পরিবেশ এতই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠে যে, নিয়ন্ত্রণে রাখা সুলতান আইউবীর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। উত্তেজনার মধ্যেই তিনি আরো কিছু কথা বলে ও শুনে বৈঠক মুলতবী করে দেন। প্রত্যূষে কাফেলা আবার রওনা হয়। সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে চলে তারা। সুলতান আইউবী তার আমলাদের থেকে খানিক আলাদা হয়ে এগুচ্ছেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, আলী বিন সুফিয়ান তার সঙ্গে নেই। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাহিনীকে দুবার কিছু সময়ের জন্য থামানো হয়। রাতেও কাফেলা চলতে থাকে। রাতের প্রথম প্রহর শেষ প্রায়। সুলতান। আইউবী রাতে অবস্থানের জন্য যাত্রাবিরতি দেন। সুলতানের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে আলী বিন সুফিয়ানের আগমন ঘটে।
সারাদিন কোথায় ছিলে আলী! সুলতান জিজ্ঞেস করেন।
গতরাতে আমার মনে একটি সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল- আলী বিন সুফিয়ান জবাবে দেন- তার বাস্তবতা খতিয়ে দেখার জন্য দিনভর বাহিনীর মধ্যে ঘুরে বেড়িয়েছি।
কী, সন্দেহ! বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জানতে চান সুলতান আইউবী।
রাতে আপনি দেখেননি যে, সকল সালার, কমান্ডার ও ইউনিট দায়িত্বশীলরা কিভাবে মিসরে অবস্থানরত বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তাতে আমার মনে সন্দেহ জাগে যে, এরা নিজ নিজ অধিনস্থ সিপাহীদেরও ক্ষেপিয়ে তুলবে। বাস্তবে আমার সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। তারা বাহিনীকে এমন সব কথাবার্তা দ্বারা উত্তেজিত করে তুলেছে যে, গোটা বাহিনীর মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠেছে। আমি সাধারণ সৈনিকদের বলতে শুনেছি যে, আমরা যুদ্ধের ময়দানে আহত হচ্ছি, শহীদ হচ্ছি আর আমাদের সহকর্মী অন্য সৈনিকরা কায়রোতে বসে মৌজ করছে আর ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করার চেষ্টা করছে। আমরা মিসর গিয়ে নিই, আগে তাদেরকে শেষ করে তারপর সুদানে আটকাপড়া বাহিনীকে সাহায্য করব। মহামান্য আমীর! আমরা যদি এ ব্যাপারে আগাম কোন ব্যবস্থা না নিই, তাহলে এই বাহিনীর কায়রো পৌঁছামাত্র গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। আমাদের এই বাহিনী এখন সম্পূর্ণ প্রতিশোধপরায়ণ। সবাই উত্তেজিত। আর মিসরের বাহিনী পূর্ব থেকেই অজুহাতের সন্ধানে রয়েছে।
আমি এ জন্য আনন্দিত যে, অবিরাম যুদ্ধক্লান্ত এই বাহিনীর মধ্যে এমন স্পৃহা সৃষ্টি হয়েছে- সুলতান বললেন- কিন্তু আমাদের দুশমনের একান্ত কামনা যে, আমাদের বাহিনী দুভাগে বিভক্ত হয়ে আপসে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ুক।
সুলতান আইউবী গভীর চিন্তায় ডুবে যান। কিছুক্ষণ পর বললেন
কৌশল একটা পেয়েছি। কায়রো থেকে উল্লেখযোগ্য দূরে থাকা অবস্থায় আমি আমার একজন বিচক্ষণ ও দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন দূত পাঠিয়ে মিসরের বাহিনীকে অন্যপথে কার্ক অভিমুখে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেব। এমনও হতে পারে যে, আমি আগেভাগে গিয়ে বাহিনীকে রওনা করাব। এতে আমাদের সঙ্গে যে বাহিনী আছে, তারা ওখানে পৌঁছে কোন সৈন্য দেখতে পাবে না। বিষয়টা তদন্ত করে তুমি ভালই করেছ আলী। বিষয়টা আমার মাথায় আসেনি।
***
সীমান্তবর্তী পল্লী অঞ্চলের রহস্যময় সেই লোকটি ভক্ত-সহচরদের নিয়ে দলবেঁধে সফর করে বেড়ায়। লোকটি বৃদ্ধ নয়। তার কাজল-কালো, গৌরবর্ণ মুখাবয়ব। মাথায় লম্বা চুল। দুচোখে চাঁদের চমক। দাঁতগুলো তারকার ন্যায় শুভ্র। দীর্ঘকায় সুঠাম দেহ। কথা বললে শ্রোতারা অভিভূত হয়ে পড়ে। সঙ্গে থাকে তার বিপুলসংখ্যক সহচর ও অগণিত উট। তার কাফেলা জনবসতি থেকে দূরে কোথাও গিয়ে অবস্থান নেয় এবং লোকদের সঙ্গে মিলিত হয়। জনবসতিতে অনুপ্রবেশ করে না সে কখনো।
যে রাতে আলী বিন সুফিয়ান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলছিলেন যে, আমাদের এই কায়রোগামী বাহিনী মিসরে অবস্থানরত সৈন্যদের ব্যাপারে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে, সে রাতে রহস্যময় সেই লোকটি কায়রো থেকে বেশ দূরবর্তী এক খজুরবীথি-ঘেরা এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে। তার নিয়ম ছিল, সে কখনো জ্যোৎস্না রাতে কাউকে সাক্ষাৎ দিত না। দিনের বেলা কারো সঙ্গে কথা বলত না। অন্ধকারের রাতগুলোই ছিল তার প্রিয়। তার মাহফিল এমন সব বাতি দ্বারা আলোকিত হত, যার একটির রং ছিল অন্যটি থেকে আলাদা। সেই আলোরও বিশেষ এক প্রভাব ছিল, যা উপস্থিত লোকদের উপর যাদুর ন্যায় ক্রিয়া করত।
বর্তমানে লোকটি যেখানে অবস্থানরত, তার খানিক দূরে একটি লোকালয়, যার অধিকাংশ অধিবাসীই মুসলমান। সুদানী হাবশীও আছে কিছু। এলাকায় একটি মসজিদও আছে, যার ইমাম স্বল্পভাষী মানুষ। একটি যুবক ছেলে আজ দেড়-দুমাস হল তার নিকট দ্বীনি তালীম হাসিল করতে আসা-যাওয়া করছে। মাহমদু বিন আহমদ নামক এই যুবকটি এসেছে অন্য এক এলাকা থেকে। তার সব ভাবনা ইমাম আর তার ইলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আরো একটি জিনিস নিয়ে তার কৌতূহল আছে- একটি মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটির নাম সাদিয়া। সাদিয়া মাহমুদকে ভালবাসে। মেয়েটি কয়েকবার তাকে তার বকরীর দুধপান করিয়েছে।
দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে লোকালয় থেকে দূরে এক চারণভূমিতে। যেদিন সাদিয়া তার চারটি বকরী ও দুটি উট চড়াতে সেখানে গিয়েছিল, সেদিন মাহমুদও চলার পথে সেখানে পানি পান করার জন্য থেমেছিল। দুজনের চোখাচোখি হলে সাদিয়াই প্রথম জিজ্ঞেস করে, আপনি কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাচ্ছেন? মাহমুদ জবাব দেয়, আমি কোথাও থেকে আসেনি এবং কোথাও যাচ্ছি না। শুনে সাদিয়া ফিক্ হেসে ফেলে। সাদিয়া জিজ্ঞেস করে, আপনি কি মুসলমান? সুদানী? মাহমুদ জবাব দেয়, আমি মুসলমান। মেয়েটি মুচকি হাসে। মাহমুদ মেয়েটির সঙ্গে এমন কিছু কথা বলে, যা তার কাছে ভাল লাগে। সাদিয়া তাকে সুদানের যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তার কথার ধরনে বুঝা যায়, ইসলামী ফৌজের প্রতি তার সমর্থন রয়েছে। মেয়েটি সুলতান সালাহুদ্দীন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে মাহমুদ তার এমন সব প্রশংসা করে যে, সুলতান আইউবী মানুষ নন- আসমান থেকে নাযিল হওয়া ফেরেশতা। সাদিয়া জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, সালাহুদ্দীন আইউবী কি সেই ব্যক্তি অপেক্ষাও বড় বুযুর্গ, যিনি আকাশ থেকে এসেছেন এবং মৃত প্রাণীকে জীবিত করে ফেলেন।
