আল-ইদরীস আরসালান-এর সঙ্গে তার ঘরে চলে যান। ভিতরে ঢোকার পর তার মনে হল, যেন তিনি কোন রাজমহলে এসেছেন। অথচ আরসালান তেমন উচ্চপদের কর্মকর্তাও নয়।
দুজন একটি কক্ষে উপবিষ্ট। এমন সময়ে এক অতিশয় রূপসী যুবতী আকর্ষণীয় একটি সোরাহী ও রূপার গোলাকার একটি থালায় করে রূপার দুটি গ্লাস হাতে কক্ষে প্রবেশ করে এবং পাত্রগুলো তাদের সম্মুখে রেখে দেয়। আল ইদরীস ঘ্রাণ থেকে-ই বুঝে ফেললেন, পাত্রের পদার্থগুলো মদ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আরসালান, তুমি মুসলমান হয়ে মদপান করছ?
আরসালান মুচকি হেসে বলল, এক চুমুক পান করুন, তাহলে আপনিও সেই সত্যকে বুঝতে পারবেন, যা আমি আপনাকে বুঝাতে চাচ্ছি।
দুজন সুদানী ভিতরে প্রবেশ করে। তাদের হাতে চকমকে তশতরীতে রকমারী খাবার। আল-ইদরীস বিস্ময়ভরা চোখে আরসালান-এর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আরসালান বলল, অবাক হবেন না মোহতারাম ইদরীস! এই শান শওকত আপনিও লাভ করতে পারেন। আমিও আপনার ন্যায় একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কিন্তু আজ দেখুন কেমন রূপসী দুটি যুবতী আমার ঘরের শোভা বৃদ্ধি করেছে। আপনি দামেস্ক ও বাগদাদের আমীর-উজীরদের ঘরে গিয়ে দেখুন, তারাও এরূপ রূপসী যুবতী মেয়েদের দিয়ে হেরেম পূর্ণ করেছে। দেখবেন, ওদের হেরেমে মদের বন্যা বইছে।
এই রূপসী মেয়ে, এই ঐশ্বর্য, এই মদ খৃস্টানদের গোলামীর আশির্বাদ-আল-ইদরীস বললেন- নারী আর মদ সালতানাতে ইসলামিয়ারকে ফোল্লা করে দিল।
আপনি দেখছি, সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাষায় কথা বলছেন- আরসালান বলল-এ আপনার দুর্ভাগ্য।
তুমি কী বলতে চাও?- আল-ইদরীস ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন-আমার মনে হচ্ছে তুমি ক্রুসেডারদের জালে আটকা পড়েছ।
আমি সোনবাহিনীর গোলামে পরিণত হতে চাই না-আরসালান বলল-আমি সেনাবাহিনীকে আমার গোলাম বানাতে চাই। তার একমাত্র পন্থা হল, সুদানে তকিউদ্দীনকে রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিন। বিশেষ সাহায্য আসছে বলে তাকে ধোকা দিতে দিতে এবং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দিয়ে তাকে যুদ্ধে জড়িয়ে রাখতে হবে, যাতে সে সুদানীদের হাতে অস্ত্রসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারলে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, তকিউদ্দীন সুদানীদের হাতে মারা পড়বে এবং তার বাহিনী চিরদিনের জন্য ওখানেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমরা পরাজয়ের দায়ভার সেনাবাহিনীর উপর চাপিয়ে জাতির সামনে তাদেরকে হেয়প্রতিপন্ন করব। তারপর জাতি সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীকেও ঘৃণা করতে শুরু করবে। আপনি চেষ্টা করুন, এ পন্থা অবলম্বন করলে আপনি ঠকবেন না। আপনি এর এত প্রতিদান পাবেন, আপনি যার কল্পনা করতেও পারবেন না।
আমি তোমার মতলব বুঝে ফেলেছি- আল-ইদরীস বললেন-তুমি আমাকে দিয়ে ঈমান বিক্রি করাতে চাও। আমার দ্বারা কক্ষনো তা হবে না।
দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর আল-ইদরীস বললেন, আচ্ছা, তুমি এত ভয়ংকর কথা এমন বড় গলায় কিভাবে বলছ? আমি যে তোমাকে গ্রেফতার করে গাদ্দারীর শাস্তি দিতে পারি, সে কি তুমি ভুলে গেছ?
আহা, আমি কি বলতে পারবনা যে, আপনি আমার উপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন?-আরসালান বলল- সালাহুদ্দীন আইউবী আমার বিরুদ্ধে একটি শব্দও শুনবেন না।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান আল-ইদরীস। দেশের এমন পদস্থ একজন কর্মকর্তা কত বড় এক শয়তানে পরিণত হয়ে গেল! লোকটি কেমন অহংকারের সাথে কথা বলছে!!
আল-ইদরীস নিজে একজন পরিপক্ক ঈমানদার মানুষ। তার বুঝেই আসছিল না যে, যারা নীলামে ঈমান বিক্রি করে ফিরে, তারা লাঞ্ছনার কত নিম্ন স্তরে নিক্ষিপ্ত হতে পারে!
আল-ইদরীস পদমর্যাদায় আরসালান-এর সিনিয়র। এই মুহূর্তে আরসালানকে কুপথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা একান্ত প্রয়োজন। আল ইদরীস-এর কাছে তার একটিই পন্থা-ক্ষমতা প্রয়োগ করা। তিনি আরসালানকে উদ্দেশ করে বললেন, তুমি কী বলতে চাও এবং কী করছ, তা আমার আর বুঝতে বাকী নেই। তুমি যে অপরাধে লিপ্ত হয়েছ, তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আমি তোমাকে এতটুকু খাতির করতে পারি যে, আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি তুমি অবস্থান পরিবর্তন করে পথে ফিরে আস এবং দুশমনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমাকে এই নিশ্চয়তা প্রদান কর যে, তুমি বাগদাদের খেলাফত ও স্বজাতির অফাদার, তাহলে আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারি। তবে এই মুহূর্তে আমি তোমাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলাম। এ দায়িত্ব আপাতত আমি নিজেই পালন করব। আমি তোমাকে সাতদিনের সময় দিলাম। সাতদিন অনেক দীর্ঘ সময়। এ-মুহূর্ত থেকে এ বাড়িতে আমি তোমাকে নজরবন্দী করলাম। এমন যেন না হয় যে, অষ্টম দিনে। এখান থেকে বের করে তোমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিতে হয়।
আল-ইদরীস বসা থেকে উঠে দাঁড়ান। তিনি দেখলেন, আরসালান মিটিমিটি হাসছে।
আরসালান বলল, শুনুন মোহতারাম ইদরীস! আপনার দুটি পুত্র আছে এবং দুজনই যুবক।
হা,–আল ইদরীস বললেন-তাতে কী হয়েছে।
না, কিছু-ই নয়- আরসালান বলল-আমি শুধু আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছি যে, আপনার দুটি যুবক পুত্রসন্তান রয়েছে। আর এরা ছাড়া আপনার আর কোন সন্তান নেই।
আরসালান-এর ইংগিতটা বুঝতে পারলেন না আল-ইদরীস। তিনি বললেন, মদ তোমার মস্তিষ্ক নষ্ট করে দিয়েছে।
