বলেই তিনি বাইরে বেরিয়ে যান।
***
আরসালানের ঘর থেকে বের হয়ে আল-ইদরীস সোজা আলী বিন সুফিয়ানের কাছে চলে যান এবং তাঁকে আরসালান-এর ঘটনা শোনান। শুনে আলী বিন সুফিয়ান বললেন, আরসালান আমার সন্দেহভাজনদের একজন। তবে এ-যাবত আমি তার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ পাইনি। তথাপি লোকটাকে আমি গোয়েন্দার নজরে রেখেছি।
আল-ইদরীস শুধু অস্থির-ই নন-বিস্মিতও যে, আরসালান এত বীরত্বের সাথে গাদ্দারীতে লিপ্ত হল কি করে! আলী বিন সুফিয়ান তাকে জানালেন, সে একা নয়-গাদ্দারী চলছে সুসংগঠিতভাবে। এর জীবাণু সেনাবাহিনীতেও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ, সুদান রণাঙ্গনের জন্য রসদ প্রেরণ করা। আল-ইদরীস আলী বিন সুফিয়ানকে জানালেন, আমি আরসালানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছি, রসদের এন্তেজাম এখন আমার নিজের করতে হবে। আলী বিন সুফিয়ান তাকে জানালেন, দেশের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মফস্বল থেকে তরি-তরকারী, গরু, মহিষ, ভেড়া-বকরী ইত্যাদি সীমান্তের ওপারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বাজারে খাদ্যসামগ্রীর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, আমি আমার গুপ্তচর ও তথ্য সংগ্রহকারীদেরকে দায়িত্ব দিয়েছি, তারা যেন রাতে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করে এবং কোথাও খাদ্যসম্ভার চোখে পড়লে তুলে নিয়ে আসে। দীর্ঘ আলোচনার পর দুজনে রসদ সংগ্রহের পন্থা ঠিক করে ফেলেন।
আল-ইদরীস জাতীয় কর্তব্য পালনে এতই নিমগ্ন হয়ে পড়েন যে, তার মাথা থেকে আরসালান-এর এই ইংগিত ছুটে-ই যায় যে, তোমার দুটি যুবক পুত্র আছে এবং ওরাই তোমার সাকুল্য সন্তান। পুত্রদের চরিত্রের ব্যাপারে আল-ইদরীস-এর পূর্ণ আস্থা আছে। কিন্তু মানুষের যৌবন অন্ধ হয়ে থাকে। সুলতান আইউবীর অনুপস্থিতির সুযোগে কায়রোতে অপকর্মের এমন এক ঢেউ সৃষ্টি হয়ে যায়, যা যুব সমাজের চিন্তা-চেতনায় প্রচণ্ডভাবে আঘাত করতে শুরু করে। দু-তিন বছর আগেও এমন এক তুফান উঠেছিল; সুলতান আইউবী, যা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবার এই ঢেউ জেগেছে মাটির নীচ থেকে এবং সাফল্য অর্জন করে ফেলেছে। চরিত্রহীনতার এই ঢেউ জেগেছে নানারকম খেলাধুলার নামে।
এক ব্যক্তি তাঁবু খাঁটিয়ে ও শামিয়ানা ঝুলিয়ে খেলা দেখাতে শুরু করেছে। এই খেলা-তামাশার মধ্যে বাহ্যত আপত্তিকর কিছু ছিল না। কিন্তু শামিয়ানার ভিতরে স্থাপন করা ছোট ছোট তাবুতে আলাদা আলাদাভাবে যুবকদেরকে ইংগিতে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের থেকে টাকা নিয়ে কাপড়ের উপর হাতের তৈরী বিভিন্ন প্রকার চিত্র প্রদর্শন করা হয়-অশ্লীল উলঙ্গ নারীর ছবি। ছবি দেখানোর দায়িত্ব পালন করত যুবতী মেয়েরা, যাদের মুচকি হাসি ও অঙ্গভঙ্গিতে থাকত পাপের আবেদন।
সেখানেই এক পর্যায়ে যুবকদেরকে হাশীশ খাওয়ানো হত। এই লজ্জাকর ও ভয়াবহ অভিযান পরিচালিত হত মাটির উপরে। কিন্তু কেউ কুচক্রীদের ধরতে পারতনা। তার কারণ, যে-ই ছবি দেখে কিংবা হাশীশের স্বাদ উপভোগ করে আসত, সে-ই নিজের এই অপরাধপ্রবণতার কথা লুকিয়ে রাখত। সেই পাপে এমন-ই স্বাদ ছিল যে, যে একবার যেত, সে বারবার যেতে বাধ্য হত। তারা বিষয়টা বাইরে এ জন্যেও প্রকাশ করত না যে, সরকার জানতে পারলে তারা এই আনন্দ ও স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এই অপরাধের শিকার হচ্ছিল সমাজের যুবক শ্রেণী ও সেনাসদস্যরা। তাদের জন্য পর্দার অন্তরালে বেশ্যালয়ও খুলে দেয়া হয়েছিল। মুসলমানের চরিত্র ধ্বংস করার এই অভিযান কিরূপ সফল ছিল? তার জবাব কার্ক দুর্গে খৃস্টানদের ইন্টেলিজেন্স প্রধান ও মনস্তাত্বিক যুদ্ধের লড়াকু জার্মান বংশোদ্ভূত হরমুন তার সম্রাটদের দিয়েছিলেন এভাবে
এসব ছবি অংকন করেছে স্পেনের চিত্রকররা। এ এমন এক অশ্লীল চিত্র, যা পাথরের তৈরী পুরুষদেরকেও মাটির মূর্তিতে পরিণত করে দেয়।
হরমুন একটি নারী-পুরুষের যুগল অশ্লীল চিত্র উপস্থিত সম্রাটদের দেখান। এটি বৃহৎ আকারের একটি ছবি, যা তুলির আঁচড়ে আকর্ষণীয় রং দ্বারা তৈরী করা হয়েছে। খৃস্টান সম্রাটগণ ছবিটি দেখে পরস্পর অশ্লীল ঠাট্টা করতে শুরু করেন। হরমুন বললেন
আমি এমন অসংখ্য ছবি তৈরী করিয়ে মিসরের বড় বড় শহরে সে-সবের গোপন প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছি। ওখান থেকে আমাদের সফলতার সংবাদ আসছে। আমি কায়রোর যুবক শ্রেণীর মধ্যে পাশবিকতা উস্কে দিয়েছি। পাশবিকতা এমন এক শক্তিশালী চেতনা, যা উত্তেজিত হয়ে উঠলে সকল সামরিক চেতনাকে-যার মধ্যে জাতীয় চেতনা অন্যতম-ধ্বংস করে দেয়। আমার তৈরী করান চিত্রসমূহ মিসরে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদেরকে মানসিক ও চারিত্রিক দিক থেকে অকর্মণ্য করে দিতে শুরু করে দিয়েছে। এসব চিত্রের স্বাদ নেশার আবেদনও সৃষ্টি করে। আমি তারও ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমি অনেকগুলো রূপসী যুবতী মেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কায়রো ও অন্যান্য শহর-গ্রামে ছড়িয়ে দিয়েছি। ওরা উইপোকার ন্যায় সালাহুদ্দীন আইউবীর জাতি ও সেনাবাহিনীকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কায়রোতে আমার যে কয়াট মেয়ে ধরা পড়েছিল, তার কারণ ভিন্ন। এবার আমি যে নতুন পন্থা অবলম্বন করেছি, তা সফল হতে চলেছে। এখন ওখানকার মুসলমানরা নিজেরাই আমার মিশনের রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং তাতে শক্তি জোগাবে। তারা এই মানসিক বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। অল্প কদিন পর-ই আমি তাদের মন মানসিকতায় তাদের-ই স্বজাতি ও স্বদেশের বিরুদ্ধে বিষ ঢুকাতে শুরু করব।
