এবারকার বন্টনও বিন্যাসে উপকার এই হল যে, তকিউদ্দীনের বাহিনী। সেই এলাকা থেকে বেরিয়ে গেল, যেখানে পানি নেই। আছে শুধু বালি আর টিলা। কিন্তু একটি অসুবিধা হল এই যে, এতে সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত ও বিভক্ত হয়ে গেল। ফলে তারা নিজ নিজ পজিশনে গিয়ে শত্রুর উপর আঘাত হানার আগেই শত্রুরা তাদের উপর আক্রমণ করে তাদেরকে আরো বিক্ষিপ্ত করে দিল। মুজাহিদদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে কমান্ডাররা নিজ নিজ বাহিনীকে আলাদা করে সুলতান আইউবীর শেখানো পন্থায় যুদ্ধ শুরু করল। কিন্তু তারপরও স্পষ্ট বুঝ হয়ে গেল যে, এই লড়াইয়ে তারা পেরে উঠবে না। তবু তারা ময়দানে অটল থাকার চেষ্টা চালিয়ে যায়। রসদ ও রিজার্ভ বাহিনীর সহযোগিতা পাওয়ার আশা তো সম্পূর্ণই তিরোহিত। কমান্ডো বাহিনী শত্রুর উপর অতর্কিত হামলা করে শত্রুর ক্ষতিসাধন করছে আর খাদ্য খাবার যা পাচ্ছে ছিনিয়ে আনছে। এই ছিনিয়ে আনা খাবার খেয়েই মুজাহিদরা টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
মুজাহিদদের এখন আর কেন্দ্রীয় কমান্ড নেই। তকিউদ্দীন তাঁর কর্মকর্তাদের নিয়ে দৌড়-ঝাঁপে ব্যস্ত। তিনি আগে যতটা আবেগতাড়িত ছিলেন, এখন ততটা শান্ত ও গম্ভীর। অনেকটা আশান্বিতও বটে। এ যাবত তাকে এমন কোন সংবাদ শুনতে হয়নি যে, অমুক দল বা বাহিনী শক্রর হাতে অস্ত্র সমর্পণ করেছে। সংঘাত-সংঘর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিক্ষিপ্ত হয়ে এখন সুদানের অর্ধেকটায় ছড়িয়ে পড়েছে। মুজাহিদ কমান্ডাররাও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, তারা এভাবে যুদ্ধ চালিয়েই যাবে। তারা সুদান ত্যাগ করবে না। এখন দুমশনেরও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এক পর্যায়ে দুশমন দিশেহারা হয়ে পড়ে। মুজাহিদদেরকে কিভাবে সুদান ত্যাগে বাধ্য করা যায়, সেই চিন্তায় তারা অস্থির হয়ে পড়ে। মুসলিম সৈন্যরা মরু ও আবাদী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলমানদের কি পরিমাণ সৈন্য নিহত হয়েছে, তার কোন পরিসংখ্যান কেন্দ্রের কাছে নেই। তবে এতটুকু অনুমান করা যাচ্ছে যে, শত্রুও অনেকটা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং এখন আর তাদের মিসর আক্রমণের শক্তি-সাহস নেই। কিন্তু এ পদ্ধতির যুদ্ধ স্পষ্ট কোন সুফল বয়ে আনবে না। কোন এলাকা জয় করা যাবে না। মরা আর মারা ছাড়া এ যুদ্ধের কোন ফলাফল নেই।
এমনি পরিস্থিতিতে তকিউদ্দীন তার একজন কমান্ডার মারফত সুলতান আইউবীর নিকট মৌখিক পয়গাম প্রেরণ করেন। তিনি সুলতান আইউবীকে বলার জন্য বলে দেন যে, এখন সুদান অভিযানে সাফল্য অর্জনের একমাত্র উপায়, আপনি সাহায্য প্রেরণ করুন। আমার সমস্ত সৈন্য বিভক্ত হয়ে গেরিলা অভিযান চালাচ্ছে। এই অভিযান দ্বারা সাফল্য অর্জন করতে হলে আরো সৈন্য প্রয়োজন। তকিউদ্দীন কমান্ডারকে সুলতান আইউবীর নিকট থেকে এ প্রশ্নেরও জবাব নিয়ে আসতে বলে দেন যে, সাহায্য না পেলে কি আমি সুদানে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়া সৈন্যদেরকে একত্রিত করে মিসর ফিরে যাব? বর্তমানে মিসরে যে ফৌজ আছে, তা মিসরের আভ্যন্তরীণ গোলযোগ নিরসন এবং সীমান্ত সংরক্ষণের জন্যই যথেষ্ট নয়। কাজেই তাদেরকে ভিন্ন কোন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করার প্রশ্নই আসে না। তবে সুলতান আইউবী পিছুটানে বিশ্বাসী নন। তকিউদ্দীনের সমস্যার সমাধান দেয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান।
***
তকিউদ্দীনের এই দূত সুলতান আইউবীকে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছিল বটে, কিন্তু খৃস্টান ও সুদানীরা সেখানে আরো যে একটি যুদ্ধক্ষেত্র চালু করে রেখেছিল, সে সম্পর্কে কিছু বলেনি। সম্ভবত সে যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে তার জানা ছিল না। সে তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল অনেক পরে।
তকিউদ্দীনের সৈন্যরা দশ-দশজনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সুদানের কোন কোন এলাকায় যাযাবরদের ঝুপড়ি এবং তবুও ছিল। কোথাওবা সবুজ-শ্যামল বাগান। অধিকাংশ এলাকা পতিত, অনাবাদী ও বালুকাময়।
একদিন সন্ধ্যায় তিনজন গেরিলা মুজাহিদ ফিরে এসে সিনিয়র এক কমান্ডারের সামনে উপস্থিত হয়। তাদের দুজন আহত। তারা কমান্ডারকে জানায়, আমাদের দৃলে একুশজন মুজাহিদ ছিল। কমান্ডারসহ বাইশজন। আমরা দিনের বেলা একস্থানে লুকিয়ে ছিলাম। কমান্ডার এদিক-ওদিক টহল দিচ্ছিলেন, যেন তিনি পাহারা দিচ্ছেন কিংবা কারো আগমনের অপেক্ষা করছেন। এমন সময় এক সুদানী উজ্জ্বারোহী এদিক দিয়ে পথ অতিক্রম করতে শুরু করে। আমাদের কমান্ডারকে দেখে সে থেমোয়। কমান্ডার তার নিকট এগিয়ে যান এবং তার সঙ্গে কি যেন কথা বলেন। আরোহী চলে গেলে কমান্ডার আমাদেরকে সুসংবাদ শোনান যে, এখান থেকে দুমাইল দূরে একটি গ্রাম আছে, সেখানকার অধিবাসীরা মুসলমান। আরোহী আমাদের আপন। লোক। সে আমাদেরকে সেই এলাকায় যাওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়ে গেছে। বলেছে, আমরা গেলে রাতে সেখানে আমাদের মেহমানদারী করবে এবং দুশমনের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে হামলার কাজে সহযোগিতাও করবে।
শুনে আমরা খুশী হলাম। কিছু সময় নিরাপদে থাকা ও খাওয়ার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি দুশমনের উপর হামলা করারও সুযোগ পাব, এ কম কথা নয়। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরপরই আমরা সেই গ্রাম অভিমুখে রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি, তিনটি কুঁড়ে ঘর। আশপাশে গাছ-গাছড়া এবং পানি আছে। আমাদেরকে ঝুঁপড়ির বাইরে ছাউনী ফেলতে বলা হল। কমান্ডার একটি ঝুপড়িতে ঢুকে পড়লেন। বাইরে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়া হল এবং আমাদের সবাইকে খাবার খাওয়ান হল। কমান্ডার বললেন, এবার তোমরা শুয়ে পড়; আক্রমণের সময় হলে জাগিয়ে দেব। আমরা ক্লান্ত সৈনিকরা শুয়ে পড়লাম। আমি শুয়ে পড়লেও ঘুমালাম না। বিষয়টা আমার কাছে কেমন যেন খটকা লাগছিল। হঠাৎ একটি ঝুপড়িতে একাধিক নারীর অট্টহাসির শব্দ কানে আসতে লাগল। আমি মাথা তুলে কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম। মনে সন্দেহ জাগল। আমি সেদিকে আরো মনোযোগ দিলাম। এবার স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে, আমাদের কমান্ডার ঝুঁপড়িতে দুটি সুন্দরী মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করছে। ও মদপান করছে। মেয়েগুলো গ্রাম্য পোশাক পরিহিত হলেও তাদেরকে গ্রাম্য বলে মনে হল না। কিছুক্ষণ পর একদিকে আমি চাপা পদশব্দ শুনতে পেলাম। একাধিক মানুষের চলার শব্দ। চাঁদের আলোতে দেখতে পেলাম, বেশকিছু মানুষ আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের হাতে বর্শা ও তরবারী। আমি ঝুঁপড়ির আড়ালে চলে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, এরা কারা। কিছুক্ষণ পর একজন লোক খুঁপড়িতে প্রবেশ করল এবং চাপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কাজ সেরে ফেলব কি? আমাদের কমান্ডার বললেন, ও তোমরা এসে গেছ? সবাই ঘুমিয়ে আছে, যাও সব কটাকে শেষ করে দাও।
