সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আলী বিন সুফিয়ানের প্রতি তাকিয়ে বললেন, আলী! এদেরকে বল, মিসরে কী হচ্ছে।
আলী বিন ফিয়ান বললেন
গাদ্দাররা দুশমনের সঙ্গে যোগ দিয়ে সুদানের রণাঙ্গনের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। বাজার থেকে খাদ্যদ্রব্য উধাও করে ফেলেছে। দেশের পল্লী এলাকাগুলোতে অপরিচিত লোকজন এসে খাদ্যদ্রব্য, তরিতরকারী ইত্যাদি চড়া মূল্যে ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছে। গোশত এখন দুষ্প্রাপ্য বস্তু। ময়দানে রসদ প্রেরণ করা হলেও অজ্ঞাত কারণে বিলম্ব ঘটান হচ্ছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, রসদ রওনা করিয়ে দুশমনকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে দুশমন রসদের বহর পথে ধরে ফেলেছে। শহরে অপরাধপ্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এমন আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে জুয়াবাজির প্রসার ঘটান হয়েছে যে, আমাদের যুবসমাজ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। ফৌজে নতুন ভর্তির জন্য পল্লী অঞ্চলগুলোতে তোক পাওয়া যাচ্ছে না। গরু-মহিষ, ছাগল-দুম্বা-ভেড়াও উধাও হয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমাদের জাতীয় চরিত্র ধ্বংস করার আয়োজন করা হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদেশের রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। খৃস্টানরা তাদেরকে এই প্রলোভন দেখিয়েছে। অজ্ঞাত উৎস থেকে বিপুল অর্থ-সম্পদ তাদের হাতে আসছে। যেহেতু সরকারের সব ব্যবস্থাপনা তাদের হাতে, তাই তারা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলেছে, যা দুশমনের জন্য অনুকূল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল, পল্লী এলাকাগুলোতে আজগুবি ধরনের নতুন নতুন বিশ্বাসের প্রসার ঘটছে। মানুষ ইসলাম পরিপন্থী চিন্তা-চেতনা লালন ও পালন করতে শুরু করেছে। সেসব ভিত্তিহীন ও ইসলামবিরোধী চিন্তাধারা আমাদের সেনাবাহিনীর মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। এ এক বিরাট আশংকার বিষয়।
আপনি কি তার প্রতিকার করেননি? উপস্থিতদের একজন জিজ্ঞেস করল।
জি, করেছে- আলী বিন সুফিয়ান জবাব দেন- আমার গোটা বিভাগ অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ ও তাদের গ্রেফতার করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আমি আমার গুপ্তচর ও সংবাদদাতাদেরকে পল্লী এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে রেখেছি। কিন্তু দুশমনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা এতই বেড়ে গিয়েছে যে, দুষ্কৃতিকারীদেরকে ধরা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচে বড় সমস্যা হল, আমাদের মুসলমান ভাইরা ই দুশমনের গুপ্তচর ও দুষ্কৃতিকারীদের আশ্রয় ও সহযোগিতা প্রদান করছে। আপনারা শুনে বিস্মিত হবেন যে, পল্লী এলাকার কোন কোন মসজিদের ইমামও দুশমনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।
এমন তো হতে পারে না যে, আমি প্রশাসনকে সেনা বিভাগের হাতে তুলে দেব!- সুলতান আইউবী বললেন- সেনাবাহিনীকে যে কাজের জন্য গঠন করা হয়েছে, যদি তারা যথাযথভাবে তা পালন করে যায়, তাহলে দেশের জন্যও মঙ্গল, তাদের জন্যও কল্যাণকর। একজন কোতোয়াল যেমন সালার হতে পারেন না, তেমনি একজন সালারও কোতোয়ালের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তবে প্রত্যেক সালারকে অবশ্যই খবর রাখতে হবে, প্রশাসন কী করছে। এক্ষেত্রে সামরিক বিভাগ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছে না তো? আমার বন্ধুগণ! আল্লাহ আমাদেরকে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছেন। মিসরের পরিস্থিতি আপনারা শুনেছেন। সুদানের হামলা ব্যর্থ হয়েছে। তকিউদ্দীন তার ভুলের জন্য সুদানের মরুভূমিতে আটকা পড়ে আছে। তার বাহিনী ছোট ছোট দলে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। তার নিরাপদে পেছনে সরে আসার সম্ভাবনাও নজরে আসছে না। তাছাড়া মোহতারাম জঙ্গী কার্ক জয় করতে পারবেন কিনা, তাও আমার জানা নেই। তিনিও যদি ব্যর্থ হন, তাহলে তার দায়ভার আমাকেই বহন করতে হবে। আমি জানি, আপনারা কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও যুদ্ধের ময়দানে দুশমনকে পরাজিত করতে পারেন। কিন্তু আমাদের দুশমন যে ময়দানে হামলা করেছে, তাতে দুশমনকে পরাস্ত করা আপনাদের পক্ষে বাহ্যত সহজ বলে মনে হয় না। আপনারা ধারাল তরবারী। আপনারা মরুভূমির শাহসাওয়ার। কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে, ক্রুসেডারদের এই যুদ্ধক্ষেত্রে আপনারা অস্ত্র সমর্পণ করে ফেলবেন।
মজলিসের ভেতরে বেশকিছু লোকের জোরালো কণ্ঠ শোনা গেল। তারা ইসলাম ও দেশের স্বার্থে জীবন দিতে প্রস্তুত। শুনে সুলতান আইউবী বললেন
বর্তমানে মিসরে যে সৈন্য আছে, তারা যখন কার্ক ও শোবকের ময়দান থেকে মিসর ফিরছিল, তখন তাদের কমান্ডার-দায়িত্বশীলদের জযবাও ঠিক এমন ছিল, যেমনটি এখন আপনাদের। কিন্তু কায়রো পৌঁছে যখন তারা দুশমনের সবুজ বাগান দেখতে পেল, তখন তারা বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। আর আজ তাদের নৈতিক অবস্থা এমন যে, আপনারা তাদের উপর ভরসা করতে পারছেন না।
আমরা এ ধরনের প্রত্যেক কমান্ডারকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হব। তেজোদ্বীপ্ত কণ্ঠে এক সালার বললেন।
আমরা সর্বপ্রথম নিজেদেরকে গাদ্দারদের থেকে পবিত্র করব। বললেন আরেকজন।
আমার পুত্রও যদি খৃস্টানদের আপন বলে প্রমাণ পাই, তাহলে নিজ তরবারী দ্বারা তার মাথা কেটে আমি আপনার পায়ে এনে ফেলব। বললেন প্রবীণ এক নায়েবে সালার।
আমি এরূপ আবেগময় উত্তেজনাপূর্ণ কথার পক্ষে নই। সুলতান আইউবী বললেন।
উপস্থিত সামরিক কর্মকর্তাদের সকলেই উত্তেজিত, ক্ষিপ্ত। এরা এমন মানুষ, যারা সুলতান আইউবীর সামনে মুখ খুলে কথা বলতে ভয় পেত। কিন্তু যখন শুনতে পেল যে, তাদের সহকর্মীরা দুশমনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উদ্যত, তখন তারা অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে। একজন তো সুলতান আইউবীকে এমনও বলে ফেলল যে, আপনি সবসময় আমাদেরকে ধীরস্থিরভাবে চিন্তা করতে এবং ধৈর্যের সাথে কাজ করতে বলে থাকেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমনও সৃষ্টি হয়ে থাকে যে, তখন ধৈর্য ও সহনশীলতা ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। আপনি অনুমতি দিন, আমরা পথে আর কোথাও যাত্রাবিরতি না দিয়ে সোজা কায়রো পৌঁছে যাই। আমরা ঐ বাহিনীকে নিরস্ত্র করে বন্দী করে ফেলব।
