.***
এ হল ক্রুসেডারদের সেই মানসিকতা, যা এক সফল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সালতানাতে ইসলামিয়ার ভিতকে উঁই পোকার ন্যায় খেয়ে ফোকলা করে চলেছিল। সেই ষড়যন্ত্রের-ই ফলে মিসরে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ লেলিহান শিখায় পরিণত হতে শুরু করেছিল, যাকে অবদমিত করার জন্য সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এমন এক মুহূর্তে কার্ক অবরোধ থেকে তার সৈন্য বাহিনীকে তুলে আনতে হল, যখন তিনি খৃস্টানদের শক্তিশালী একটি বাহিনীকে দুর্গের বাইরে পরাস্ত করে ফেলেছেন। কার্ক অবরোধ সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর হাতে তুলে দিয়ে তাকে সৈন্যসহ কায়রো ফিরে যেতে হল। তাতে সুলতান আইউবী হীনবল হননি বটে, কিন্তু পরিস্থিতি তার মনের উপর বিরাট এক বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছিল, তা তার চেহারায় স্পষ্টই ফুটে উঠেছিল। তার বাহিনীর সৈন্যরা এই ভেবে নিশ্চিন্ত যে, তাদেরকে বিশ্রামের জন্য কায়রো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাহিনীর কমান্ডারগণ (যারা সুলতান আইউবীর প্রত্যয় ও যুদ্ধরীতি সম্পর্কে অবগত) এই ভেবে বিস্মিত যে, তিনি নুরুদ্দীন জঙ্গীকে সৈন্যসহ ডেকে আনলেন কেন? অবরোধই বা তুলে নিলেন কি কারণে? তিনি তো জয় বা পরাজয় পর্যন্ত লড়াই করার পক্ষপাতি ছিলেন। বস্তুত, সুলতান আইউবীর হেড কোয়ার্টারের দু-তিনজন সালার ছাড়া কেউ জানত না, মিসরের পরিস্থিতি শোচনীয় রূপ ধারণ করেছে, তকিউদ্দীনের সুদান হামলা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাকে জান বাঁচিয়ে পেছনে সরে আসতে হচ্ছে। সুলতান আইউবীর সঙ্গে আলী বিন সুফিয়ানও উপস্থিত ছিলেন। তিনিই মিসরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির রিপোর্ট নিয়ে এসেছিলেন।
সুলতান আইউবী কার্ক ত্যাগ করে মিসর অভিমুখে রওনা হওয়ার নির্দেশ প্রদানের সঙ্গে এই আদেশও প্রদান করেন যে, পথে যাত্রাবিরতি হবে খুব কম এবং চলতে হবে অতি দ্রুত। এই নির্দেশে সকলের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে, সমস্যা কিছু একটা হয়েছে।
সফরের প্রথম দিনের সন্ধ্যাবেলা। বাহিনী রাতের জন্য একস্থানে থেমে যায়। সুলতানের জন্য তাঁবু খাটান হয়। তিনি তার উচ্চপদস্থ কমান্ডার ও কেন্দ্রীয় কমান্ডের দায়িত্বশীলদের একত্রিত করেন। তিনি বললেন, আপনারা অধিকাংশই জানেন না যে, আমি কেন কার্ক অবরোধ তুলে আনলাম এবং কেনইবা বাহিনীকে মিসর নিয়ে যাচ্ছি। অবরোধ ভেঙ্গে যায়নি ঠিক, আপনারা কেউ পিছপা হননি। কিন্তু আমি একে পরাজয় না বললেও পিছপা হওয়া বলব অবশ্যই। আমার বন্ধুগণ! আমরা পিছপা হচ্ছি এবং আপনারা শুনে বিস্মিত হবেন যে, যারা আপনাদেরকে পিছপা হতে বাধ্য করেছে, তারা আপনাদেরই ভাই, আপনাদেরই বন্ধু। এখন তারা খৃস্টানদের বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। তারা বিদ্রোহের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে প্রস্তুত। আলী বিন সুফিয়ান, তার নায়েব ও গিয়াস বিলবীস যদি চৌকস না হতেন, তাহলে আজ আপনারা মিসর যেতেই পারতেন না। ওখানে এখন চলত খৃস্টান ও সুদানীদের রাজত্ব। আরসালানের ন্যায় কর্মকর্তা খৃস্টানদের ক্রীড়নক প্রমাণিত হয়েছে। লোকটি আল-ইদরীসের দুযুবক পুত্রকে খুন করিয়ে নিজে আত্মহত্যা করেছে। আরসালানের মতো লোকই যখন গাদ্দার প্রমাণিত হল, এমতাবস্থায় আপনারা আর নির্ভর করবেন কার উপর!
সুলতান আইউবীর বক্তব্য শুনে শ্রোতারা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। অস্থিরতা ও উত্তেজনার ছাপ ফুটে উঠে সকলের চোখে-মুখে। সুলতান নীরব হয়ে সকলের প্রতি চোখ বুলালেন। তৎকালের এক ঐতিহাসিক কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের ডায়েরীর সূত্রে উল্লেখ করেন যে, তখন দুটি প্রদীপের কম্পমান আলোয় সকলের মুখমণ্ডল এমন দেখাচ্ছিল, যেন তাদের কেউ কাউকে চেনে না। আইউবীর বক্তব্য শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল সবাই। সুলতান। আইউবীর ভাষা অপেক্ষা বর্ণনাভঙ্গী ও উপস্থাপনার ঢং তাদেরকে বেশী প্রভাবিত করছিল। সুলতানের কণ্ঠে জোশ ছিল না বটে, তবে এতই গাম্ভীর্য ছিল যে, সবাই প্রকম্পিত হয়ে উঠে। তিনি বললেন, আপনাদের মধ্যেও গাদ্দার আছে বলে আমি মাফ চাইব না। আমি আপনাদেরকে এ কথাও বলব না যে, আপনারা কুরআন হাতে নিয়ে হরফ করে বলুন, আপনারা ইসলাম ও সালতানাতে ইসলামিয়ার অফাদার। কারণ, আমি জানি, যারা ঈমান বিক্রি করতে জানে, তারা কুরআনে হাত রেখেও মিথ্যা অঙ্গীকার করতে পারে। আমি আপনাদেরকে শুধু এটুকু বলব যে, যে ব্যক্তি মুসলমান নয়, সে-ই আপনাদের দুশমন। দুশমন যখন আপনার সঙ্গে ভালবাসা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করে, তখনও তার মধ্যে দুশমনী লুকিয়ে থাকে। তারা আপনাকে আপনার ভাইয়ের বিরুদ্ধে, আপনার ধর্মের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে এবং যখনই মুসলমানদের উপর তার শাসন করার সুযোগ আসে, তখন সে মুসলিম নারীর সম্ভ্রমহানি এবং ইসলামের মূলোৎপাটন করে থাকে। এ-ই তার লক্ষ্য। আমরা যে লড়াই লড়ছি, তা আমাদের ব্যক্তি স্বার্থের জন্য নয়; এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভের বা কোন দেশ দখল করার প্রচেষ্টা নয়। এটি হল দুটি বিশ্বাসের লড়াই- কুফর ও ইসলামের। এ যুদ্ধ ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না কুফর কিংবা ইসলাম নির্মূল হবে।
গোস্তাখী মাফ করুন সালারে আজম!- এক সালার বললেন- আমরা যে গাদ্দার নই, তা যদি প্রমাণই করতে হয়, তাহলে আপনি আমাদেরকে মিসরের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করুন। দেখবেন, আমরা প্রমাণিত করব যে, আমরা কী। আরসালান সেনাবাহিনীর নয়- প্রশাসনের কর্মকর্তা ছিলেন। আপনি গাদ্দার প্রশাসনিক বিভাগগুলোতে খুঁজে পাবেন- সেনাবাহিনীতে নয়। কার্ক দুর্গের অবরোধ আপনি তুলে নিয়েছেন। আমরা আনিনি। মোহতারাম জঙ্গীকে ডেকে এনেছেন আপনি- আমরা নই। আমাদের পরীক্ষা হবে যুদ্ধের ময়দানে নিরাপদ পিছু হটার মাধ্যমে নয়। আপনি বলুন, মিসরে কী সব ঘটছে।
