সালাহুদ্দীন আইউবী অত্যন্ত সতর্ক মানুষ- উপস্থিত লোকদের একজন বলল-তিনি যখন-ই মিসরে ফিরে আসবেন, সঙ্গে সঙ্গে তোমার সব অভিযান শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলবেন।
যদি তিনি মিসর পৌঁছাতে পারেন, তবে-ই তো ……-হরমুন বললেন এই প্রশ্নের জবাব আপনি-ই দিতে পারেন যে, আপনি তার অবরোধ সফল হতে দিবেন কিনা। তিনি রেমণ্ডের বাহিনীকে দুর্গের বাইরে ঘিরে ফেলেছেন এবং দুর্গ তার হাতে অবরুদ্ধ। কিন্তু এই ঘেরাও ও অবরোধ তার-ই জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। আপনি এখানে চূড়ান্ত লড়াই লড়বেন না। আইউবীকে আমাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখতে দিন, যাতে তিনি এখানে-ই আবদ্ধ থাকেন এবং মিসর যেতে না পারেন। সুদানে আমাদের কমাণ্ডারগণ তকিউদ্দীনের বাহিনীকে অত্যন্ত সফলভাবে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। তিনি এখন না পারছেন লড়াই করতে, না পারছেন সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে। মিসরের সব বাজারের এবং ক্ষেত-খামারের সমুদয় খাদ্যসামগ্রী আমি উধাও করে ফেলেছি। আপনার প্রদত্ত অর্থ আপনাকে পূর্ণ ফুল দিচ্ছে। আইউবীর এক অফাদার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আরসালান মূলত আপনার-ই অফাদার। লোকটি আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। তার আরো কয়েকজন সহকর্মীও আমাদের সঙ্গে আছে।
আরসালানকে বেতন-ভাতা কত দিচ্ছ?–ফিলিপ আগস্টান জিজ্ঞেস করলেন।
যতটুকু একজন মুসলিম কর্মকর্তার মস্তিস্ক নষ্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজন হরমুন জবাব দেন- নারী, মদ, ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার নেশা যে কোন মুসলমানের ঈমান ক্রয় করতে পারে। আমি তা-ই ক্রয় করে নিয়েছি। আমি আপনাকে এ সুসংবাদও দিতে পারি যে, সালাহুদ্দীন আইউবী যদি এই মুহূর্তে মিসর যান, তাহলে তিনি ওখানকার জগত ভিন্ন কিছু দেখতে পাবেন। তিনি যে যুবসমাজের কথা গর্বের সাথে উল্লেখ করেন, তারা মুসলমান হয়েও ইসলামের কোন কাজে আসবে না। তাদের চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রের রশি থাকবে আমাদের হাতে। তার এই প্রজন্ম যৌন উচ্ছঙ্খলরূপে গড়ে উঠেছে। একই দশা তার সেই বাহিনীরও হবে, যাদেরকে তিনি মিসর রেখে এসেছেন। তাদের মধ্যে আমার ঘাতক কর্মীরা এমন অস্থিরতা ও বিশৃংখলা ছড়িয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে যে কোন মুহূর্তে তারা বিদ্রোহ করতেও কুণ্ঠিত হবে না। আজ আমি পূর্ণ আস্থার সাথে এই দাবি করতে পারি যে, আমি আপনারও আগে আমার যুদ্ধের ইতি টানতে সক্ষম হব। প্রতিপক্ষের চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতা ধ্বংস করে দিতে পারলে আর সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হবে না।
হরমুনের এই উদ্দীপনামূলক রিপোর্ট, শুনে খৃস্টান সম্রাটগণ বেজায় আনন্দিত হন। ফিলিপ অগাস্টাস সেই একই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যা তিনি আগেও কয়েকবার বলেছিলেন। তিনি বললেন, আমাদের লড়াই সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে নয়-ইসলামের সঙ্গে। একদিন আইউবীর মুত্যু হবে, আমরাও মরে যাব। কিন্তু আমাদের চেতনা ও প্রত্যয় জীবিত থাকতে হবে, যাতে এক সময় ইসলামেরও মৃত্যু ঘটে এবং দুনিয়ার শাসনক্ষমতা ক্রুশের হাতে চলে আসে। তার জন্য আমাদের এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র চালু করতে হবে, যদ্বারা মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা ও নৈতিকতার উপর জোরদার হামলা করা যায়। আমি হরমুনকে অভিনন্দন জানাচ্ছি যে, সে এমন যুদ্ধক্ষেত্র শুধু চালু-ই করেনি, বরং অভিযানে এক পর্যায়ে সফলতাও অর্জন করেছে।
***
সালীম আল-ইদরীস-এর দুটি যুবক পুত্র আছে। একজনের বয়স সতের বছর। অপরজনের একুশ। তারাও কায়রোতে খৃস্টানদের পাতা চরিত্র-বিধ্বংসী ফাঁদে পা দিয়েছিল কিনা জানা না গেলেও এতটুকু প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এক সুন্দরী যুবতীর সঙ্গে বড় পুত্রের গোপন সম্পর্ক ছিল। মেয়েটি নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করত এবং বে-পর্দায় ঘোরাফেরা করত। মেয়েটি কোন এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ খান্দানের সন্তান। দুজনের মিলন হত গোপনে। যেদিন আরসালান আল-ইদরীসকে বলেছিল যে, আপনার দুটি যুবক পুত্র আছে, তার পরদিন মেয়েটি বড়পুত্রকে বলল, অন্য এক যুবক আমাকে খুব বিরক্ত করছে। আমি যেদিকে যাই, যুবকটি আমাকে অনুসরণ করছে এবং আমাকে অপহরণ করার হুমকি দিচ্ছে। বড় পুত্র মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, যুবকটি কে? কিন্তু মেয়ে তা বলেনি। বিষয়টা তালগোল পাকিয়ে যায়। মেয়েটি আমতা আমতা করে বলল, বেশী সমস্যা হলে তোমাকে জানাব।
সেদিন সন্ধ্যায়-ই মেয়েটি তার কাছে এসে বলল, ঐ যুবকটি আমাকে সীমাহীন উত্যক্ত করতে শুরু করেছে। সে তোমার সম্পর্কে বলেছে, তোমাকে নাকি সে এমনভাবে খুন করবে যে, কেউ টেরই পাবে না। কাজেই এখন থেকে তুমি খঞ্জর সঙ্গে রাখ, বলা যায় না কখন কী ঘটে যায়।
পরদিন সন্ধ্যায় মেয়েটি অপর যুবক-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকেও একইভাবে উত্তেজিত করে এবং বলে, এখন থেকে তুমি খঞ্জর সঙ্গে রাখ, বলা যায় না কখন কী ঘটে যায়।
অপর যুবক হল আল-ইদরীস-এর ছোট পুত্র। অর্থাৎ-মেয়েটির দুদিকে দুই সহোদর। কিন্তু তাদের কেউ-ই জানেনা যে, মেয়েটি যে যুবক সম্পর্কে উত্তেজনার রিপোর্ট দিচ্ছে, সে তার-ই ভাই। এ-ও জানত না যে, তারা দুভাই এক-ই মেয়ের জালে আটকা পড়েছে। দুভাই-ই খঞ্জর নিয়ে চলাফেরা করতে শুরু করেছে। মেয়েটিও উভয়ের সঙ্গে পৃথক পৃথক সাক্ষাৎ করতে থাকে।
মাত্র পাঁচদিনে মেয়েটি দুভাইকে প্রথমে পশুতে, পরে হিংস্র প্রাণীতে পরিণত করেছে। পঞ্চমদিন সন্ধ্যায় মেয়েটি বড় ভাইকে শহরের খানিক দূরে। এক অন্ধকার স্থানে মিলিত হতে বলে। ছোট ভাইকেও একই সময়ে একই স্থানে উপস্থিত থাকতে বলে। মেয়েটি উভয়কে এ কথাও বলে যে, যে যুবকটি আমাকে উত্যক্ত করছে, সে বলে গেছে, আজ সন্ধ্যায় তুমি যেখানে যাবে, সেখানেই আমাকে দেখতে পাবে। আমি তোমার প্রেমনিবেদনকারীকে তোমার-ই চোখের সামনে হত্যা করব। মেয়েটি জানায়, আমি তাকে বলেছি, আচ্ছা, তুমি যদি এতই বীরপুরুষ হয়ে থাক, তাহলে অমুক সময় অমুক জায়গায় এসে পড়। তুমি যদি ওকে খুন করতে পার, তাহলে আমি একান্তভাবে তোমার-ই হয়ে যাব।
