কমান্ডার সুলতান আইউবীকে যে কাহিনী শোনায়, সংক্ষেপে তা এই
মিসরের বর্তমান অস্থায়ী গভর্নর বাস্তবতার উপর দৃষ্টি রাখার পরিবর্তে আবেগতাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন ও নির্দেশ দেন। বস্তুত তকিউদ্দীনের আবেগ ইচ্ছা সুলতান আইউবীর আবেগ-ইচ্ছারই অনুরূপ। কিন্তু দুভাইয়ের দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার মধ্যে বেশ তফাৎ। তকিউদ্দীন যে ফয়সালা নিয়েছিলেন, সৎ উদ্দেশ্য ও ইসলামী চেতনা থেকেই নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এই সত্যটাকে উপেক্ষা করেছেন যে, বিচার-বিবেচনা ছাড়া দুশমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নাম যুদ্ধ-জিহাদ নয়। তিনি সুদানে নিয়োজিত তার গোয়েন্দাদের রিপোর্টও গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখেননি। তিনি একটি বিষয়ই মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে, খৃস্টান কমান্ডাররা সুদানীদেরকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং সুদানীরা মিসর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তকিউদ্দীন দুশমনকে রণসাজে প্রস্তুত অবস্থায়ই কাবু করে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো বিষয় খুঁটিয়ে দেখেননি যে, সুদানীদের সামরিক শক্তি কতটুকু, আক্রান্ত হলে তারা কি পরিমাণ শক্তি নিয়ে মোকাবেলা করবে, তাদের অস্ত্রের পরিমাণ কি, আরোহী সৈন্য কতজন, পদাতিক কজন ইত্যাদি। সবচে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তিনি ভেবে দেখেননি, তা হল সুদান আক্রমণ করলে পথের দূরত্ব কতটুকু হবে এবং রসদের ব্যবস্থা কিভাবে হবে?
তকিউদ্দীনের এই অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের দুটি বিরূপ ফল শুরুতেই সামনে এসে যায়। প্রথমত সুদানীরা- অন্য শব্দে খৃস্টান সৈন্যরা তাকে সীমান্তে প্রতিরোধ করেনি। তারা তকিউদ্দীনকে সুদানের সেই অঞ্চল পর্যন্ত যাওয়ার পথ ছেড়ে দেয়, যেটি পানিহীন বিশাল মরু প্রান্তর। তকিউদ্দীন অবলীলায় সেই এলাকায় পৌঁছে যান। দ্বিতীয়ত তকিউদ্দীনের বাহিনী মূলত সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কৌশল অনুপাতে যুদ্ধ করায় অভ্যস্ত, যারা সংখ্যায় সামান্য হয়েও দুশমনের বিশাল বিশাল বাহিনীকে তছনছ করে দিতে পারঙ্গম। এই বাহিনীকে সুলতান শুধু নিজেই ব্যবহার করতে পারতেন। সুলতান আইউবী সব সময় মুখোমুখি সংঘাত পরিহার করে চলতেন। কিন্তু তকিউদ্দীন ওসবের ধার ধারলেন না। তার এই বাহিনীতে অভিজ্ঞ ও জানবাজ গেরিলা যোদ্ধাও আছে। কিন্তু এদের সঠিক ব্যবহার জানতেন সুলতান আইউবী। এদের নিয়ে সুদান পৌঁছানোর পর অবস্থা এমন হল যে, তকিউদ্দীনের সমস্ত সৈন্য একটি মাত্র বাহিনীতে-ই সীমাবদ্ধ হয়ে রইল। দুশমন তকিউদ্দীনকে তাদের পছন্দনীয় জায়গায় নিয়ে যায় এবং তার বাহিনীর উপর সুলতান আইউবীর-ই ধারায় গেরিলা হামলা শুরু করে দেয়। তকিউদ্দীন তার জানোয়ার ও জওয়ানদের জন্য এক ফোঁটা পানিও পেলেন না। তার গেরিলা বাহিনীর কমান্ডাররা তাকে বলল, আপনি আমাদেরকে ময়দানে স্বাধীন ছেড়ে দিন। আমরা নিজের মত করে অপারেশন চালিয়ে যাই। কিন্তু তকিউদ্দীন তা মানলেন না। তিনি ভাবলেন, এতে বাহিনীর মধ্যে বিশৃংখলা দেখা দিবে, কেন্দ্রীয় কমান্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে।
যখন রসদের সমস্যা সামনে এল, ততক্ষণে তকিউদ্দীন বুঝতে পারলেন, তিনি অনেক দূর চলে এসেছেন, যেখানে রসদ পৌঁছতে কয়েকদিন সময় লেগেযাবে এবং রসদ বহনের পথও নিরাপদ নয়। আবহাওয়া এতই প্রতিকূল যে, তকিউদ্দীন সংবাদ পেয়ে যান, দুশমন তার রসদ ধ্বংস করার আগেই বাতাসের তোড়ে তার সমস্ত রসদ ও রসদবাহী পশুগুলো উড়ে গেছে।
এই দুর্ঘটনার পর গেরিলা বাহিনীর এক কমান্ডার ও তকিউদ্দীনের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়ে যায়। কমান্ডার বলল, আমি লড়াই করতে এসেছি লড়াই করব; কিন্তু এভাবে নয় যে, দুশমন কমান্ডো হামলা চালাবে, রসদপাতি শেষ হয়ে গেছে আর আমরা কেন্দ্রীয় কমান্ডের পাবন্দ হয়ে বসে বসে মার খাব। তকিউদ্দীন আদেশের সুরে কঠোর ভাষায় জবাব দিলেন। প্রত্যুত্তরে কমান্ডার বলল, আপনার মনে রাখা উচিত যে, আপনি তকিউদ্দীন- সালাহুদ্দীন নন। আমরা সেই প্রত্যয় ও সেই পদ্ধতিতে লড়াই করব, যেভাবে লড়াই করতে আমাদেরকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী শিখিয়েছেন। আমরা গেরিলা সৈনিক। আমরা দুশমনদের রসদ ছিনিয়ে এনে নিজ বাহিনীকে খাওয়াতে অভ্যস্ত।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, কমান্ডারের এ বক্তব্যের পর তকিউদ্দীন চৈতন্য ফিরে পান। তিনি নিজের ভুল উপলব্ধি করতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারলেন, কমান্ডারের বক্তব্য কত বাস্তবসম্মত এবং মর্মস্পর্শী। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, আমি মহান আল্লাহর আযাবকে ভয় করি। আমি এই জানবাজদেরকে যারা ফিলিস্তিনে লড়াই করে এসেছে- অপমৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাই না।
তা-ই যদি হয়, তাহলে আপনার আক্রমণ করাই উচিত হয়নি- কমান্ডার বললেন- আমাদের মধ্যে একজন সৈনিকও এমন নেই, যে আল্লাহর জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত নয়। আমরা মৃত্যুর মুখোমুখি এসে পৌঁছেছি। আর মুসলমানদের এটাই শান যে, তারা মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে নিজেকে আল্লাহর নিকটবর্তী মনে করে। আপনি আবেগের তাড়নায় তাড়িত হয়ে বের হয়েছেন। আমরা দুশমনের ফাঁদে এসে পৌঁছেছি।
তকিউদ্দিন আনাড়ি নন। সুলতান আইউবীর সেই উক্তিটি তার স্মরণ আছে যে, তিনি বলেছিলেন, নিজেকে রাজা ভেবে অন্যকে আদেশ কর না এবং জিহাদের ময়দানে গিয়ে নিজের ভুল এড়িয়ে যেও না। তাই কমান্ডারের এই কঠোর মন্তব্যকে তিনি গোস্তাখী মনে করেননি এবং তৎক্ষণাৎ ঊর্ধ্বতন সব কমান্ডারকে ডেকে এনে যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা ও আগামী পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা করেন। সিদ্ধান্ত হল, কমান্ডো বাহিনীকে জবাবী আক্রমণ করার জন্য ছড়িয়ে দেয়া হবে। রসদ পরিবহনের রাস্তাও তারা নিজেদের দখলে নিয়ে আসবে। বাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে, তাদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করে দুশমনের উপর তিনদিক থেকে হামলা করা হবে।
