মিসরের যে প্রান্তীয় গ্রামগুলোতে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, তাকে মিসরের সীমান্তগ্রাম বলা হত। সে কারণেই খৃস্টানরা মিল্লাতে ইসলামিয়ার চিন্তা-চেতনার উপর আক্রমণ চালাত এবং ইসলামী বোধ-বিশ্বাসকে দুর্বল করে তদস্থলে তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনার প্রাধান্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করত। এতে প্রমাণিত হয় যে, সে যুগে সীমান্তের মর্যাদা যতটা ভৌগলিক ছিল, তার চেয়ে বেশী ছিল সাংস্কৃতিক। সে যুগের ঘটনাবলী থেকে এ-ও প্রমাণিত হয় যে, তকালে মুসলমানদের পরাজিত করার জন্য অমুসলিমদের অন্যতম অস্ত্র ছিল সংস্কৃতিক আগ্রাসন। তারা জানত, মুসলমান যুদ্ধকে জিহাদ বলে। আর কুরআন মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরজ করে দিয়েছে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে জিহাদ নামায অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের এই অমোঘ বিধানটিও তাদের জানা ছিল যে, কোন অমুসলিম দেশের মুসলিম অধিবাসীরা যদি নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করে তাদেরকে অমুসলিমদের নির্যাতনের হাত থেকে উদ্ধার করা অন্য দেশের মুসলমানদের জন্য ফরজ।
ইসলামের এসব বিধানই মুসলমানদের মাঝে এমন সামরিক চেতনা সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে মুসলমান যখনই কোন দেশে অভিযান চালাত কিংব ময়দানে যুদ্ধে লিপ্ত হত, তাদের চিন্তা-চেতনায় যুদ্ধের লক্ষ্য উদ্ভাসিত হয়ে থাকত। ইসলামের সৈনিকদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা মালে গনীমত হালাল হলেও লুটপাট করা ইসলামের সৈনিকদের লক্ষ্য হত না, তারা গনীমতে, লোভে লড়াই করত না। তার বিপরীতে খৃস্টানদের যুদ্ধ হত আগ্রাসনমূলক প্রতিপক্ষের সম্পদ লুট করা ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তাতে খৃস্টানদের একটি ক্ষতি এই হত যে, যে কোন যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সামরিক শক্তি থাকত মুসলমান অপেক্ষা পাঁচ থেকে দশ গুণ। কিন্তু তারা মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হাতে পরাজয়বরণ করত, অন্তত বিজয় অর্জন করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াত। তারা জানত যে, পবিত্র কুরআন মুসলমানদের মধ্যে সামরিক চেতনা সৃষ্টি করে রেখেছে। তারা আল্লাহর নামে লড়াই করে, জান দেয়। তাই খৃস্টান সেনাপতিদের অন্যতম ভাবনা ছিল, কিভাবে মুসলমানদের মধ্য থেকে এই যুদ্ধ-চেতনা দূর করা যায়। তারা জানত, একজন মুসলমান দশজন খৃস্টানের মোকাবেলা করতে সক্ষম। তারা আকাশের ফেরেশতা বা জ্বিন-ভূত নয়, বরং তারা নিজেদের মধ্যে আল্লাহর শক্তি অনুভব করে থাকে, যা তাদেরকে সব ধরনের লোভ-লালসা এমনকি নিজের জীবন থেকেও উদাসীন করে তোলে। তাই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীরও বহু আগে ইহুদী ও খৃস্টান আলেম পন্ডিতগণ মুসলমানদের সামরিক চেতনাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে তাদের চরিত্র ধ্বংসের অভিযান এবং তাদের ধর্মবিশ্বাসে সূক্ষ্ম বিকৃতি সাধন করে তাদের ঈমানকে দুর্বল করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এবং নুরুদ্দীন জঙ্গীর দুর্ভাগ্য যে, যখন তারা খৃস্টানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন, ততক্ষণে খৃস্টানদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন অনেকখানি সফল হয়ে গেছে। ইসলামের দুশমনরা এই আগ্রাসনকে দুধারায়, পরিচালিত করেছিল। উচ্চ পর্যায়ের মুসলমানদেরকে- যাদের মধ্যে ছিল শাসক, আমীর ও মন্ত্রীবর্গ- অর্থ, নারী ও মদ দ্বারা ঘায়েল করেছিল। আর নিম্নস্তরের মুসলমানদের বিপথগামী করেছিল কুসংস্কার ও ধর্মের বিরুদ্ধে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করার মাধ্যমে। সর্বশেষ সুলতান আইউবী ও সুলতান জঙ্গী খৃস্টানবিরোধী অভিযানে যেমন নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তেমনি পাশাপাশি খৃস্টানরাও মুসলমানদের নৈতিক আগ্রাসনের ময়দানে নতুন পন্থা উদ্ভাবনে তৎপর হয়ে উঠে। তিন-চারজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক এমনও লিখেছেন, একটি সময় এমনও এসেছিল যে, কোন কোন খৃস্টান সম্রাট যুদ্ধের ময়দানের কথা চিন্তা করাই বাদ দিয়েছেন। তারা এই কৌশল অবলম্বন করে যে, এমন যুদ্ধে লড় যাতে মুসলমানের জিহাদী চেতনা ও সামরিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তাদের ধর্মবিশ্বাসের উপর জোরদার। হামলা চালাও আর তাদের অন্তরে এমন সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করে দাও, সাধারণ মুসলমান ও সৈন্যদের মাঝে অবিশ্বাস-অনাস্থা ও ঘৃণার জন্ম দেয়। ফিলিপ অগাস্টাস ছিলেন এই তালিকার প্রধান ব্যক্তি। এই খৃস্টান সম্রাট ইসলামের শত্রুতাকে তার ধর্মের মূল কাজ মনে করতেন এবং বলতেন, আমাদের যুদ্ধ সালাহুদ্দীন আইউবী-নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিরুদ্ধে নয়- ইসলামের বিরুদ্ধে। আমাদের এই লড়াই ক্রুশ বনাম ইসলামের লড়াই, যা আমাদের জীবদ্দশায় না হলেও কোন না কোন সময় অবশ্যই সফল হবে। তার জন্য তোমরা মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের মন-মানসিকতায় জাতীয় চেতনা ও দেশপ্রেমের পরিবর্তে যৌনতার বীজ ঢুকিয়ে দাও এবং তাদেরকে ভোগ বিলাসিতায় ডুবিয়ে দাও।
নিজের এই মিশনকে সফল করে তোলার লক্ষ্যে অগাস্টাস যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের সামনে অস্ত্র ত্যাগ করে সন্ধির পথ অবলম্বন করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। আমি যে যুগের (১১৬৯ সাল) কাহিনী বলছি, সে সময়ে সম্রাট অগাস্টাস নুরুদ্দীন জঙ্গীর কাছে পরাজিত হয়ে বিজিত এলাকাসমূহ প্রত্যার্পন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি জরিমানাও আদায় করেছিলেন এবং আর যুদ্ধ করবেন না বলে চুক্তি স্বাক্ষর করে জিযিয়া প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে তিনি শুধু কয়েকজন পঙ্গু মুসলিম সৈনিককেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অন্য সুস্থ-সবল সৈনিকদেরকে হত্যা করেছিলেন। আর এখন তিনি কার্ক দুর্গে ইসলামের মূলোৎপাটনের পরিকল্পনা প্রস্তুতির কাজে মহাব্যস্ত। ইসলামের শত্রুতা যেন তার মজ্জাগত বিষয়। তার কোন কোন কর্মকৌশল এতই গোপনীয় হত যে, তার সমমর্যাদার খৃস্টান নেতা সেনাপতিরাও তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছিল। তার সহকর্মীরা তার উপর এই অপবাদও আরোপ করেছিল যে, সম্রাট অগাস্টাস তলে তলে মুসলমানদের আপন এবং গোপনে তাদের সঙ্গে সওদাবাজী করছেন। এক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক আন্দ্রে আজবন-এর ভাষ্য মতে, এই অপবাদের জবাবে অগাস্টাস একবার বলেছিলেন, একজন মুসলিম শাসককে জালে আটকানোর জন্য আমি আমার কুমারী কন্যাদেরকেও তার হাতে তুলে দিতে কুণ্ঠিত হব না। তোমরা মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি ও বন্ধুত্ব করতে ভয় পাচ্ছ। কারণ, তার মধ্যে তোমার লাঞ্ছনা দেখতে পাচ্ছ। কিন্তু তোমরা এ কথা ভেবে দেখছ না যে, মুসলমানদেরকে যুদ্ধের ময়দান অপেক্ষা সন্ধির ময়দানে মার দেয়া সহজ। প্রয়োজনে তাদের সামনে অস্ত্র ত্যাগ করে সন্ধিচুক্তিতে স্বাক্ষর কর আর ঘরে এসে তার বিপরীত কাজ কর। আমি কি এমনই করছি না? তোমরা কি জান না যে, আমার রক্ত সম্পর্কের দুটি যুবতী মেয়ে দামেস্কের এক শায়খের হেরেমে অবস্থান করছে? তোমরা কি সেই শায়খের হাত থেকে বিনা যুদ্ধে অনেক ভূখণ্ড দখল করনি? তিনি কি বন্ধুত্বের হক আদায় করেননি? তিনি আমাকে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু মনে করেন; অথচ আমি তাকে আমার জানী দুশমন জ্ঞান করি। আমি প্রত্যেক অমুসলিমকে বলব, তোমরা মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি করে চল এবং তাদেরকে প্রতারণা জালে আটকিয়ে মার।
