মাত্র এক রাতের অভিযানের পর প্রায় আড়াইশ উট কেন্দ্রীয় দফতরের সামনে এনে দাঁড় করানো হয়। উটগুলো খাদ্য-সামগ্রীতে বোঝাই। এই উটগুলো তিন-চারটি পয়েন্ট থেকে ধরে আনা হয়েছে। তরী-তরকারী ইত্যাদি যাতে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে তার জন্য টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এটি তাদের প্রথম সাফল্য। ধরে আনা উট কাফেলার সঙ্গে যেসব মানুষ ছিল, তারা শহরের কয়েকজন ব্যাপরীর নাম বলে, যারা দেশের খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে সীমান্তের বাইরে চালান করার কাজে জড়িত। মধ্যরাতের পর তারা এসব পণ্য বিদেশের অপরিচিত ব্যবসায়ীদের হাতে বিক্রি করত। ধৃত লোকগুলো পল্লী এলাকার ও এমন কয়েকটি জায়গার নাম বলে, যেখানে অপরিচিত ব্যবসায়ীরা অবস্থান করত এবং পণ্যদ্রব্য কিনে জমা করে নিয়ে যেত। উষ্ট্ৰচালকরা সীমান্তবর্তী এমন একটি অঞ্চলের কথা জানায়, যেখান থেকে এসব কাফেলা সুদান ঢুকে পড়ত। ওখানে একটি সীমান্তপ্রহরী ইউনিট ছিল। তদন্তে জানা গেল, তার কমাণ্ডার নিয়মিত দুশমনের কাছ থেকে ঘুষ নিত এবং কাফেলার সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ করে দিত। আরো জানা গেল যে, এর সবই হচ্ছিল আরসালান-এর নেতৃত্বে।
***
আল-ইদরীস ও প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাগণ আরসালান-এর গাদ্দারী, আল-ইদরীস-এর শত্রুদের মৃত্যু ও অন্যান্য ঘটনাবলী নিয়ে পর্যালোচনা করার জন্য বৈঠকে বসেন। আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস অভিমত ব্যক্ত করেন; পরিস্থিতি এত-ই নাজুক রূপ লাভ করেছে যে, এখন তা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারা প্রস্তাব করেন, মিসরে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়ে যাওয়ার এবং ফাতেমী কিংবা ফেদায়ীদের হাতে উচ্চ পর্যায়ের কোন ব্যক্তিত্বের খুন হওয়ার আগেই সুলতান আইউবীকে পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত করা হোক এবং তাঁকে পরামর্শ দেয়া হোক, কার্ক অবরোধ তাঁর নায়েবদের হাতে সোপর্দ করে তিনি কায়রো চলে আসুন। একজন দূত আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল বটে; কিন্তু তাকে বিস্তারিত জানান হয়নি। এখন পরিস্থিতি আরো কঠিন আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হল, আলী বিন সুফিয়ান ময়দানে গিয়ে সুলতান আইউবীর সঙ্গে মিলিত হবেন।
কার্ক অবরোধের বয়স দুমাস হয়ে গেল। কিন্তু এখনো সফলতার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। খৃস্টানরা অস্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাদের একটি ব্যবস্থাপনা এই যে, তারা শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য-পানীয়র আয়োজন করে রেখেছে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এক গুপ্তচর ভিতর থেকে তীরের সঙ্গে বার্তা বেঁধে বাইরে নিক্ষেপ করে। যাতে লিখা ছিল-ভিতরে খাদ্য-পানীয়র কোন অভাব নেই। মুসলমান অধিবাসীর উপর এমন কঠোর পাবন্দী আরোপ করে রাখা হয়েছে যে, তাদের ঘরের দেয়ালগুলোও তাদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করছে। ফলে ভিতরে নাশকতামূলক তৎপরতা পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যথায় খৃস্টানদের এসব খাদ্যসম্ভার ধ্বংস করে দেয়া যেত।
শহরে সুলতান আইউবীর গুপ্তচরেরও অভাব ছিল না। তারা মাঝে-মধ্যে রাতের বেলা তীরের সঙ্গে পয়গাম বেঁধে সময়-সুযোগমত বাইরে ছুঁড়ে মারত। সেনাদের প্রতি নির্দেশ ছিল এরূপ তীর পেলে যেন তারা কমাণ্ডারদের হাতে পৌঁছিয়ে দেয়। খৃস্টানরা অবরোধ ভাঙ্গার প্রচেষ্টা ত্যাগ করে। তারা সুলতান আইউবীর শক্তি ক্ষয় করার কৌশল অবলম্বন করেছে। সুলতান তাদের কৌশল ধরে ফেলেছেন। তাই জবাবে তিনিও পন্থা পরিবর্তন করেন।
খৃস্টানরা দুর্গের বাইরে থেকে আইউবীর উপর আক্রমণ করার যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, সুলতান তা ব্যর্থ করে দেন। এই হামলার জন্য তিনি পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তিনি অতি কৌশলে তাদেরকে ঘিরে ফেলেন।
খৃস্টানদের এই বাহিনীটি সুলতান আইউবীর বেষ্টনীতে আটকা পড়েছে দেড় মাস হয়ে গেছে। বেষ্টনী ভেদ করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তারা চারদিক থেকে হামলাও করতে থাকে। কিন্তু সুলতান তাদের কোন হামলায়-ই কামিয়াব হতে দেননি। অবশ্য তাতে ঘেরাও কয়েক মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। এলাকাটা ছিল সবুজ-শ্যামল। খৃস্টান সৈন্য ও তাদের পশুদের খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা ছিল। তবে তা তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। হাজার-হাজার উট-ঘোড়ার জন্য সে খাদ্য-পানীয় ছিল অপর্যাপ্ত। পানির জন্য সেখানে কোন নদ-নদী ছিল না। ছিল তিন-চারটি কূপ, যার পানি দেড় মাসেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে খৃস্টান সৈন্যদের মাঝে বিশৃংখলা শুরু হয়ে যায়। খাদ্য ও পানীয়র অভাবে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। রাতে সুলতান আইউবীর কমাণ্ডো বাহিনী তাদের উপর গেরিলা হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করতে থাকে। দেড় মাসে এই বাহিনী সংখ্যায় অর্ধেকে নেমে আসে। তাদের পশুগুলোরও বেহাল অবস্থা। খৃস্টান সম্রাট রেমাণ্ড এই বাহিনীর কমাণ্ডার। চরম বিপর্যস্ত এক অবস্থার মধ্যে তিনি অপেক্ষা করছেন, কখন বন্ধুরা হামলা করে তাদেরকে আইউবীর কবল থেকে মুক্ত করে নিবে। কিন্তু তার কোন লক্ষ-ই দেখা যাচ্ছে না।
সুলতান আইউবী ইচ্ছে করলে চারদিক থেকে হামলা করে এই বাহিনীকে পরাস্ত করে দিতে পারতেন। কিন্তু তাতে তাদেরও প্রাণহানীর ঘটনা ঘটত প্রচুর। তাছাড়া তাতে যুদ্ধের গতি পাল্টে যাওয়ার আশংকা ছিল। কিন্তু সুলতান আইউবী নিজের শক্তি ক্ষয় করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি খৃস্টান বাহিনীকে মার দিতে চাচ্ছেন ধীরে ধীরে। সেভাবেই তিনি অগ্রসর হচ্ছেন। অবশ্য তাতে তার এই ক্ষতি হচ্ছিল যে, তার বাহিনীর তৃতীয় যে অংশটি খৃস্টান বাহিনীকে ঘিরে রাখার অভিযানে আবদ্ধ হয়ে আছে তাদেরকে তিনি শহর অবরোধ সফল করে তোলার কাজে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। সুলতান আইউবী এখন আর অবরোধ দীর্ঘ করতে চাচ্ছেন না। তিনি ভাবছেন, কিভাবে দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ভিতরে ঢোকা যায়। সে যুগে এক একটি অবরোধ সাধারণত দীর্ঘ-ই হত। এক একটি শহরকে শত্রুরা দুবছর পর্যন্ত অবরোধ করে রাখত। ছয় সাত মাসের অবরোধকে দীর্ঘ ভাবা হত না। কিন্তু সুলতান আইউবী অবরোধ দীর্ঘ করার পক্ষপাতি নন। তিনি ঐসব রাজা-বাদশাদের ন্যায়ও ছিলেন না, যারা কোন দেশের রাজধানী অবরোধ করে ভিতরের লোকদের কাছে বার্তা পাঠাবে যে, এতগুলো সোনা-রূপা, এত হাজার ঘোড়া কিংবা এত পরিমাণ সুন্দরী নারী পাঠিয়ে দাও, আমরা চলে যাব। সুলতান আইউবীর লক্ষ্য আরব ভূখণ্ড থেকে খৃস্টানদের বিতাড়িত করা। তিনি বলতেন, এই ভূখণ্ড ইসলামের ঝর্ণাধারা, যা গোটা পৃথিবীকে পরিতৃপ্ত করবে। তিনি তার আয়ুকে প্রয়োজনের তুলনায় কম মনে করতেন। তিনি বারবার বলতেন, এ-কাজটি আমি আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনে সমাপ্ত করে যেতে চাই। অন্যথায় আমি দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলিম শাসকগণ এই পবিত্র ভূমিকে খৃস্টানদের হাতে বিক্রি করতে চলেছে।
