সুলতান আইউবীর চেহারার রঙ বিবর্ণ হয়ে যায়। সমস্যা শুধু মিসরের হলে চিন্তার তেমন কারণ ছিল না। মিসরকে তিনি বহু আশংকাজনক সমস্যা থেকে রক্ষা করেছেন। খৃস্টান ও ফাতেমীদের অনেক ভয়ংকর নাশকতামূলক পরিকল্পনা তিনি ব্যর্থ করে দিয়েছেন। সমুদ্রের দিক থেকে আসা খৃস্টানদের ভয়াবহ হামলা তিনি সফলতার সাথে প্রতিহত করেছেন। খলীফাকে পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত করে তিনি দেশের পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে রেখেছেন। কিন্তু কার্ক অবরোধ করে এখন তিনি সেখানে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে গেছেন। এই ময়দানে তার অনুপস্থিতি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কার্ক অবরোধ ছাড়াও তিনি দুর্গের বাইরে খৃস্টানদের অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। এই অবরুদ্ধ খৃস্টান বাহিনী অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে সুলতান আইউবী তাঁর দুশমনের জন্য আপদ হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। এই যুদ্ধ তাঁর তত্ত্বাবধান ছাড়া লড়া সম্ভব নয়।
সুলতান আইউবীর আশংকা, তকিউদ্দীন যদি পলায়নের ধারায় পিছপা হতে শুরু করে, তাহলে শত্রু বাহিনী তাকে ওখানেই খতম করে সোজা মিসরে ঢুকে পড়বে। মিসরে যে পরিমাণ সৈন্য আছে, তারা হামলা প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট নয়।
এদিকে সুলতান আইউবীর কার্ক অবরোধের আশু সাফল্য সংশয়পূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। উভয় রণাঙ্গনের সার্বিক চিত্র মিসরে বিদ্রোহের আশংকা জোরদার করে তুলছে, যার ফলে সুলতান আইউবীর সুদৃঢ় পা টলতে শুরু করেছে। তিনি কিছুক্ষণ মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁবুর মধ্যে পায়চারী করতে থাকেন। খানিক পর মাথা তুলে বললেন
আমি খৃষ্টানদের সকল সৈন্যের মোকাবেলা করতে পারি। আমি তাদের সেই বাহিনীরও মোকাবেলা করতে পারি, যাদেরকে তারা ইউরোপে সমবেত করে রেখেছে। কিন্তু আমার স্বজাতীয় গুটিকতক গাদ্দার আমাকে পরাজিত করে তুলেছে। কাফেরদের এই সহযোগীরা কেন নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করছে? বোধ হয় তারা জানে, যদি তারা ধর্ম পরিবর্তন করে নতুন পরিচয় ধারণ করে, তাহলে খৃষ্টানরা তাদেরকে এই বলে তিরস্কার করে তাড়িয়ে দিবে যে, তোমরা ঈমানবেঁচা গাদ্দার। তাই ওরাই এদেরকে শিখিয়ে দিয়েছে, তোমরা নাম-পরিচয়ে নিজ ধর্মে-ই থাক আর আমাদের থেকে বেতন-ভাতা নিয়ে গাদ্দারী কর।
সুলতান আইউবী নীরব হয়ে যান। তাঁর তাঁবুতে যারা উপস্থিত ছিল, তারাও নীরব। সুলতান তাদের সকলের প্রতি একবার করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন
আল্লাহ আমাদের থেকে কঠিন পরীক্ষা নিতে চাইছেন। আমরা যদি ঈমানের উপর অটল থাকতে পারি, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে কামিয়াব করবেন।
সুলতান আইউবী তার সঙ্গীদের সাহস বাড়ানোর লক্ষ্যে একথা বললেন বটে; কিন্তু তার চেহারা বলছে তিনি শংকিত।
***
সুলতান আইউবীকে শুধু এটুকুই জানানো হয়েছিল যে, মিসরে বিদ্রোহের আশংকা দেখা দিয়েছে এবং খৃষ্টানদের নাশকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বিস্তারিত তাকে জানানো হয়নি। এই সংক্রান্ত রিপোর্টের ব্যাখ্যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। তার অনুপস্থিতির সুযোগে তিন-চারজন মুসলিম কর্মকর্তা খৃষ্টানদের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে। সুদান আক্রমণ করার দিনকয়েক পর-ই তকিউদ্দীন মিসরে রসদ চেয়ে পাঠান। যত দ্রুত সম্ভব রসদ প্রেরণ করার নির্দেশ পাঠানো হয়। কিন্তু দুদিন পর্যন্ত রসদ পাঠানোর কোন ব্যবস্থাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে জবাব আসে, একই সময়ে দুটি ময়দান খোলা হয়েছে, এত রসদ আমি কোথা হতে দিব? এক পারি মিসরের বাহিনীকে উপোস রেখে সব খাদ্যসম্ভার ময়দানে পাঠিয়ে দিতে। এত পেট আমি ভরতে পারব না।
এই উক্তিটি যার, তিনি উচ্চপদস্থ একজন মুসলিম কর্মকর্তা এবং সুলতান আইউবীর ঘনিষ্টজনদের একজন। এমন এক ব্যক্তি, যার প্রতি সন্দেহ পোষণ করার প্রশ্নই আসেনা। ফলে তার জবাবের সত্যতা স্বীকার-ই করে নেয়া হল যে, আসলেই খাদ্যসম্ভারের অভাব রয়েছে। তথাপি তাকে অনুরোধ করা হল যে, যেভাবে সম্ভব ময়দানের যোদ্ধাদের জন্য কিছু রসদ পাঠিয়ে দিন। কর্মকর্তা কিছু রসদের ব্যবস্থা করলেন বটে, কিন্তু পাঠালেন আরো দুদিন বিলম্ব করে।
পঞ্চম দিবসে রসদের কাফেলা রওনা হয়। উট ও খচ্চরের দীর্ঘ এক বহর। কাফেলার সঙ্গে নিরাপত্তার জন্য একদল অশ্বারোহী সৈনিক দেয়ার। পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু কর্মকর্তা তাতে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি যুক্তি দেখান, রসদ পরিবহনের সমস্ত পথ-ই নিরাপদ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া তিনি মিসরেও পর্যাপ্ত সৈন্যের উপস্থিতির আবশ্যকতাও ব্যক্ত করেন। অবশেষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই রসদবাহী কাফেলা রওনা হয়ে যায়। ছয়দিন পর সংবাদ আসে, রসদ পথে-ই (সুদানের অভ্যন্তরে) দুশমনের কাছে আটকা পড়ে গেছে। সুদানী সৈন্যরা পশুপালসহ সমস্ত রসদ নিয়ে গেছে এবং পশুচালকদের হত্যা করে ফেলেছে।
কায়রোর শীর্ষ কর্মকর্তাগণ অস্থির হয়ে পড়েন। এই রসদ বহর ধ্বংস হওয়া মিসরের জন্য বিরাট এক ক্ষতি। সুদান রণাঙ্গনের বাহিনীর সংকট অনুভূতি কর্মকর্তাদের আরো ভাবিয়ে তোলে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বললেন, আপনি অবিলম্বে পুনরায় রসদ পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। কর্মকর্তা বললেন, বাজারে খাদ্যসামগ্রীর তীব্র অভাব। আপনারা ব্যবসায়ীদেরকে বলুন, তারা খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিক। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হল। তারা তাদের খাদ্যগুদাম খুলে দেখায়-সব শূন্য। গোশতের জন্য দুম্বা, বকরী, গরু, মহিষ কিছুই পাওয়া গেল না। আরো খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মিসরে অবস্থানরত সৈন্যরাও পর্যাপ্ত রেশন পাচ্ছে না। তাই তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানায়, গ্রামাঞ্চল থেকে কোন মাল-ই আসছে না। অনুসন্ধানে জানা গেল, বাইরে থেকে মানুষ মফস্বলে এসে তরি-তরকারী, ধান চাল ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী বাজার মূল্যের চেয়ে বেশী দামে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তার অর্থ, মিসরের খাদ্যসামগ্রী পাচার হয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে। এবার সকলের স্মরণ হল, যে, তিন-চার বছর আগে সুলতান আইউবী মিসরের পূর্বেকার সেনাবাহিনীকে- যাদের অধিকাংশ ছিল সুদানী-বিদ্রোহের অপরাধে ভেঙ্গে দিয়ে তার অফিসার সৈন্যদেরকে সীমান্ত লাগোয়া আবাদযোগ্য জমি দিয়ে কৃষিকার্যে জুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারা এখন মিসর সরকার এবং ব্যবসায়ীদেরকে তাদের উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করছে না।
