সন্ধ্যার পর নুরুদ্দীন জঙ্গী তার বাহিনীকে কার্ক অবরোধে নিয়োজিত করেন এবং সুলতান আইউবীর বাহিনী পেছনে সরে আসে। তাদেরকে তৎক্ষণাৎ কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
এখানে কিছু ভুল হয়ে যায়। সুলতান আইউবী রেমান্ডের বাহিনীকে ঘিরে রেখেছিলেন। নূরুদ্দীন জঙ্গী যখন জরুরী নির্দেশনা দিয়ে তার বাহিনীকে তথায় প্রেরণ করেন, তখন নির্দেশনার কিছু ভুল বুঝাবুঝির কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যায়। রেমান্ড অকস্মাৎ সেনাবেষ্টনীর সেই দিকটিতে আক্রমণ করে বসে, যেদিকে সুলতান আইউবীর অবস্থান দুর্বল বলে তার ধারণা। ভুল বুঝাবুঝির কারণে মুসলিম বাহিনী সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত ছিল না। রেমান্ড সেদিক থেকে দলবল নিয়ে পালিয়ে যায়। তারপরও কিছু সৈন্য বেষ্টনীতে আটকা পড়ে থাকে। তারা পরদিন জানতে পারে যে, তাদের অধিনায়ক রেমান্ড পালিয়ে গেছেন। তখন তারাও এলোপাতাড়ি পালাবার চেষ্টা শুরু করে দেয়। তারা তাদের জীবন রক্ষা করার জন্য লড়াই করে। ফলে কতিপয় নিহত হয়, বাকীরা ধরা পড়ে। এতে সুলতান আইউবীর এতটুকু ক্ষতি হয় যে, রেমান্ড পালিয়ে গেছে। পাশাপাশি উপকারও হয় যে, নুরুদ্দীন জঙ্গীর বাহিনী কার্ক অবরোধ সফল করে তোলার কাজে নিয়োজিত হওয়ার পূর্ণ সুযোগ পেয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী যখন কায়রো রওনা হন, তখন তিনি বেদনাহত চোখে কার্কের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। তিনি জঙ্গীকে বললেন, ইতিহাস একথা বলবে না তো যে, সালাহুদ্দীন আইউবী পিছপা হয়েছিল? আমি অবরোধ প্রত্যাহার করিনি তো?
না, সালাহুদ্দীন!- নুরুদ্দীন জঙ্গী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- তুমি পরাজিত হওনি। তুমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছ। যুদ্ধ আবেগ দিয়ে লড়া যায় না।
আমার ফিলিস্তীনে আমি আবার আসব- কার্কের প্রতি তাকিয়ে সুলতান আইউবী বললেন- আমি আসব…। বলেই তিনি ঘোড়া হাঁকান, আর পেছনে ফিরে তাকাননি।
নুরুদ্দীন জঙ্গী সুলতান আইউবীর গমনপথে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকেন। একসময় দূর পথে সুলতানের ঘোড়া যখন ধূলো-বালির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন তিনি তার এক নায়েবকে বললেন, ইসলামের প্রতিযুগেই একজন সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রয়োজন হবে। ঘটনাটি ১১৭৩ সালের (৬৫৯ হিজরী) মধ্যভাগের।
৩.২ কার্ক দুর্গের পতন
কার্ক দুর্গের পতন
মিসরের পল্লী এলাকার মানুষ লোকটির পথপানে তাকিয়ে আছে। সকলের মুখে একই কথা- ইনি আকাশ থেকে নেমে এসেছেন, আল্লাহর দ্বীন নিয়ে এসেছেন। ইনি মানুষের মনের কথা বলে দেন, ভবিষ্যতের অন্ধকারকে আলোকিত করে দেখান। ইনি মৃত মানুষকে জীবিত করেন।
কে ইনি? লোকটিকে যে-ই দেখেছে, তার কারামত দেখে এতই অভিভূত হয়েছে যে, কেউ জানবার প্রয়োজন মনে করল না ইনি কে? মানুষের বিশ্বাস, লোকটি আকাশ থেকে এসেছেন এবং আল্লাহর দ্বীন নিয়ে এসেছেন। তার কারামতের কাহিনী মানুষের মুখে মুখে। কেউ তাকে পয়গাম্বর বলে বিশ্বাস করে। অনেকে তাকে বৃষ্টির দেবতা বলে জানে এবং তার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজের জীবন পর্যন্ত কোরবান করতে প্রস্তুত। তার ধর্ম কী, তার বিশ্বাস কী জানবার গরজ নেই কারুর।
সেকালের মিসরের যে অঞ্চলের অধিবাসীদের কথা বলছি, তারা ছিল পশ্চাৎপদ অজ্ঞ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক সম্প্রদায়। যার ব্যাপারেই তাদের প্রতীতি জন্মত যে, তার কাছে সমস্যার সমাধান আছে, তার পায়ে গিয়েই তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়ত। তবে ধর্ম পরিচয়ে তারা বেশীরভাগই মুসলমান। ইসলামের আলো তাদের কাছে পৌঁছেনি তা নয়। অনেক মসজিদও নির্মাণ করে রেখেছিল তারা। কাবার প্রভূর দরবারে পাঁচ ওয়াক্ত সেজদাবনতও হত। কিন্তু ইসলামের নির্ভুল আকীদা-বিশ্বাস থেকে ছিল তারা বঞ্চিত। তাদের ইমামরা ছিল অজ্ঞ। নিজেদের কারামত ফুটিয়ে তোলার জন্য মানুষকে আজগুবি সব কল্পকাহিনী শুনিয়ে মাতিয়ে রাখত। পবিত্র কুরআনকে তারা সাধারণ মানুষের জন্য এক অস্পৃশ্য গ্রন্থরূপে পরিচিত করেছে। ফলে সাধারণ মুসলমানরা কুরআনের গায়ে হাত দিতেও ভয় পেত।
ইমামগণ মুসলমানদের অন্তরে একটি শব্দ গায়েব বদ্ধমূল করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, যা কিছু আছে, সবই গায়েবী ব্যাপার। স্যাপার আর গায়েবের ইলম অর্জন করার শক্তি আছে শুধু ইমামের। ইমামরা জনসাধারণকে একটি দুর্বল পদার্থে পরিণত করে রাখে।
এখান থেকেই জনমনে অলীক বিশ্বাস ও কুসংস্কারের জন্ম নেয়। মরুঝড়ের শো শো শব্দের মধ্যে তারা প্রাণীর কণ্ঠ শুনতে পায়। ইমাম বলছেন, এসব অদৃশ্য প্রাণী তোমরা দেখতে পাবে না। তাদের বিশ্বাসে রোগ-ব্যাধি এখন জ্বিন-ভূতের প্রভাব, যার চিকিৎসা করার ক্ষমতা ইমাম ছাড়া কারুর নেই। ইমামদের দাবি, জ্বিন জাতি তাদের কজায়। মানুষ এখন গায়েব আর গায়েবের শক্তিকে এতই ভয় পেতে শুরু করেছে যে, তাদের অন্তরে ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস দুর্বল হয়ে গেছে। মুসলমানদের বিশ্বাস এসে স্থির হয়েছে এখন সেসব স্বর-শব্দে, যা তাদেরকে গায়েবী প্রাণীও তাদের শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
চিত্রটি মিসরের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্ন পল্লী এলাকার। সে যুগে সীমান্ত বলতে স্পষ্ট কিছু ছিল না। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কাগজের উপর একটি রেখা টেনে রেখেছিলেন বটে, কিন্তু তিনি বলতেন, ইসলাম ও ইসলামী সাম্রাজ্যের কোন সীমানা নেই। সীমানা মূলত বিশ্বাস-সংশ্লিষ্ট বিষয়। ইসলামের পরিধি যতটুকু, ইসলামী সালতানাতের সীমানাও ততটুকু। যেখান থেকে অনৈসলামী চিন্তা-চেতনা শুরু, সেই এলাকা অন্য দেশের।
