এক রাত। সুলতান আইউবী তার তাঁবুতে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন। ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলেন তিনি। এক পর্যায়ে তার মাথায় বুদ্ধি এল যে, দুর্গের আশপাশ থেকে সুড়ঙ্গ খনন করে ভিতরে ঢুকবার চেষ্টা করলে কেমন হয়। আরো কিছু পন্থাও তার মাথায় জাগলো। এখন দিনকয়েকের মধ্যেই তিনি কার্ক দুর্গ দখল করতে চাচ্ছেন।
ঠিক এমনি মুহূর্তে আলী বিন সুফিয়ান তাঁবুতে প্রবেশ করেন। আলীকে দেখে সুলতান আনন্দিত হলেন না। কারণ, তিনি ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছেন যে, মিসরের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চেহারায় বেদনার ছাপ নিয়েই তিনি আলী বিন সুফিয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং বললেন, নিশ্চয় তুমি আমার জন্য সুসংবাদ নিয়ে আসনি।
আমীরে মেসের যথার্থ বলেছেন। আপনার জন্য আমি কোন শুভ সংবাদ বয়ে আনতে পারিনি। বলেই আলী বিন সুফিয়ান মিসরের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও ঘটনাবলী বিবৃত করতে শুরু করেন। তার মত একজন দায়িত্বশীল মানুষ সুলতান আইউবীর নিকট থেকে কিছুই গোপন রাখতে পারেন না, পারেন না তিনি তাকে অলীক আশার বাণী শোনাতে। সুলতান আইউবীকে ভোলামেলা সব কথা বলে দেয়াই সময়ের দাবী। আলী বিন সুফিয়ান তকিউদ্দীনের ক্রটি বিচ্যুতি এবং সুলতান আইউবীরও দুএকটি ভুলের কথা খোলাখুলি উল্লেখ করেন। আরসালান-এর গাদ্দারীর কাহিনী এবং আল-ইদরীসের পুত্রদের খুন হওয়ার ঘটনা শুনে সুলতানের চোখে পানি এসে যায়। আরসালান যদি নিজেকে মৃত্যুর হাতে সপে না দিত, তাহলে তিনি কখনো বিশ্বাসই করতেন না যে, তার এই কর্মকর্তা- যাকে তিনি নিজের অফাদার বন্ধু মনে করতেন গাদ্দারী করতে পারে।
আরসালান আরো কিছুক্ষণ বেঁচে থাকলে অবশিষ্ট তথ্যও ফাস করে দিত- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- তার সর্বশেষ বাক্য (যা সে পূর্ণ করে যেতে পারেনি) থেকে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মিসরে বিদ্রোহ সংঘটিত হতে যাচ্ছে। মিসরে আমাদের যে বাহিনী আছে, তাদেরকে মানসিকভাবে হীনমন্য করে দেয়া হয়েছে। আমার গুপ্তচরবৃত্তি প্রমাণ করে, আমাদের এক একজন কমান্ডার পর্যন্ত ভুল বুঝাবুঝি ও অস্থিরতার শিকার হয়ে পড়েছে। খাদ্যদ্রব্য ও মাছ-গোশতের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এই সেনাবাহিনীর মাঝে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের সব রেশন ময়দানে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন অপপ্রচারও করা হয়েছে যে, ফৌজের বরাদ্দ কর্মকর্তারা বিক্রি করে খাচ্ছে। মিসরে দুশমনের ষড়যন্ত্র পুরোপুরি সফল হয়েছে।
দুমশনের চক্রান্ত সে দেশেই সফল হয়, যে দেশের কতক মানুষ দুশমনের সঙ্গ দেয়ার জন্য তৈরি হয়ে যায়- সুলতান আইউবী বললেন আমাদের আপনজনরা যদি দুশমনের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে পড়ে, তাহলে আমরা দুশমনের মোকাবেলা করব কিভাবে? আমি যেভাবে আল্লাহর ঐ সিংহদের চেতনার জোরে এবং তাদের জীবন কোরবান করে খৃস্টানদেরকে রণাঙ্গনে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছি, আমার প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও যদি তেমন পাকা মুসলমান হত, তাহলে প্রথম কেবলা আজ দখলমুক্ত থাকত এবং আমাদের আযানের সুর ইউরোপের গীর্জাগুলোতেও ধ্বনিত হত। কিন্তু আমি আজও মিসরে আটকা পড়ে আছি, আমার চেতনা, আমার প্রত্যয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছে। সুলতান আইউবী কিছুক্ষণ নীরব রইলেন এবং কি যেন চিন্তা করে আবার বললেন, আমাকে সর্বাগ্রে ঐ গাদ্দারদের খতম করতে হবে; অন্যথায় ওরা দেশ-জাতি-রাষ্ট্রকে উঁইপোকার ন্যায় খেতেই থাকবে।
আমি আপনার সমীপে এই পরামর্শ নিয়ে এসেছি যে, যদি ময়দান আপনাকে অনুমতি দেয়, তাহলে আপনি মিসর চলুন- আলী বিন সুফিয়ান বললেন।
আমি বাস্তবতাকে এড়াতে পারি না আলী- সুলতান বললেন- তবে, আমি তোমাকে এ কথাও না বলে পারছি না যে, যারা আমার হাত থেকে খৃস্টানদের গর্দান আর ফিলিস্তীনকে ছাড়িয়ে নিতে চায়, তারা আমারই ভাই স্বজন শোন আলী! যারা স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারী করে, যারা ইসলামের দুশমনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে, আমি যদি তাদেরকে এখনই খতম না করি, তাহলে তারা কখনোই নিঃশেষ হবে না আর আমাদের ইতিহাসকে এই গোষ্ঠীটি আজীবন কলংকিত করতেই থাকবে। সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করলেন, সুদানের রণাঙ্গনের সংবাদ কী? আমি তকিউদ্দীনের নিকট পয়গাম পাঠিয়েছিলাম, যেন সে ময়দান গুটাতে শুরু করে।
মিসরে কেউ-ই জানে না যে, আপনি এমন নির্দেশ দিয়েছেন। আলী বিন সুফিয়ান বললেন।
আর কারো জানবার প্রয়োজনও নেই। সুলতান আইউবী বললেন।
দারোয়ানকে ডাক দিলেন তিনি। দারোয়ান আসলে তিনি বললেন, কেরানীকে ডেকে আন। কেরানী কাগজ-কলম নিয়ে এসে উপস্থিত হলে সুলতান বললেন, লিখ, মাহামান্য নুরুদ্দীন জঙ্গী…।
***
দ্রুতগতিসম্পন্ন একজন দূতকে পত্রটি দিয়ে নূরুদ্দীন জঙ্গী বরাবর প্রেরণ করা হল। দূত সুলতান আইউবীর এই পয়গাম পরদিন রাতের শেষ প্রহরে বাগদাদে নূরুদ্দীন জঙ্গীর হাতে পৌঁছিয়ে দেয়। সুলতান দূতকে বলে দিয়েছিলেন, পথে প্রতিটি চৌকিতে তুমি তাজাম ঘোড়া পেয়ে যাবে। তবে ঘোড়া বদল করতে যতটুকু সময় লাগবে, ঠিক ততটুকু বিলম্ব করবে, তার। বেশী নয়। যত দ্রুত সম্ভব ঘোড়া হাঁকিয়ে এগিয়ে যাবে। ঘোড়ার গতি শ্লথ হতে দেবে না কোথাও। নুরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট পৌঁছতে যদি রাত হয়ে যায়, তাহলে দারোয়ানকে বলবে তাকে জাগিয়ে দিতে। ভাই জঙ্গী যদি তাতে বিরক্তি প্রকাশ করেন, তাহলে বলবে, সালাহুদ্দীন বলেছেন, আমরা সকলে জেগে আছি।
