এবার আমি সালীম আল-ইদরীসকে বুলব, আমি কেন এত সাহসিকতার সাথে কথা বলি- মেয়েটির সাফল্যের কাহিনী শুনে আরসালান বলল- এবার আমি তাকে জানিয়ে দেব, আমি কী করতে পারি। আরসালান মেয়েটিকে মদপান করতে দেয় এবং দুজনে বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠে।
আরসালান-এর উৎসব এখনো শেষ হয়নি। এমন সময় বলা-কওয়া ছাড়াই কে যেন তার ঘরে ঢুকে পড়ে। লোকটি আল-ইদরীস। তিনি আরসালান ও একটি মেয়েকে নেশাগ্রস্থ ও বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে পান। মেয়েটিকে তিনি চিনে ফেলেন। আরসালান নেশার ঘোরে-ই বলল, নিজের পুত্রদেরকে খুন করিয়ে তুমি নিজে আমার হাতে খুন হতে এসেছ? ………। দারোয়ান! লোকটি আমার অনুমতি ছাড়া আমার জান্নাতে ঢুকল কেন?
ঢুকেছি তোকে জাহান্নামে পাঠাতে- আল-ইদরীস বললেন- আমি আমার পুত্রদের প্রতিশোধ নিতে আসিনি- এসেছি তোমাকে গাদ্দারীর পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিতে।
ইতিমধ্যে নগর প্রধান ভিতরে প্রবেশ করেন। তার সঙ্গে গিয়াস বিলবীস ও আলী বিন সুফিয়ান। তারা মেয়েটিকে গ্রেফতার করে ফেললেন। আরসালান এর সব চাকর-বাকর ও অন্যান্য লোকদেরকে বের করে দিয়ে প্রাসাদোপম ভবনটির ভিতরে-বাইরে প্রহরা বসিয়ে দেয়া হল। অনুসন্ধানে ঘরের মধ্যে প্রশস্ত এক আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষ পাওয়া গেল। সেখান থেকে উদ্ধার করা হল বিপুল পরিমাণ তীর-কামান ও বর্শা। পাওয়া গেল এক গাদা খঞ্জর ও বিস্ফোরক। একটি বাক্স খুলে পাওয়া গেল হাশীশ ও বিষ। অপর এক কক্ষ থেকে উদ্ধার হল, অনেকগুলো সোনার ইট ও স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি বেশ কটি থলে। আরসালান তার পুরাতন দুস্ত্রী ও তাদের সন্তানদেরকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছিল। এখন ঘরে পাওয়া গেল তিনটি ষোড়শী কন্যা। তাদের একজন অপেক্ষা অপরজন অধিক রূপসী। তিনজনই অমুসলিম। রাতারাতি চাকর-বাকরদের তল্লাশী ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। তাদের তিনজনই খৃস্টানদের গুপ্তচর।
তুমি নিজেই বলে দাও তোমার মিশন কি?- নগর প্রধান আরসালানকে বললেন- এই বিত্ত-বৈভব ও অস্ত্রের ডিপো তোমার মৃত্যুদণ্ডের জন্য যথেষ্ট।
তাহলে মৃত্যুদণ্ড-ই দিয়ে দিন- নেশার ঘোরে বলল আরসালান- জীবন যখন দিতেই হবে, মুখ খুলে লাভ কী?. ..
জীবনের শেষ মুহূর্তে তুমি একটি নেক কাজ করে যাও; ঈমান, ইসলাম ও দেশের শত্রুদের সম্পর্কে তথ্য দাও- নগর প্রধান বললেন- আমি আশা করি, এর উছিলায় আল্লাহ তোমার এতবড় অপরাধও ক্ষমা করে দেবেন।
কিন্তু তোমরা তো ক্ষমা করবে না। আরসালান বলল।
সুলতান আইউবী এর চেয়েও জঘন্য অপরাধ ক্ষমা করে থাকেন- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- আপনার জীবনে বেঁচে যাওয়ার পথ খুলতে পারে; এখানে কিরূপ নাশকতা চলছে বলে দিন এবং কিছু লোককে ধরিয়ে দিন।
আরসালান কক্ষে পায়চারী করছে। অন্যরা এদিক-ওদিক উপবিষ্ট। আল ইদরীস-এর কোমরে খঞ্জর সদৃশ একটি তরবারী বাঁধা। আরসালান নিশ্চুপ পায়চারী করতে করতে তার কাছে চলে যায় এবং হঠাৎ কোমর থেকে তরবারীটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বুকে ও পেটের মধ্যখানে স্থাপন করে। উপস্থিত লোকেরা তার থেকে তরবারীটা ছিনিয়ে নেয়ার জন্য এগিয়ে আসে। কিন্তু তার আগেই আরসালান হাতটা ধরে পূর্ণ শক্তিতে তরবারীর আগাটা নিজের পেটে ঢুকিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। লোকেরা পেট থেকে তরবারীটা টেনে বের করে আনার চেষ্টা করলে আরসালান বলল, ওটা ওখানেই থাকুক, তোমরা আমার দুতিনটি কথা শুনে রাখ। আমার মৃত্যু হয়ে গেলে তরবারীটা বের করে নিও। আমি নিজেই নিজের শাস্তি দিয়েছি। আমি জীবিত অবস্থায় সালাহুদ্দীন আইউবীর সামনে উপস্থিত হতে চাইনি। কেননা, তিনি আমাকে তার অফাদার বন্ধু বলে বিশ্বাস করতেন। আমি তোমাদের কারুর কাছে কোন প্রশ্নের জবাব দেব না। তরবারী তার কাজ করে ফেলেছে। তোমরা সাবধান হও, মিসর ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন। মিসরে যে ফৌজ আছে, তারা বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত। খাদ্যের কৃত্রিম সংকট আমি-ই সৃষ্টি করেছিলাম। সৈন্যরা ঠিকমত খাবার পেত না। খৃস্টান নাশকতাকারীরা। ফৌজের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, দেশের গরু, ভেড়া-বকরী-দুম্বা, তরী-তরকারী, খাদ্যসামগ্রী সব বিভিন্ন রণাঙ্গনে চলে যাচ্ছে আর সেখানকার সৈনিকেরা গনীমতের মালামাল দিয়ে বিলাসিতা করছে। আমার দলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিল। তবে আমি তাদের কারো নাম বলব না। ফাতেমী ও ফেদায়ীরা ধ্বংসযজ্ঞ ও নাশকতার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। তোমরা বিদ্রোহ প্রতিহত করতে পারবে না। নতুন সৈন্য নাও, পরিস্থিতি তোমাদের নিয়ন্ত্রণের…। আরসালান শেষ বাক্যটি আর পূর্ণ করতে পারল না। তার আগেই তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল।
আরসালানের ঘর থেকে যে দুটি মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তারা নিজেদের সম্পর্কে জানায় যে, আমাদেরকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও পুরুষদেরকে ফাঁদে আটকিয়ে ব্যবহার করার জন্য পাঠান হয়েছিল। তারা জানায়, আরসালান-এর ঘরে প্রতি রাতে বৈঠক হত, যাতে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের অনেক অফিসার আসা-যাওয়া করতেন। তাদের গোপন সাক্ষাৎ ও বৈঠক এই মেয়েদের অনুপস্থিতিতে হত। মেয়েরা স্বীকারোক্তি দেয় যে, মিসরে বিদ্রোহের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যে মেয়েটি আল-ইদরীস-এর দুপুত্রকে একে অপরের দ্বারা খুন করিয়েছিল, সে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ প্রদান করে। মেয়েটি জানায়, সে আল-ইদরীস-এর বড় পুত্রকে আগেই ভালবাসার জালে আটকিয়ে ফেলেছিল। আরসালান তাকে স্বয়ং আল-ইদরীস-এর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন আরসালান পরিকল্পনা পাল্টে দেয় এবং মেয়েটিকে বলে তুমি আল-ইদরীস-এর দুপুত্রকে একজন দ্বারা অপরজনকে খুন করাও।
