তারই বিনিময়স্বরূপ আমি আপনাকে এসব তথ্য প্রদান করলাম। আপনি আপনার বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে একত্রিত করুন এবং আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। আগামী দুতিন দিনের মধ্যেই আপনার উপর আক্রমণ হবে। ফাতেমী ও ফেদায়ীদের থেকে সাবধান থাকুন। তারা মিসরে এমন বহু কর্মকর্তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ও জাতির একান্ত বিশ্বস্ত ও অফাদার।
ক্ষীণ হয়ে আসে মেয়েটির কণ্ঠস্বর। সে দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে স্তব্ধ হয়ে যায় চিরদিনের জন্য।
রাত কেটে ভোর হল। আতা আল-হাশেমী দুটি লাশ ও জীবিত মেয়েকে নিয়ে তকিউদ্দীনের নিকট চলে যান। তকিউদ্দীনকে ঘটনা শোনা এবং নিহত মেয়েটির শেষ কথাগুলো তার কানে দেন। এসব নিয়ে তকিউলীন পূর্ব থেকেই উদ্বিগ্ন। তিনি আরো বিচলিত হয়ে উঠেন। বললেন, তবে আমি সুলতান আইউবীর অনুমতি ব্যতীত পিছপা হতে চাই না। আমি বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল এক কমান্ডারকে কার্ক পাঠিয়েছি। তোমরা তার ফিরে আসা পর্যন্ত অটল থাক।
***
সুলতান আইউবী দূতের বিবৃত যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ভাবনায় পড়ে যান। তিনি তার উপদেষ্টাদের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বললেন
বিক্ষিপ্ত সৈন্যদের একত্রিত করে পেছনে সরে আসা সহজ কাজ নয়। দুশমন তাদেরকে একত্রিত হতে দেবে না। তাছাড়া পেছনে সরে আসলেই সৈন্যদেরও মনোবল ভেঙ্গে পড়বে, যারা মিসরে অবস্থান করছে। বিষয়টা তাদেরও উপর প্রভাব ফেলবে, যারা আমার সঙ্গে এখানে রয়েছে। জনগণের মনও ভেঙ্গে যাবে। তবে বাস্তবকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। বাস্তবতার দাবী হল, তকিউদ্দীন তার বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিয়ে আসুক। আমরা এ মুহূর্তে তাকে সাহায্য করতে পারছি না। কার্ক অবরোধ প্রত্যাহার করে তাকে সহযোগিতা দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমার ভাই বিরাট ভুল করল। আমার বড় মূল্যবান সৈন্যগুলো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
সুদানের যুদ্ধ থেকে আমাদের হাত গুটিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তই নেয়া উচিত পদস্থ এক কর্মকর্তা বললেন- নেতা ও শাসকবর্গের ভুল পদক্ষেপের কারণে সেনাবাহিনীর দুর্নাম হচ্ছে। দেশবাসীকে আমাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া দরকার যে, সুদানে আমাদের পরাজয়ের জন্য সেনাবাহিনী দায়ী নয়।
সন্দেহ নেই যে, এটি আমার ভাইয়ের ভুল- সুলতান আইউবী বললেন আর আমার ভুল হল, আমি তাকে এই অনুমতি দিয়ে রেখেছিলাম যে, কখনো কোন অভিযান পরিচালনা করার প্রয়োজন দেখা দিলে যেন আমাকে কিছু না জানিয়েই করে ফেলে। এখন বেচারা সাত-পাঁচ বিবেচনা না করেই এতবড় অভিযান পরিচালনা করে ফেলল এবং নিজেকে দুশমনের দুয়ার উপর ছেড়ে দিল। কিন্তু আমি আমার ও আমার ভাইয়ের এই বিচ্যুতিকে দেশবাসী ও নূরুদ্দীন জঙ্গী থেকে গোপন রাখব না। আমি ইতিহাসকে ধোকা দেব না। আমি ইতিহাসের পাতায় লিখিয়ে রাখব যে, আমিই এই পরাজয়ের জন্য দায়ী। সেনাবাহিনী নয়। আমি সালতানাতে ইসলামিয়ার অনাগত শাসকদের জন্য এই নমুনা প্রতিষ্ঠিত করে যেতে চাই যে, তারা যেন নিজেদের ক্রটি গোপন রেখে নির্দোষ লোকদেরকে অপদস্থ না করে। নিজের দোষ ঢেকে রেখে নিরপরাধ লোকদের উপর দায়-দায়িত্ব চাপানো এমন এক প্রবণতা ও প্রতারণা, যা বিশ্ব ভূমণ্ডলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
সুলতান আইউবীর চেহারা লাল হয়ে যায়। কণ্ঠস্বর কাঁপতে শুরু করে। মনে হচ্ছিল, যেন তিনি পেছনে সরে আস উচ্চারণ করতে চাইছে না। তিনি কখনো পিছপা হননি। তিনি অনেক কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতে লড়াই করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কাছে তিনি অসহায়। তিনি তকিউদ্দীনের প্রেরিত কমান্ডারকে বললেন
তকিউদ্দীনকে গিয়ে বল, সে যেন তার বাহিনীকে গুটিয়ে নেয় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ করে পেছনে পাঠিয়ে দেয়। কোথাও দুমশন ধাওয়া করলে মোড় ঘুরিয়ে দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করবে এবং এমন ধারায় লড়াই করবে, যেন দুশমন তোমাদেরকে ধাওয়া করতে করতে মিসরে ঢুকে না পড়ে। যখন যে দল মিসরে প্রবেশ করবে, তাদের সংঘবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেবে, যাতে দুশমন মিসর আক্রমণ করলে সফলতার সাথে তার মোকাবেলা করা যায়। নিরাপদে সরে আসার জন্য গেরিলা বাহিনীকে ব্যবহার করবে। কোন সেনাদলকে দুশমনের বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ অবস্থায় ফেলে আসবে না। পেছনে সরে আসার এ সিদ্ধান্ত আমি বড় কষ্টে সহ্য করছি। কারণ, আমার এই সংবাদ বরদাশত করা সম্ভব হবে না যে, তোমাদের কোন বাহিনী দুশমনের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছে। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পেছনে সরে আসা সহজ কাজ নয়। অগ্রাভিযানের তুলনায় মান-মর্যাদা বজায় রেখে নিরাপদে সরে আসা অনেক কঠিন কাজ। তোমরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখবে। দ্রুতগামী একদল দূত সঙ্গে রাখবে। আমি লিখিত পয়গাম প্রেরণ করছি না। কারণ, পথে ধরা পড়ে গেলে দুশমন বুঝে ফেলবে যে, তোমরা পেছনে সরে যাচ্ছ।
সুলতান আইউবী জরুরী নির্দেশনা দিয়ে দূত কমান্ডারকে বিদায় জানান। দূত রওনা হয়ে যায়।
দূতের ঘোড়ার পদশব্দ এখনো শোনা যাচ্ছে। এমন সময় জাহেদান কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং বললেন- কায়রো থেকে একজন দূত এসেছে। সুলতান আইউবী তাকে ভেতরে ডেকে পাঠান। লোকটি গোয়েন্দা বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। মিসরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সংক্রান্ত দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছেন তিনি। তিনি জানান, মিসরে দুশমনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড দিন দিন বেড়েই চলেছে। আলী বিন সুফিয়ান তার পুরো বিভাগ নিয়ে তার মোকাবেলায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন নাজুক রূপ ধারণ করেছে যে, সেনা বিদ্রোহেরও আশংকা দেখা দিয়েছে।
