সবাই নীরব। কারো মুখে রা নেই। মেয়েরা ঘোড়ার পেছনে বাঁধা তাদের সঙ্গীর প্রতি তাকায়। সেও নিশুপ। তারা পরস্পর চোখাচোখি করে মতবিনিময় করে নেয়। সুদানী প্রতিশ্রুতি দেয় যে, আমাদেরকে মুক্ত করে দিন, আসল পরিচয় বলে দেব। আতা আল-হাশেমী তার সম্মুখে বসে যান এবং বলেন, আগে বল তারপর মুক্ত করব। লোকটি বলল, আরে পাষান! তোমার কাছে আমি এত রূপসী দুটি মেয়ে নিয়ে আসলাম, আর তুমি কিনা তাদেরকে তীরের নিশানা বানাচ্ছ। কোন অঘটন না ঘটিয়ে মেয়ে দুটোকে বরণ করে নাও এবং সঙ্গীদের নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। এই মূল্য যদি সামান্য হয়, তাহলে বল সোনা-রূপা যা ইচ্ছা চাও, আমি সিরিয়া থেকে তোমাকে এনে দেব।
আতা আল-হাশেমী উঠে দাঁড়ান এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসা সিপাহীকে বললেন, দুলকি চালে ঘোড়া হাঁকাও, পনের-বিশ কদম চালাও।
ঘোড়া চলতে শুরু করে। কয়েক পা অগ্রসর হওয়া মাত্র সুদানী চীৎকার শুরু করে। আতা আল-হাশেমী চালককে ঘোড়া থামাতে বলেন। ঘোড়া থেমে যায়। হাশেমী লোকটির নিকটে গিয়ে বললেন, এখনো সময় আছে, সোজা করে কথা বল। লোকটি সম্মতি জানায় এবং বলে দেয় যে, আমি সুদানী গুপ্তচর। খৃস্টানরা আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে নামিয়েছে। মেয়ে দুটো সম্পর্কে বলল, ওরা মিসরী বংশোদ্ভূত। খৃস্টানরা তাদেরকে নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে ছেড়েছে।
আতা আল-হাশেমী লোকটির পায়ের বন্ধন খুলে দেন এবং তাকে নিজের কাছে বসিয়ে বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করেন। সে জানায়
আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে যে, আমি সুদানে ছড়িয়েপড়া মুসলিম কমান্ডার ও সৈন্যদেরকে সুন্দরী নারী কিংবা সোনা-রূপার চমক দেখিয়ে হত্যা বা গ্রেফতার করিয়ে দেব কিংবা তাদেরকে পক্ষে নিয়ে আসব। লোকটি আরো জানায়, আতা আল-হাশেমী নামক এক মুসলিম কমান্ডার তাদের রসদ পরিবহনের পথকে এত নিরাপদ করে রেখেছে যে, তার তৎপরতায় খৃস্টান ও সুদানী গেরিলাদের অসংখ্য জীবনও নষ্ট হয় এবং মুসলমানদের রসদও গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তাই আমাকে এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে যে, আমি আতা আল-হাশেমীকে এই মেয়েদের মাধ্যমে অন্ধ করে তাকে হত্যা করব কিংবা ফঁদে নিয়ে গিয়ে হত্যা কিংবা বন্দী করব। আর যদি সে পাক্কা ঈমানদার বলে প্রমাণিত হয়, মেয়েদের দ্বারা ঘায়েল করা না যায়, তাহলে যে কোন কৌশলে আমাদের দলে ভিড়িয়ে নেব।
আতা আল-হাশেমী এই অনিন্দ্যসুন্দর মেয়ে দুটোকে কেন বরণ করল না ভেবে লোকটি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে। সে তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি এত রূপসী দুটো মেয়ে এবং সোনা-দানার প্রস্তাব কেন প্রত্যাখ্যান করলেন? জবাবে তিনি বললেন, কারণ, আমার ঈমান কাঁচা নয়।
আতা আল-হাশেমী মেয়েদেরকেও নিজের কাছে ডেকে আনেন। পূর্বে যে মেয়েটি কথা বলেছিল, সে জিজ্ঞেস করল, আপনি আমাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করবেন? তিনি বললেন, আগামীকাল সকালে আমি তোমাদেরকে আমাদের হেডকোয়ার্টারে সালারে আজম তকিউদ্দীনের কাছে পাঠিয়ে দেব।
তিন গোয়েন্দার তল্লাশি নেয়া হল। তিনজনেরই কাছে খঞ্জর পাওয়া গেল। পুরুষ লোকটির কাছে পাওয়া গেল একটি পুটুলী। ভিতরে হাশীশ।
আতা আল-হাশেমী তার একদল জানবাজকে পাহারাদারির জন্য খানিক দূরে একস্থানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারা ফিরে এসেছে। এখন সন্ধ্যা। কমান্ডার তাদেরকে আগন্তুক তিনজনের ব্যাপারে অবহিত করেন। বলেন, এরা গুপ্তচর ও নাশকতাকারী সন্ত্রাসী। হতে পারে, এদের সঙ্গীদের জানা আছে যে, এরা আমাদের এখানে আছে এবং তারা এদেরকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য হামলা করবে। কমান্ডার গোয়েন্দাদেরকে তাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়েন। তার চোখে ঘুম এসে যায়।
অল্পক্ষণ পরই কমান্ডারের চোখ খুলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে মেয়ে দুটোর চেহারা ভেসে উঠে। তিনি ভাবনার জগতে হারিয়ে যান। কী সুশ্রী ও দেখতে নিষ্পাপ দুটো মেয়ে! অথচ তাদের দ্বারা কাজ নেয়া হচ্ছে কত ঘৃণ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। এরা যদি কোন মুসলিম পরিবারে জন্ম নিত, তাহলে এখন এরা। কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের বধূ হয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করত।
ভাবতে ভাবতে নিজের স্ত্রীর কথা মনে পড়ে যায় আতা আল-হাশেমীর। ভাবেন, আমার স্ত্রীও তো যখন বধূবেশে আমার ঘরে এসেছিল, তখন এদেরই ন্যায় যুবতী ও মনোহারী ছিল। স্ত্রীর স্মরণ আতা আল-হাশেমীকে কল্পনার জগতে নিয়ে যায়।
জ্যোৎস্না রাত। চাঁদের আলোয় ফকফক করছে চারদিক। আতা আল হাশেমী শয়ন করেছিলেন একটি টিলার পার্শ্বে। তিনি শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ান। পা টিপে টিপে মেয়ে দুটো যেখানে শুয়ে আছে, সেদিকে এগিয়ে যান, যেন তিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছেন।
মেয়ে দুটো শুয়ে আছে একত্রে। তাদের আশপাশে ঘুমিয়ে আছে সিপাহীরা। সুদানী পুরুষটি খানিক দূরে কয়েকজন সৈনিকের বেষ্টনীতে শায়িত।
আতা আল-হাশেমী নিজের পা দ্বারা একটি মেয়ের পায়ে আলতোভাবে আঘাত করেন। কারো পায়ের ছোঁয়া অনুভব করে মেয়েটির চোখ খুলে যায়। চাঁদের আলোতে চিনে ফেলে আতা আল-হাশেমীকে। মেয়েটি উঠে বসে। আতা আল-হাশেমী তাকে তার সঙ্গে আসতে ইশারা করেন। মেয়েটি মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠে যে, অবশেষে তাহলে আমার যৌবনের যাদু এই পাথরসম কমান্ডারকে প্রভাবিত করেছে।
