মেয়েটি আতা আল-হাশেমীর পেছনে পেছনে হাঁটা দেয়। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বলে কিছুই অন্য সিপাহীরা টের পায়নি।
মেয়েটিকে নিজের জায়গায় নিয়ে যান আতা আল-হাশেমী। মেয়েটির মাথায় এখন ওড়না নেই। চাঁদের আলোয় মাথার বিক্ষিপ্ত চুলগুলো সোনার তারের ন্যায় চিকচিক করছে। কমান্ডার কিছুক্ষণ মেয়েটির প্রতি পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকেন। মেয়েটিও. একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকে কমান্ডারের প্রতি। তারপর মুখে হাসি টেনে ক্ষীণকণ্ঠে বলে, আপনি ভয় করছেন দেখে আমার অবাক লাগছে। আমাকে আপনার নিকট আপনারই জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। আপনি কি আমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন না?
আতা আল-হাশেমীর মুখে কথা নেই। তিনি নিশ্চল মূর্তির ন্যায় চুপচাপ মেয়েটির প্রতি তাকিয়েই আছেন। মেয়েটি তার ডান হাতটা ধরে টেনে এনে নিজের ঠোঁটের সঙ্গে লাগায় এবং বলে, আমি জানি, আপনি আমাকে কেন ডেকেছেন এবং কী ভাবছেন।
মুখ খুললেন কমান্ডার- আমি ভাবছি, তোমার পিতা আমারই মত একজন পুরুষ। মেয়েটির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে কমান্ডার বললেন আমিও একজন পিতা। কিন্তু এই দুই পিতার মধ্যে আকাশ-জমিন পার্থক্য। তোমার পিতা কত আত্মমর্যাদাবোধহীন আর আমি আত্মমর্যাদার পাহারাদারি করার লক্ষ্যে নিজের সন্তানদের এতীম বানানোর চেষ্টা করছি।
আমার পিতা নেই- মেয়েটির বলল- হয়ত দেখেছি; কিন্তু স্মরণ নেই।
মারা গেছেন?
তাও মনে নেই।
আর মা?
কিছুই মনে নেই- মেয়েটি বলল- এ-ও মনে নেই যে, আমি কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম, নাকি কোন যাযাবরের তাঁবুতে। কিন্তু এটা তো এমন রসহীন আলাপ করার সময় নয়।
আমরা সৈনিকরা স্মৃতিচারণে স্বাদ পাই- আতা আল-হাশেমী বললেন আমি তোমার মাথায়ও তোমার অতীতের দুচারটি স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
আমি স্বয়ংই একটি সুদর্শন স্মৃতি- মেয়েটি বলল- যার সঙ্গে আমি সামান্য সময়ও অতিবাহিত করি; আজীবনের জন্য আমি তার স্মৃতি হয়ে যাই। আমার নিজের কোন স্মৃতি নেই।
তুমি নিজেকে সুদর্শন নয় একটি ঘৃণ্য স্মৃতি বল- আতা আল-হাশেমী বললেন- তোমার দেহ থেকে আমি পাপের উৎকট গন্ধ পাচ্ছি। তুমি আমার কাছে আসলে আমি মাতাল হয়ে যাব। কোন পুরুষই তোমাকে স্মরণে রাখে না। তোমার মতো মেয়েদের শিকারীরা আজ এখানে কাল ওখানে রাত কাটায়। এক শিকার পেয়ে গেলে পূর্বের শিকারের কথা ভুলে যায়। তোমার এই রূপ দিন কয়েকের মেহমান মাত্র। তুমি এখন আমার হাতে বন্দী। তোমার এই চেহারাটাকে আমি এই মুহূর্তে শাস্তিস্বরূপ আহত করে বিশ্রী বানিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমি তা করব না। এই মরুভূমি, মদ, হাশশ আর অপকর্ম তোমাকে অল্পদিনের মধ্যেই শুকিয়ে যাওয়া ফুলে পরিণত করবে। তখন কাছে টেনে নেয়ার পরিবর্তে মানুষ তোমাকে অকেজো ভেবে ছুঁড়ে ফেলবে। এই খৃস্টান আর এই সুদানীরা তোমাকে ভিক্ষা করার জন্য রাস্তায় ঠেলে দেবে।
আতা আল-হাশেমীর দৃঢ়তা ও প্রভাব মেয়েটির মনোজগতে তোলপাড় সৃষ্টি করে দেয়। তকিউদ্দীনের কমান্ডার বলছিলেন
আমার একটি মেয়ে আছে। বয়সে তোমার চেয়ে দুতিন বছরের ছোট হবে। আমি তাকে এমন সম্ভ্রান্ত যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেব, যে আমার ন্যায় কোমরে তরবারী ঝুলিয়ে উন্নত জাতের ঘোড়ায় চড়ে বেড়াবে। আমার মত, সে-ও রণাঙ্গনের শাহসাওয়ার হবে। আমার কন্যা বধূসাজে সাজবে। স্বামীর ঘরের রাণী হবে। স্বামীর হৃদয়-রাজ্যে রাজত্ব করবে। মানুষ আমার সৌভাগ্যশীল মেয়েটিকে এক নজর দেখতে চাইবে। কিন্তু পারবে না। আমি তাকে নিয়ে গর্ব করব। তার স্বামী তাকে এত বেশী ভালবাসবে যে, বৃদ্ধা হয়ে গেলেও সেই ভালবাসা শেষ হবে না। অপরদিকে তোমাকে দেখার জন্য কেউ অস্থির হয় না। কারণ, তুমি একটি উন্মুক্ত রহস্য। কারো অন্তরে তোমার মর্যাদা নেই। তোমাকে ভালবাসা দেবে এমন কাউকেও তুমি খুঁজে পাবে না।
আপনি আমার সঙ্গে এসব কথাবার্তা কেন বলছেন? মেয়েটি এমনভাবে জিজ্ঞেস করে, যেন কথাগুলো তার ভাল লাগছে না।
আমি তোমাকে বুঝাতে চাই যে, তোমার মত মেয়েরা পবিত্র হয়ে থাকে আতা আল-হাশেমী জবাব দেন- আমরা মুসলমানরা মেয়েদেরকে আল্লাহর নেয়ামত মনে করি। তুমি যদি সতীত্ব-সম্ভ্রম ও ধর্মের অর্থ বুঝে নিতে পার, তাহলে আল্লাহ তোমার উপর রহমত বর্ষণ করবেন। কিন্তু তুমি তা বুঝবে না। কারণ, তুমি সেই ভালবাসা সম্পর্কে অবহিত নও, যা আত্মার গভীর থেকে উত্থিত হয় এবং আত্মার গভীরে গিয়ে স্থান করে নেয়। তুমি বদনসীব। তুমি পুরুষের মোহ দেখেছ, ভালবাসা দেখনি।
আতা আল-হাশেমী ধীরে ধীরে বলে চললেন। তার কথা বলার ভঙ্গী আর প্রভাবই আলাদা। কিন্তু মেয়েটি এই ভেবে বিস্মিত যে, এই লোকটিও তো আর দশজনের ন্যায় পুরুষ। কিন্তু লোকটি আমার এই উপচেপড়া রূপ-যৌবনকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিল না! আতা আল-হাশেমী তো পাষাণও নন। তিনি তো আপাদমস্তক আবেগে নিমজ্জিত একজন সুপুরুষ। মেয়েটি অস্থির হয়ে যায়। বলল, আপনার কথার মধ্যে আমি এমন নেশা ও মাদকতা অনুভব করছি, যা আমার হাশীশে নেই। আপনার একটি কথাও আমি বুঝতে পারিনি। তথাপি প্রতিটি কথাই আমার অন্তরে দাগ কেটেছে।
মেয়েটি বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ। এ ধরনের নাশকতামূলক কাজের জন্য বিচক্ষণতা অবশ্যকীয় গুণ। পুরুষদেরকে আঙ্গুলের ইশারায় নাচানোর জন্য ওকে ছোটবেলা থেকেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পুরুষটি মেয়েটির সব বিদ্যা-বুদ্ধি অকেজো করে দিয়েছে। মেয়েটি আতা আল-হাশেমীকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করে। ধর্ম বিষয়ক প্রশ্নও করে। তার বলার ভঙ্গিতে এখন পেশাদারী ভাব নেই। এখন কথা বলছে যে স্বাভাবিক গতিতে। মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, আপনি আমাকে কী শাস্তি দেবেন?
