এ হল সুদান আক্রমণের প্রতিক্রিয়া। এই পরিবর্তন সূচিত হয়েছে মাত্র ছয়-সাত দিনের মধ্যে। ফলে মিসর সরকার খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর উপর অর্পণ করে। তারা দিন-রাত খাটা-খাটুনি করে সামান্য যা পেল, নিরাপত্তা হেফাজতে সুদানের রণাঙ্গন অভিমুখে পাঠিয়ে দেয়া হল।
রসদ সংকটের বিষয়টি মিসরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য প্রচণ্ড মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর আগে এমন খাদ্যসংকট কখনো দেখা যায়নি। তারা এই চিন্তায়ও অস্থির হয়ে পড়েন যে, সুলতান আইউবী নিজে যদি রসদ চেয়ে বসেন, তা হলে কি জবাব দেবেন। মিসরে খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে, একথা সুলতান বিশ্বাসই করবেন না। এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হল। তাদের মধ্যে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সালীম আল-ইদরীসও রয়েছেন। সে সময়কার অপ্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায় যে, আল-ইদরীস সেই কমিটির প্রধান ছিলেন। অপর দুজন ছিলেন তার থেকে মাত্র এক স্তর নিম্নপদের বে-সামরিক কর্মকর্তা।
রাতে কমিটির বৈঠক বসে। দুসদস্য আল-ইদরীসকে বললেন, সুলতান—– আইউবী একত্রে দুটি ময়দান খুলে মারাত্মক ভুল করেছেন। আর তকিউদ্দীন তো পরাজয়ের গ্লানি মাথায় না নিয়ে ফিরছেন না।
ফিলিস্তীন মুসলমানদের ভূখণ্ড- আল-ইসরীস বললেন-ওখান থেকে খৃষ্টানদের বিতাড়িত করা আবশ্যক। মুসলমানরা ওখানে পশুর মত জীবন যাপন করছে। ওখানকার মুসলিম নারীদের ইজ্জতের কোন নিরাপত্তা নেই। মসজিদসমূহ আস্তাবলে পরিণত হয়েছে।
এ-সবই প্রচারণা- বলল একজন- আপনি কি নিজ চোখে দেখেছেন যে, ফিলিস্তীনে খৃষ্টানরা মুসলমানদের উপর জুলুম করছে?
প্রচারণা নয়-আমি বাস্তব সত্য আপনাদের বলেছি- আল-ইদরীস বললেন।
আমাদের থেকে সত্য গোপন করা হচ্ছে- অপরজন বলল- সালাহুদ্দীন আইউবী শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বটে, কিন্তু সত্য প্রকাশ করতে আমাদের ভয় করা উচিত নয়। দেশ দখলের মোহ আইউবীকে স্থির হয়ে বসতে দিচ্ছে না। আইউবী খান্দানকে তিনি শাহী খান্দানে পরিণত করতে চাইছেন। খৃষ্টান বাহিনী অপ্রতিরোধ্য ঝড়। তাদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই। খৃষ্টানরা যদি আমাদের দুশমন হত, তাহলে তারা ফিলিস্তীনের পরিবর্তে মিসর কজা করে নিত। তাদের এত সৈন্য আছে যে, এতদিন তারা আমাদের ক্ষুদ্র বাহিনীকে পিষে ফেলতে পারত। তারা আমাদের নয়- সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন।
আপনার কথাগুলো আমার কাছে অসহ্য লাগছে-আল-ইদরীস বললেন- এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আসুন আমরা আসল কথা বলি।
কথাগুলো আমারও কাছে অসহনীয়-একজন বলল- কিন্তু এক ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থ পূরণের জন্য আমাদের গোটা জাতির স্বার্থ ত্যাগ করা উচিত হবে না। আপনি উভয় ময়দানের জন্য রসদ সরবরাহের কথা বলছেন। কিন্তু রসদের অবস্থা তো দেখছেন যে, পাওয়া যাচ্ছে না। সুদানের ময়দান ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমি ভাবছি, এই ময়দানের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেব। তকিউদ্দীন পিছনে সরে আসবেন আর সাধারণ সৈন্যরা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে।
এ-ও তো হতে পারে যে, আমরা রসদ না পাঠালে তকিউদ্দীন অপারগতাবশত দুশমনের হাতে ধরা পড়ে যাবে- আল-ইদরীস বললেন এমনও হতে পারে যে, নিরুপায় হয়ে আমাদের সৈন্যরা দুশমনের হাতে আত্মসমর্পণ করবে।
আত্মসমর্পণ করুক, আমরা পরাজয়ের দায় সৈন্যদের উপর চাপিয়ে দেব। লোকটি বলল।
আপনি কেন এমনটি বলছেন? আল-ইদরীস বললেন।
আমার চিন্তা খুবই স্পষ্ট- লোকটি জবাব দেয়- সালাহুদ্দীন আইউবী আমাদের উপর সামরিক শাসন চাপিয়ে দিতে চাইছেন। তিনি খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধ করে জাতিকে বুঝাতে চাচ্ছেন যে, জাতির নিরাপত্তার জিম্মাদার শুধু সেনাবাহিনী আর জাতির ভাগ্য সেনাবাহিনীর হাতে। আইউবী যদি সত্যিই শান্তিপ্রিয় মানুষ হতেন, তাহলে তিনি খৃষ্টান ও সুদানীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে শান্তির পথ বেছে নিতেন।
আল-ইদরীস হঠাৎ শিউরে উঠেন। সুলতান আইউবী-বিরোধী ও খৃষ্টানদের পক্ষপাতিত্বমূলক কথাগুলো তার সহ্য হচ্ছে না। বৈঠকে তীব্র বাক বিতণ্ডা শুরু হয়ে যায়। কমিটির অপর দুসদস্য আল-ইদরীসকে কথা-ই বলতে দিচ্ছে না। অবশেষে তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি বৈঠক সমাপ্ত ঘোষণা করছি। আগামীকালই আমি আপনাদের মতামত ও প্রস্তাবাবলী নিয়ে ময়দানে আমীরে মেসের-এর নিকট পাঠিয়ে দেব।
তিনি রাগের মাথায়-ই উঠে দাঁড়ান।
অপর দুসদস্যের একজন সেখান থেকে চলে যায়। দ্বিতীয়জন-যার নাম আরসালান-আল ইদরীস-এর সঙ্গে থেকে যায়। আরসালান বলল, আপনি আসলে ব্যক্তিপূজারী ও আবেগপ্রবণ মানুষ। আমি সত্য কথা বললাম আর আপনি ক্ষেপে গেলেন। এখন আপনার প্রতি আমার পরামর্শ, আমার বিরুদ্ধে আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর কাছে কিছুই লিখবেন না। এর অন্যথা হলে আপনার জন্য ভাল হবেনা।
লোকটির কণ্ঠস্বর চ্যালেঞ্জ ও হুমকিমিশ্রিত। আল-ইদরীস তার প্রতি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন। আরসালান বলল, সুযোগ দিলে আমি আপনার সঙ্গে নির্জনে আরো কিছু কথা বলতে চাই।
এখানেই বলুন। আল-ইদরীস বললেন।
আমার ঘরে চলুন-আরসালান বলল- খাবার আমার ঘরে খাবেন। তবে খেয়াল রাখবেন এই সাক্ষাৎ হবে একেবারে গোপনীয়।
