তোমাকে আমি কোন শাস্তি দিতে চাই না- আতা আল-হাশেমী বললেন- আগামীকাল সকালে আমি তোমাকে আমার সালারে আজমের হাতে তুলে দেব।
তিনি আমার সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন?
যা আমাদের আইনে লেখা আছে।
আপনি কি আমাকে ঘৃণা করেন?
না।
আমি শুনেছি, মুসলমানরা নাকি একের অধিক স্ত্রী রাখে- মেয়েটি বলল আপনি যদি আমাকে আপনার স্ত্রী বানিয়ে নেন, তাহলে আমি আপনার ধর্ম গ্রহণ করে আজীবন আপনার সেবা করব।
আমি তোমাকে আমার কন্যা বানাতে পারি- স্ত্রী নয়- আতা আল-হাশেমী বললেন- কারণ, তুমি এখন আমার হাতে অসহায়। তুমি আমার আশ্রয়েও আছ, বন্দীতেও। আমি তোমার অসহায়ত্ব থেকে সুযোগ নিতে চাই না।
***
আতা আল-হাশেমী ও গোয়েন্দা মেয়েটি কথা বলছেন। মেয়েটির পুরুষ সঙ্গী তিনজন সৈনিকের বেষ্টনীর মধ্যে শুয়ে আছে। কিন্তু সে জাগ্রত। আতা আল-হাশেমী মেয়েটিকে নিদ্রা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সে দেখেছিল। তাতে সে এই ভেবে আনন্দিত যে, মেয়েটি মুসলিম কমান্ডারকে ফঁদে ফেলে খুন করতে পারবে। শুয়ে শুয়ে সে মেয়েটির ফিরে আসার অপেক্ষা করছে।
দীর্ঘ সময় পর লোকটি ঘুমন্ত মুসলিমের প্রতি চোখ বুলায়। সিপাহীরা অচৈতন্য ঘুমিয়ে আছে। এই সুদানী লোকটি সন্ধ্যার পর তাদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছিল এবং হাসি-তামাশার মধ্যে তাদেরকে হাশীশ খাইয়ে দিয়েছিল। আতা আল-হাশেমী তল্লাশি চালিয়ে তার থেকে হাশীশের একটি পুটুলী উদ্ধার করলেও সামান্য একটু হাশীশ তার চোগার পকেটে লুকায়িত ছিল, যা আতা আল হাশেমী খুঁজে পাননি। রাতে গল্পের ছলে সেটুকু বের করে তিনজন সিপাহীকে খাইয়ে দেয়। মুসলিম সিপাহীরা নেশাপানে অনভ্যস্ত। তাই সামান্য একটুতেই অচেতন ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে সুদানী পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল।
সুদানী দেখল যে, তার সঙ্গী এক মেয়ে একটি টিলার পাদদেশে মুসলিম কমান্ডার আতা আল-হাশেমীর কাছে বসে আছে। এভাবে অনেক সময় কেটে গেল, কিন্তু মেয়েটি ফিরে আসছে না। সুদানী মনে করল, বোধ হয় মেয়েটি লোকটাকে খুন করার মওকা পাচ্ছে না।
সুদানী শয়ন থেকে উঠে দাঁড়ায়। অতি সাবধানে ঘুমন্ত সিপাহীদের একটি ধনুক ও নীর থেকে কয়েকটি তীর হাতে তুলে নেয়। মুসলমানদের অস্ত্র দিয়েই মুসলিম কমান্ডারকে খুন করতে চাইছে সে। একপা-দুপা করে অগ্রসর হতে শুরু করে। সামনে কয়েক ফুট উঁচু একটি জায়গা, যার কারণে আতা আল-হাশেমীকে দেখা যাচ্ছে না। পা টিপে টিপে জায়গাটা অতিক্রম করে এগিয়ে যায় লোকটি।
এবার দুজনকেই দেখা যাচ্ছে। কমান্ডারের পিঠটা তার দিকে। তাই কমান্ডার তাকে দেখতে পাচ্ছে না। মেয়েটি চাঁদের আলোতে তীর-ধনুক হাতে একটি লোকের আগমন দেখতে পায়। আগত লোকটিকে চিনে ফেলে সে। আতা আল-হাশেমী নিজের মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীন। খঞ্জরটা তার কোষবদ্ধ পড়ে আছে এক পার্শ্বে। মেয়েটি ঝট করে খঞ্জরটা হাতে তুলে নেয়। দেখে আতা আল-হাশেমী খঞ্জর ছিনিয়ে নেয়ার জন্য মেয়েটির প্রতি হাত বাড়ায়। কিন্তু এরই মধ্যে মেয়েটি অতি দ্রুততার সাথে নিজের সঙ্গী পুরুষটির প্রতি খঞ্জর ছুঁড়ে মারে।
দুজনের মাঝে গজ কয়েকের ব্যবধান। অপরদিক থেকে আর্তচিৎকারের শব্দ কানে আসে। খঞ্জরটি সুদানীর ধমনীতে গিয়ে বিদ্ধ হয় এবং আহত হয়েও মেয়েটিকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে। শাঁ করে এসে তীরটি মেয়েটির বুকে বিদ্ধ হয়।
মেয়েটি যেদিকে খঞ্জর ছুঁড়ে মারল এবং যেদিক থেকে তীর আসল, আতা আল-হাশেমী সেদিকে দৌড়ে যান। সুদানী লোকটি ততক্ষণে দেহ থেকে খঞ্জরটি টেনে বের করে উঠে দাঁড়িয়ে গেছে। তার আক্রমণের আশংকায় আতা আল হাশেমী লোকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পায়ের সর্বশক্তি দিয়ে লোকটির পাজরে; লাথি মারেন। লোকটি দূরে ছিটকে পড়ে। আতা আল-হাশেমী নিজে পড়ে গিয়ে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ান। কিন্তু সুদানী উঠতে পারল না। তার ক্ষতস্থানে ফিকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। তিনি খঞ্জর কুড়িয়ে হাতে নেন এবং মেয়েটির কাছে যান। মেয়েটি নিজেরই সঙ্গী ও দেহরক্ষীর তীর বুকে নিয়ে নির্জীব পড়ে আছে। তবে এখনো সে জীবিত। তীর বের করার কোন ব্যবস্থা নেই।
মেয়েটি আতা আল-হাশেমীর হাত চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আমি আপনার জীবন রক্ষা করেছি। বিনিময়ে আপনি আপনার খোদাকে বলুন, যেন তিনি আমার আত্মাকে তার আশ্রয়ে নিয়ে নেন। আমার জীবনটা পাপের মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। আপনি আমাকে নিশ্চয়তা দৈন, আল্লাহ এই একটি নেকীর বিনিময়ে আমার গোটা জীবনের পাপ ক্ষমা করবেন কিনা। আপনি আপনার কন্যার মাথায় যেভাবে হাত বুলান, আমার মাথায়ও সেভাবে হাত বুলিয়ে দিন।
আতা আল-হাশেমী মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আল্লাহ তোমার সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তুমি নিজে পাপ করনি, তোমাকে দিয়ে পাপ করানো হয়েছে। এতকাল কেউ তোমাকে আলোর পথ দেখায়নি।
প্রচণ্ড ব্যথায় মেয়েটি কুঁকিয়ে উঠে শক্ত করে আতা আল-হাশেমীর ডান হাতটা ধরে বলতে থাকে
এখান থেকে তিন ক্রোশ দূরে সুদানীদের একটি ঘাঁটি আছে। তারা সেখানে আপনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে অবস্থান করছে। আপনার সৈন্যরা এতবেশী ছড়িয়ে পড়েছে যে, তাদের ভাগ্যে এখন মৃত্যু বা বন্দীত্ব ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই। আপনার প্রত্যেক কমান্ডার ও প্রতিটি সেনাদলের পেছনে আমার ন্যায় মেয়েদের লাগিয়ে রাখা হয়েছে। ঐ মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে আমি এ পর্যন্ত আপনার চারজন কমান্ডারকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করেছি। আপনি মিসরের কথা ভাবুন। খৃস্টানরা সেখানে ভয়ানক ও সূক্ষ্ম জাল পেতে রেখেছে। আপনার জাতি ও সৈনিকদের মধ্যে এমন অনেক মুসলিম কর্মকর্তা আছে, যারা খৃষ্টানদের বেতনভোগী গুপ্তচর ও ওফাদার। তারা আমার ন্যায় রূপসী নারী আর অঢেল সম্পদ ভোগ করছে। আপনারা মিসরকে রক্ষা করুন। সুদান ত্যাগ করে চলে যান। গাদ্দারদের চিহ্নিত করে শায়েস্তা করুন। আমি কারো নাম জানি না। যা জানা ছিল বলে দিলাম। আপনিই প্রথম পুরুষ, যিনি আমাকে কন্যা আখ্যায়িত করলেন। আপনি আমাকে পিতার স্নেহ দিয়েছেন।
