরাফেরা করছে। তার থাকা-খাওয়ার ঠিকানা গোপন। সঙ্গে আরো কয়েকজন গুপ্তচর রয়েছে, যারা অত্র এলাকার-ই বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। কদিন পর পর তারা নির্ধারিত গোপন ঠিকানায় একত্রিত হয় এবং প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একজনকে কায়রো পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই আলী বিন সুফিয়ান সংবাদ পাচ্ছেন যে, দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে কী সব ঘটনা ঘটছে।
মাহমুদ বিন আহমদ সাদিয়াকে তার গ্রামের মসজিদের ইমাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। তার কারণ, ইতিপূর্বে দুটি গ্রামের বিভিন্ন মসজিদে সে এমন ইমামের সন্ধান পেয়েছে- যাদেরকে তার সন্দেহ হয়েছিল। এলাকার লোকদের থেকে সে জানতে পারে যে, ইমামরা এখানে নতুন এসেছেন। এর আগে এসব মসজিদে ইমাম ছিলেন-ই না। তারা দুজন-ই জিহাদের বিরুদ্ধে ওয়াজ করেন, কুরআন হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। রহস্যময় সেই লোকটিকে সমর্থন করেন এবং জনসাধারণকে তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। মাহমুদ ও তার দুসহকর্মী মিলে এই ইমামদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে কায়রো পাঠিয়ে দেয়। আর এখন সে যাচ্ছে সাদিয়ার গ্রামের দিকে। তার একথা শুনে বেশ ভাল লেগেছিল যে, সেই গ্রামে ইমাম সুলতান আইউবীর ভক্ত ও ইসলামের জন্য নিবেদিত। মাহমুদ বিন আহমদ সেই মসজিদকে নিজের ঠিকানা বানাবার সিদ্ধান্ত নেয়।
***
মাহমুদ সাদিয়ার এলাকার মসজিদে পৌঁছে ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। নিজের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বলে, আমি ধর্মীয় শিক্ষা লাভের জন্য পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আপনি আমাকে দ্বীনের তালীম দিন। ইমাম তাকে তালীম দেবেন বলে ওয়াদা দেন এবং তাকে মসজিদে-ই থাকার প্রস্তাব করেন। মাহমুদ মসজিদে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় না। সে ইমামকে বললে, দু-তিন দিন পরপর আমাকে বাড়ি যেতে হবে। ইমাম নাম জিজ্ঞেস করলে মাহমুদ নিজের আসল নাম গোপন রেখে অন্য নাম বলে। বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে সে দূরবর্তী কোন সীমান্ত এলাকার কথা বলে। ইমাম মুচকি হেসে বলে উঠলেন, মাহমুদ বিন আহমদ! আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, তুমি তোমার কর্তব্য সম্পর্কে উদাসীন নও। ইস্কান্দারিয়ার মুসলমানরা দায়িত্ব পালনে বড় পাকা।
মাহমুদ সহসা চমকে ওঠে। সে মনে করেছিল ইনি খৃষ্টানদের চর। কিন্তু ইমাম তাকে দীর্ঘ সময় সন্দেহের মধ্যে পড়ে থাকতে দিলেন না। বললেন, অন্তত তোমার কাছে আমার পরিচয় প্রকাশ করে দেয়া উচিত। আমি তোমার ই বিভাগের একজন কর্মকর্তা। আমি তোমার সব সঙ্গীকেই- যারা এ অঞ্চলে কর্মরত আছে-জানি। তোমরা কেউ আমাকে চিননা। আমি আলী বিন সুফিয়ানের সেই স্তরের কর্মকর্তা, যারা দুশমনের উপর দৃষ্টি রাখার পাশপাশি নিজেদের গুপ্তচরদের উপরও নজর রাখে। আমি ইমাম সেজে গুপ্তচরবৃত্তির দায়িত্ব পালন করছি।
তারপরও আমি আপনাকে বিচক্ষণ বলব না-মাহমুদ বিন আহমদ বলল-আপনি যেভাবে আমার সামনে নিজেকে প্রকাশ করলেন, তেমনি দুশমনের কোন গুপ্তচরের সামনেও করতে পারেন।
আমি নিশ্চিত ছিলাম তুমি আমার-ই মানুষ-ইমাম বললেন-প্রয়োজনের তাগিদেই আমি নিজেকে তোমার সামনে প্রকাশ করে দেয়া আবশ্যক মনে করেছি। আমার দুজন রক্ষী আছে। তারা ছদ্মবেশে এই এলাকায় অবস্থান করে। তবে আমার আরো লোকের প্রয়োজন ছিল। ভালোই হল, তুমি এসে পড়েছ। এই গ্রামে দুশমনের সন্ত্রাসীরা আসছে। তুমি নিশ্চয় ঐ লোকটির কথা শুনে থাকবে, যার সম্পর্কে প্রসিদ্ধি আছে যে, সে ভবিষ্যতের সংবাদ বলতে পারে এবং মৃত প্রাণীকে জীবিত করতে পারে। এই গ্রামটিও তার সেই সব অদেখা কারামতের কবলে চলে গেছে। আমি গ্রামবাসীদেরকে প্রথমদিকে বলেছিলাম যে, এর সবই মিথ্যা। কোন মানুষ লাশের ভিতরে জীবন ঢুকাতে। পারে না। কিন্তু তার প্রভাব এতই ব্যাপক যে, মানুষ আমার বিরোধী হয়ে উঠে। আমি সংযত হয়ে যাই। কারণ, আমি এই মসজিদ থেকে বের হতে চাইনা। আমার একটি আচ্ছা এবং একটি ঠিকানার তো প্রয়োজন। এখানকার পথহারা মানুষগুলোকে ইসলামের সোজা রাস্তাও তো দেখাতে হবে। পনের বিশদিন পর রাতে দুজন লোক আমার নিকট আসে। আমি তখন মসজিদে একা। তাদের উভয়েই ছিল মুখোশপরা। তারা আমাকে হুমকি দেয়, আমি। যেন এখান থেকে চলে যাই। তাদেরকে বললাম, আমি অসহায় মানুষ, আমার– আর কোন ঠিকানা নেই। তারা বলল, এখানে থাকতেই যদি চান, তাহলে দারস বন্ধ করে দিয়ে সেই ব্যক্তির কথা প্রচার করুন, যিনি আসমান থেকে এসেছেন এবং আল্লাহর সত্য ধর্ম নিয়ে এসেছেন। আমি তখন ইচ্ছে করলে দুজনের মোকাবেলা করতে পারতাম। অস্ত্র তো সবসময় সঙ্গে-ই রাখি। কিন্তু লড়াই করে কাউকে হত্যা বা নিজে নিহত হয়ে তো আমি কর্তব্য পালন করতে পারতাম না। আমি কৌশল অবলম্বন করি। আমি তাদেরকে নিশ্চয়তা দেই যে, আজ থেকে তোমরা আমাকে তোমাদের-ই লোক মনে কর। তারা বলল, আপনি যদি আমাদের কথামত আজ করেন, তাহলে আপনি দুটি পুরস্কার পাবেন। প্রথমত আপনার জীবন রক্ষা পাবে। দ্বিতীয়ত আপনার অর্থের অভাব হবে না।
