দুভাই প্রাণঘাতী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
সন্ধ্যায় বড় ভাই খঞ্জর হাতে মেয়েটির নির্দেশিত স্থানে গিয়ে উপস্থিত হয়। মেয়েটি এতই দক্ষতার পরিচয় দেয় যে, জায়গাটা নির্ধারণ করেছে অন্ধকার দেখে। এ বিষয়ের প্রতিও লক্ষ রেখেছে, যেন দুভাই তার পৌঁছানোর আগেই একত্রিত হয়ে একে অপরকে চিনে না ফেলে।
মেয়েটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে বড় ভাইকে উপস্থিত দেখতে পায়। সে তাকে জানায়, ঐ যুবকটি আমার পিছনে পিছনে আসছে। বড় ভাই খঞ্জর প্রস্তুত করে রাখে। খানিক পরেই ছোট ভাই এসে পৌঁছে। মেয়েটি বড় ভাইকে বলে, ও এসে পড়েছে; তবে আমি চাই না যে, তোমরা খুনাখুনিতে লিপ্ত হও। আমি গিয়ে ওকে বলি, তুমি চলে যাও। বলেই মেয়েটি ছোট ভাইয়ের নিকট ছুটে যায় এবং বলে, তোমার দুশমন পূর্ব থেকেই এখানে এসে উপস্থিত আছে। তার হাতে খঞ্জর। ছোট ভাইয়ের বিবেকের উপর যৌবনের তাজা খুন চেপে বসে আছে। ছেলেটি খঞ্জর হাতে নেয় এবং অন্ধকারের মধ্যেই আপন বড় ভাইয়ের প্রতি ধেয়ে আসে। বড় ভাই আক্রমণোদ্যত প্রতিপক্ষ যুবককে ছুটে আসতে দেখে সে-ও খঞ্জর হাতে দ্রুত এগিয়ে যায়। একজন অপরজনের উপর প্রচণ্ডবেগে আক্রমণ করে বসে। অন্ধকারে দুভাইয়ের সংঘাত শুরু হয়ে যায়। এক ভাই অপর ভাইকে রক্তাক্ত করে ফেলে। মেয়েটি পার্শ্বে দাঁড়িয়ে উভয়কে উত্তেজিত করতে থাকে।
আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা কর্মীরা রাতে টহল দিচ্ছে। হঠাৎ এক অশ্বারোহী গুপ্তচর ঘটনাস্থলে এসে পড়ে। দেখে মেয়েটি পালাতে উদ্যত হয়। আরোহী ধাওয়া করে তাকে ধরে ফেলে। তাকে সঙ্গে করে আবার ঘটনাস্থলে ফিরে যায়। দুভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস গ্রহণ করছে। মেয়েটি এই ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পর্কহীনতার প্রমাণ দিতে জোর চেষ্টা করে। কিন্তু আরোহী তাকে ছাড়ল না। মেয়েটি নানা রকম প্রলোভন দেখালেও আরোহী সেসব প্রত্যাখ্যান করে নীতির উপর অটল থাকে। আরোহী হাঁক দিয়ে তার সহকর্মীদের ডেকে আনে। ততক্ষণে দুভাই মারা গেছে।
মেয়েটিকে তৎক্ষণাৎ আলী বিন সুফিয়ানের নিকট নিয়ে যাওয়া হল। লাশ দুটোও তুলে নেয়া হল। আলো জ্বালিয়ে লাশ দুটি দেখা হল। আল-ইদরীস এর দুপুত্রের লাশ। আল-ইদরীসকে সংবাদ দেয়া হল। দুযুবক পুত্রের দুটি লাশ একত্রে দেখার পর পিতার মানসিক অবস্থা কেমন হল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
মেয়েটি এলোমেলো কথা বলে। তুমি কার মেয়ে, কোথায় থাক-এ প্রশ্নের জবাব দিতে সে অপারগতা প্রকাশ করে। আল-ইদরীস ভীষণ বিমর্ষ বিপর্যস্ত। তিনি ক্ষুব্ধ কম্পিত কণ্ঠে বললেন, মেয়েটাকে পিঞ্জিরায় আটকে রাখ আলী! এভাবে ওর মুখ থেকে কথা বের করা যাবে না।
আমার বলার আছে-ইবা কী? ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মেয়েটি বলল। তারপর বড় ভাইয়ের লাশের প্রতি ইংগিত করে বলল, ইনি আমাকে ডেকেছিলেন। আমি তার ডাকে সাড়া দেই। মধ্যখান থেকে ইনি (ছোট ভাইয়ের লাশের প্রতি ইশারা করে) এসে পড়লেন। আমার দখল নিয়ে দুজন খঞ্জর হাতে পুরস্পরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি ভয়ে পালাতে উদ্যত হই। এমন সময় একজন। অশ্বারোহী এসে আমাকে ধরে নিয়ে আসেন। আমি পিতার নাম বলতে এজন্য ইতস্তত করছি যে, তাতে তার অপমান হবে।
আলী বিন সুফিয়ান বিচক্ষণ, ধীশক্তিসম্পন্ন ও উপস্থিত বৃদ্ধির মানুষ। তার মনে পড়ে যায়, আরসালান ও আল-ইদরীস-এর মাঝে বাক-বিতণ্ডা হয়েছিল। আরসালান তার সন্দেহভাজনদের একজন। তার ঘরে কী সব হচ্ছে, তাও তিনি জানেন। তিনি আল-ইদরীসকে ইশারা করে বললেন, মেয়েটি যে-ই হোক, ঘাতক নয়। একটি মেয়ে দুটি যুবককে খুন করতে পারেনা। মেয়েটি যা বলেছে, সত্যই বলেছে। আমি তার বিরুদ্ধে কোন এ্যাকশন নিতে পারব না। বলেই তিনি মেয়েটিকে বললেন, যাও, তুমি মুক্ত। আগামীতে কোন বেগানা পুরুষের সঙ্গে এতদূর যেও না; অন্যথায় কখন কার হাতে খুন হও বলা যায় না।
ছাড়া পেয়ে মেয়েটি দ্রুতবেগে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান সঙ্গে সঙ্গে দুজন গুপ্তচরকে বললেন, তোমরা একজন মেয়েটি কোন্ পথে যায় লক্ষ্য রেখে অরেক পথে আরসালান-এর বাড়ির সদর দরজার সামান্য দূরে চুপচাপ বসে থাক। অপরজন অতি সাবধানে মেয়েটির অনুসরণ করে দেখবে, ও কোথায় যায় এবং যেখানেই গিয়ে পৌঁছুক, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সংবাদ দিবে।
দুজন রওনা হয়ে যায়। মেয়েটি দ্রুতপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং একজন তাকে অনুসরণ করছে। আলী বিন সুফিয়ানের ধারণাই সঠিক প্রমাণিত হল। মেয়েটি সোজা আরসালানের ঘরে চলে যায়। আলীর নিয়োজিত লোক এসে সংবাদ দেয়। আল-ইদরীস যখন জানতে পারলেন যে, মেয়েটির যোগাযোগ আরসালানের ঘরের সঙ্গে, তৎক্ষণাৎ তার পিছনের ঘটনা মনে পড়ে যায়। তিনি আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, আরসালান আমাকে বলেছিল, তোমার দুটি যুবক পুত্র আছে। কিন্তু তখন আমি সেই ইংগিত বুঝতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, সেই ইংগিত আর এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। আমার স্পষ্ট ধারণা, এই ঘটনা আরসালান-ই ঘটিয়েছে। আমার দুপুত্রকে সে-ই অভিনব এক পন্থায় একজনকে অপরজন দ্বারা খুন করিয়েছে।
আল-ইদরীস পুলিশ প্রধানকে সংবাদ দেন। পুলিশ প্রধান গিয়াস বিলবীস। এসে পৌঁছান। আলী বিন সুফিয়ানেরও ক্ষমতা আছে। তিনি সিদ্ধান্ত দেন যে, আরসালানের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে নজরবন্দী করা হোক।
