আগত লোকগুলো আমাদের ঘুমন্ত মুজাহিদদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেকে ঘুমন্ত অবস্থায়ই শহীদ হয়ে যায়। অনেকে জাগ্রত হয়ে মোকাবেলা করে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে থাকি।
কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম, আমার দুজন সঙ্গী পালাচ্ছে। মওকা পেয়ে আমিও পালাতে শুরু করলাম এবং সঙ্গীদ্বয়ের সাথে মিলিত হলাম। তারা দুজন আহত। আমরা সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। কেউ আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করল না।
তকিউদ্দীনের এই কমান্ডার উষ্ট্রারোহী দুশমনের প্রদত্ত লোভে পড়ে গিয়েছিল, নাকি পূর্ব থেকেই দুশমনের এজেন্ট ছিল, তা জানা না গেলেও এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, এ যুদ্ধেও দুশমন বিক্ষিপ্ত মুসলিম সেনাদলগুলোকে নিঃশেষ করার জন্য সুন্দরী মেয়েদের ব্যবহার করা শুরু করেছে। দুশমন মানবিক দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগাচ্ছিল।
এরূপ আরো একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। গেরিলা বাহিনীর এক কমান্ডার আতা আল-হাশেমী একস্থানে উপবিষ্ট। তার বাহিনী তিন-চারটি দলে বিভক্ত হয়ে আছে। জায়গাটা মিসর থেকে রসদ আসার পথ। আতা আল-হাশেমী যার বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা একশরও কম- মিসর থেকে রসদ আসার সমস্ত রাস্তা নিরাপদ করে ফেলেছিল। রসদের উপর গেরিলা আক্রমণকারী দুশমনের তিনি ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছেন। সুদানীরা তাকে ঘায়েল করার জন্য অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু জনাপাঁচেক জানবাজকে হত্যা করা ব্যতীত তারা আর কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
আতা আল-হাশেমী টিলার আড়ালে একস্থানে বসে আছে। তার সঙ্গে ছয় সাতজন গেরিলা। এটি তার হেডকোয়ার্টার। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, মধ্যবয়সী এক পুরুষের সঙ্গে যাযাবরের পোশাকে দুটি রূপসী মেয়ে কোথাও যাচ্ছে। আতা আল-হাশেমীকে দেখে তারা তার কাছে চলে আসে। মেয়েগুলোকে সুদানী বলে মনে হল। কিন্তু পোশাকে তারা ছদ্মবেশী। মুখমণ্ডল ধূলিমলিন। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। মেয়ে দুটো পুরুষ লোকটির পেছনে পেছনে হেঁটে আসে, যেন তারা লজ্জায় অবনত।
পুরুষ লোকটি মিসরী ও সুদানী মিশ্রিত ভাষায় বলল, আমি মুসলমান। এরা দুজন আমার কন্যা। এরা ক্ষুধায় মরে যাচ্ছে। এদের খাওয়ার জন্য কিছু দিন।
আতা আল-হাশেমীর সুদানী ভাষা জানা ছিল। তিনি গেরিলা সৈনিক। সুদানী অঞ্চলে কমান্ডো অভিযানে পরিচালনার সুবিধার জন্য তিনি সুদানী ভাষা শিখেছিলেন। তার কাছে খাদ্য-খাবারেরও অভাব নেই। মুজাহিদদের রসদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তার হাতে। এ-পথে এ যাবত দু-তিনবার রসদ অতিক্রম করে। তার থেকে প্রতিবারই তিনি নিজের বাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য-খাবার রেখে দিয়েছিলেন। পানিরও অভাব নেই।
কমান্ডার তিনজনকে খাবার খেতে দেন। তারা আহার করছে। এই ফাঁকে তিনি তাদের ঠিকানা-পরিচয় জেনে নিচ্ছেন। কমান্ডার জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কোথা থেকে এসেছ এবং কোথায় যাচ্ছ? পুরুষ লোকটি একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করে বলল, আমরা অমুক এলাকার বাসিন্দা। আমাদের পুরো এলাকা যুদ্ধের কবলে পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। সুদানী-মুসলমান যখন, যারাই এসেছে আমাদের ক্ষতি করেছে, সহায়-সম্পদ খাদ্য-খাবার ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি আমার এই মেয়ে দুটোকে সৈন্যদের কবল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে রেখেছি। শেষ পর্যন্ত আর পেরে উঠলাম না। নিরুপায় হয়ে এদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মেয়ে দুটোর সম রক্ষা করার জন্য আমি এখন ঘরছাড়া। যে কোন প্রকারে যোক আমি মিসর চলে যেতে চাই। কিন্তু কোন পথ দেখছি না। আপনি আমাদেরকে মিসর পৌঁছিয়ে দিন- বলেই লোকটি জিজ্ঞেস করল, তোমরা এখানে কদিন থাকবে?
যে কদিন থাকব, তোমাদের তিনজনকে সঙ্গে রাখব। আতা আল হাশেমী জবাব দেন।
তুমি এই মেয়ে দুটোকে তোমার হেফাজতে নিয়ে নাও- মধ্যবয়সী লোকটি বলল- আমি চলে যাচ্ছি।
আপনার জীবন কত কঠিন, দেখে আমার বিস্ময় লাগছে- কোমল কণ্ঠে এক মেয়ে বলল- আপনার কি স্ত্রী-সন্তানদের কথা মনে পড়ে না?
সবই মনে পড়ে- আতা আল-হাশেমী জবাব দেন। কিন্তু তাই বলে আমি আমার কর্তব্যের কথা তো ভুলতে পারি না।
মনে হচ্ছে, যেন খাবার খেয়ে ও পানি পান করে আগন্তুকদের দেহে নতুন জীবন সঞ্চারিত হয়েছে। দুমেয়ের একজন নিশ্চুপ থাকলেও অপরজনের মুখ খুলে গেছে। মেয়েটি যা বলল, তাতে আতা আল-হাশেমী ও তার জানবাজদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ পায়। মেয়েটি এ-ও বলল যে, আপনারা এতদূর এসে নিজেদের জীবন নষ্ট করছেন কেন?
এ কথা শোনা মাত্র আতা আল-হাশেমী উঠে দাঁড়ান। আগন্তুক তিনজনকেও উঠিয়ে দাঁড় করান এবং সঙ্গীদের ডেকে বললেন, এই সুদানীর পায়ে রশি বেঁধে আমার ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ফেল। হাশেমীর জানবাজরা কমান্ডারের নির্দেশ তামিল করে। তারা রশির এক মাথা লোকটির পায়ে বেঁধে অপর মাথা ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে দেয়। আতা আল-হাশেমী এক সিপাহীকে বললেন, তুমি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বস। সিপাহী ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে।
আতা আল-হাশেমী মেয়ে দুটোকে একত্রিত পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দুজন তীরন্দাজকে ডেকে এনে বললেন, আমি ইশারা করা মাত্র মেয়ে দুটোর চোখের ঠিক মধ্যখানে একটি করে তীর ছুঁড়বে এবং অশ্বারোহী ঘোড়া হাঁকিয়ে দেবে। ঘোড়ার পেছনে বেঁধে রাখা সুদানী মাটিতে পড়ে আছে। ঘোড়া ছুটে চললে তার কী পরিণতি হবে, তা তার জানা ছিল। তীরন্দাজরা নিজ নিজ ধনুকে একটি করে তীর স্থাপন করে রাখে এবং অশ্বারোহী ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত দাঁড়িয়ে থাকে। আতা আল-হাশেমী সুদানী মেয়ে দুটো এবং মধ্যবয়সী পুরুষটিকে বললেন, আমি তোমাদের তিনজনকে একবারই বলব যে, তোমরা তোমাদের আসল পরিচয় বলে দাও। যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছ, স্বীকার কর। অন্যথায় পরিণতি বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।
