সুলতান আইউবীর এই দূত যখন নুরুদ্দীন জঙ্গীর দরজায় গিয়ে উপনীত হয়, রক্ষী বাহিনী তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, পয়গাম পৌঁছানোর জন্য তোমাকে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দূত ঘোড়া তো একাধিকবার বদল করেছিল, কিন্তু নিজে এক ঢোক পানি পান করার সময়ও ব্যয় করেনি। ক্লান্তি, ক্ষুধা, পিপাসা, সর্বোপরি দুরাতের নিদ্রাহীনতায় লোকটির মৃতপ্রায় অবস্থা। পিপাসায় এতই কাতর যে, মুখ দিয়ে কথা সরছে না। দুদিনের না-খাওয়া বলহীন শরীর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তাই শুধু ইঙ্গিতে বলল, অনেক জরুরী পয়গাম।
নুরুদ্দীন জঙ্গীও সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় বিশিষ্ট আমলা, দারোয়ান ও দেহরক্ষীদের বলে রেখেছিলেন, জরুরী কোন বার্তা আসলে যেন তার নিদ্রা ও বিশ্রামের পরোয়া না করা হয়।
রক্ষী কমান্ডার ভেতরে প্রবেশ করে নুরুদ্দীন জঙ্গীর কক্ষের দরজায় করাঘাত করেন। নুরুদ্দীন জঙ্গী জাগ্রত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং পত্রটি হাতে নিয়ে দূতকে সঙ্গে করে সাক্ষাতের কক্ষে প্রবেশ করেন। টলটলায়মান পায়ে কক্ষে প্রবেশ করেই দূত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। নূরুদ্দীন জঙ্গী তার কর্মচারীদের ডাক দেন। তারা এলে দূতকে তুলে নিয়ে সেবা-যত্ন করে সুস্থ করে তোলার নির্দেশ দেন। সময় নষ্ট না করে তিনি সুলতান আইউবীর পত্রখানা পাঠ করতে শুরু করেন
আপনার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আমার পয়গাম আপনাকে সন্তুষ্ট করবে না। আপাতত আপনার জন্য সন্তোষজনক সংবাদ শুধু এটুকুই যে, আমি হিম্মত হারাইনি। আমি আপনাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করছি। আপনি আমার নিকট চলে আসুন; আমি আপনাকে সব ঘটনা শুনাব। আমি কার্ক অবরোধ করে রেখেছি। এখনো সফল হইনি। শুধু এতটুকু সাফল্য অর্জন করেছি যে, খৃস্টানদের একটি বাহিনী সম্রাট রেমান্ডের নেতৃত্বে আমার উপর হামলা করেছিল; আমি নিরাপদ অবস্থান থেকে তাকে ঘিরে ফেলেছি। এ যাবত তার অর্ধেক সৈন্য নিঃশেষ হয়ে গেছে। ক্ষুধার্ত খৃস্টান সৈন্যরা তাদের সুদূর এলাকা থেকে যুদ্ধের জন্য নিয়ে আসা উট-ঘোড়াগুলো জবাই করে খাচ্ছে। আমি রেমান্ডকে জীবিত ধরার চেষ্টায় আছি। কিন্তু কার্ক অবরোধ দীর্ঘ হতে চলেছে। খৃস্টানদের মেধা ও যুদ্ধরীতি এখন আগের চেয়ে উন্নত। আমি অবরোধ সফল করার চেষ্টায় আছি। আমি আশাবাদী যে, আমার জানবাজ মুজাহিদরা দুর্গ ভাঙ্গতে সক্ষম হবে। তারা যে চেতনা ও উদ্দীপনার সঙ্গে লড়াই করছে, তা আপনাকে বিস্মিত করবে। কিন্তু সুদানে আমার ভাই তকিউদ্দীন ব্যর্থ হয়েছে। আমি তাকে পিছিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছি। মিসরের সংবাদও ভাল নয়। গাদ্দার ও ঈমান-বিক্রেতারা দুশমনের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে বিদ্রোহ ও ক্রুসেড আক্রমণের পথ সুগম করে দিয়েছে। আপনি আলী বিন সুফিয়ানকে ভাল করে চিনেন। সে আমার কাছে এসেছে। আমি তার পরামর্শকে উপেক্ষা করতে পারি না। সে আমাকে মিসর চলে যেতে বলছে। মুহতারাম! আমি কার্ক দুর্গের অবরোধ প্রত্যাহার করতে পারি না। অন্যথায় খৃস্টানরা বলবে, সালাহুদ্দীন পিছপা হতে পারে। দুশমনের ঘাড় আমার মুঠোয়। আপনি আসুন, এই ঘাড় আপনি নিজের মুঠোয় তুলে নিন। সঙ্গে সৈন্য নিয়ে আসবেন। আপনার বাহিনীকে আমি মিসর নিয়ে যাব। অন্যথায় মিসর বিদ্রোহের শিকার হয়ে পড়বে। আমি আশা করি, আপনি আমার দ্বিতীয় বার্তার অপেক্ষা করবেন না।
সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী এক মুহূর্তও বিলম্ব করলেন না। রাতের পোষাকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের তলব করলেন এবং তাদের জরুরী নির্দেশ প্রদান করেন। দিনের এখনো অর্ধেকও অতিবাহিত হয়নি, তার বাহিনী কার্ক অভিমুখে রওনা হয়ে গেছে। সুলতান জঙ্গী একজন মর্দে মুজাহিদ। তার নাম শুনলে খৃস্টানরা কেঁপে উঠত। তার বক্ষে ছিল ঈমানের প্রদীপ। ছিল যুদ্ধ বিষয়ে পারদর্শিতা। তিনি পথে যথাসম্ভব কম বিরতি দিয়ে এত ময়দানে গিয়ে উপনীত হন যে, দেখে সুলতান আইউবী হতবাক হয়ে যান। দূত যদি আগেভাগেই তাকে অবহিত না করত যে, সুলতান জঙ্গী সৈন্য নিয়ে রওনা হয়েছেন, তাহলে দূর থেকে দেখে সুলতান আইউবী মনে করতেন, খৃস্টান বাহিনী হামলা করতে আসছে। সুলতান আইউবী ঘোড়া হাঁকিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে ছুটে গেলেন। তাকে দেখে নুরুদ্দীন জঙ্গী ঘোড়া থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইসলামের দুপ্রহরী যখন আলিঙ্গনাবদ্ধ হন, তখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
***
সুলতান আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গীকে সব ঘটনা এবং গাদ্দারদের সবিস্তার কাহিনী শোনান। জঙ্গী বললেন, শোন সালাহুদ্দীন! ইসলামের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে, গাদ্দাররা আমাদের জাতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে এবং জাতি তাদের থেকে কখনো মুক্ত হতে পারবে না। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, এমন একটি সময় আসবে, তখন গাদ্দাররা যথারীতি এ জাতিকে শাসন করবে। তারা দুশমনের বিরুদ্ধে কথা বলবে, বড় বড় দাবি করবে, দুশমনকে নিশ্চিহ্ন করার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করবে, কিন্তু জাতি জানতেই পারবে না যে, তাদের শাসকরা মূলত তাদের ও তাদের দ্বীন-ধর্মের দুশমনের সঙ্গে তলে তলে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে। দুশমন তাদেরকে ঢাল-তরবারীরূপে ব্যবহার করবে এবং তাদের হাতে জাতিকে পিষে মারবে। তুমি অস্থির হয়ো না সালাহুদ্দীন। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হব। তুমি মিসর চলে যাও এবং তকিউদ্দীনকে সাহায্য দিয়ে সুদান থেকে বের করে আন। ডানে-বাঁয়ে আক্রমণ করে দুশমনকে অস্থির করে তোল, যাতে তকিউদ্দীনের বাহিনী কোথাও দুশমনের বেষ্টনীতে আটকা না পড়ে। মিসরের সৈন্যদেরকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও, আমি তাদের মস্তিষ্ক থেকে বিদ্রোহের পোকা বের করে দেব।
