সুলতান আইউবী দুর্গ অবরোধকারী বাহিনীকে পূর্ব থেকেই সতর্ক করে রেখেছেন। তারা এই হামলাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত। শূন্যে ধূলোবালি উড়তে দেখেই তারা পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যায়। একসময় আত্মপ্রকাশ করে একদল অশ্বারোহী খৃস্টান সৈন্য। মুজাহিদরা হামলা প্রতিহত করার পজিশনে চলে যায়। তারা ডানে ও বাঁয়ে প্রস্তুত অবস্থায় ছিল। যেইমাত্র খৃস্টানদের ঘোড়ার বহর তাদের মধ্যখানে এসে পৌঁছায়, অমনি তারা দুদিক থেকে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতক্ষণে খৃস্টানদের এই দলটি টের পেল যে, তারা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তাদের বাহিনী পূর্বের স্থান ছেড়ে রওনা-ই হয়নি। সুলতান আইউবী নিজেই এই অভিযানের তত্ত্বাবধান করছিলেন। মোকাবেলা করার জন্য খৃস্টানরা পেছনে মোড় ঘুরায়। কিন্তু সুলতান আইউবী তাদের কৌশল আগেই ব্যর্থ করে দিয়েছেন, পেছনে সরে গিয়ে মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার জন্য তারা কোন শত্রুই খুঁজে পাচ্ছে না। আইউবীর সৈন্যরা তাদের উপর বেধড়ক তীর ছুঁড়ছে ডান-বাম ও পেছন দিক থেকে। খৃস্টান কমান্ডাররা তাদের রাহিনীটিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ করে। ফেলে। সুলতান আইউবীর কমান্ডাররা নির্দেশনা মোতাবেক তাদের মুখোমুখি। মোকাবেলা করার সুযোগই দিচ্ছে না। খৃস্টানদের ঘোড়াগুলো পরিশ্রান্ত ও ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর। তারা যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। তারা রসদের অপেক্ষা করছে। তাদের রসদ ভোর পর্যন্ত এসে পৌঁছানোর কথা।
বেলা দ্বিপ্রহর। কিন্তু এখনো খৃস্টানদের রসদ এসে পৌঁছায়নি। সংবাদ নেয়ার জন্য কয়েকজন অশ্বারোহী ছুটে যায়। কিন্তু তারা পথে মুসলিম তীরান্দাজদের আক্রমণের শিকার হয়ে নিহত হয়। গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হলেও তারা রসদের সন্ধান পেত না। তাদের রসদের বহর রাতেই সুলতান আইউবীর গেরিলাদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী তার রিজার্ভ বাহিনী থেকে আরো ফোর্স তলব করেন এবং রেমান্ডের বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা যদি খৃস্টানদের সমানও হত, তাহলে তারা হামলা করে খৃস্টানদের সমূলে নিঃশেষ করে দিতে পারত। কিন্তু সংখ্যায় মুসলমানরা নগন্য। তাই সুলতান আইউবী তার এই সামান্য জনশক্তিকে নষ্ট করতে চাইছেন না। তিনি খৃস্টান বাহিনীটিকে ঠেলে ঠেলে পার্বত্য এলাকায় নিয়ে গিয়ে নিজের ঘেরাওয়ে নিয়ে ফেলেন। তিনি জানতেন, সময় যত গড়িয়ে যাবে, খস্টানরা তত হতাশ ও শক্তিহীন হয়ে পড়বে। কিন্তু খৃস্টানদেরকে ঘেরাওয়ে নিয়ে ফেলে তিনি। নিজেও বেশ বেকায়দায় পড়ে যান। কারণ, ঘেরাও বহাল রাখার জন্য তার বহু সৈন্য এখানে এমনভাবে আটকা পড়ে গেছে যে, তাদের দিয়ে অন্য কোন কাজ করান যাচ্ছে না।
এলাকায় পানি আছে, যা বেশ কিছুদিন পশুদের বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হবে। আর সৈন্যদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আছে আহত ঘোড়া ও উটের গোশত। সুলতান আইউবী নগরীর অবরোধ পরিপূর্ণ করে ফেলার নির্দেশ দেন। খৃস্টান বাহিনী কোথাও স্থির দাঁড়াতে পারছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আক্রমণের মোকাবেলা করতে হচ্ছে তাদের। এভাবে দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে। সুলতান দুর্গ ও নগরীর চারপাশে ঘুরে-ফিরে দেখছেন, কোন দিক দিয়ে প্রাচীর ভাঙ্গার সুযোগ পাওয়া যায় কিনা।
***
অবরোধের ষোল কিংবা সতেরতম দিন। সন্ধ্যাবেলা। সুলতান আইউবী নিজ তাঁবুতে বসে নায়েব ও অন্যান্যদের সঙ্গে দুর্গের প্রাচীর ভাঙ্গার কৌশল নিয়ে কথা বলছেন। এমন সময় এক রক্ষী ভেতরে প্রবেশ করে সংবাদ দেয়, সুদানের রণাঙ্গন থেকে দূত এসেছেন। সুলতান আইউবী চমকে উঠে বললেন, তাকে এক্ষুণিভেতরে পাঠিয়ে দাও। আল্লাহ করুন, লোকটা ভাল সংবাদ এনে থাকুক।
দূত তাঁবুতে প্রবেশ করে। সুলতান আইউবী দেখেই চিনে ফেললেন, লোকটি দূত নয়- কোন এক সেনাদলের কমান্ডার। সুলতান তাকে অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ভাল সংবাদ নিয়ে এসেছ তো?… বস।
কমান্ডার না সূচক মাথা নেড়ে বলল, মহান সেনাপতি যেমন মনে করেন। আমি যে সংবাদ নিয়ে এসেছি, ইচ্ছে হলে আপনি তাকে ভালও বলতে পারেন, আবার মন্দও বলতে পারেন। ভাল এ জন্য নয় যে, আমরা সুদানে বিজয় অর্জন করতে পারিনি। আর ভাল এ কারণে বলা যায় যে, আমরা পরাজিত কিংবা পিছপা হয়নি।
তার মানে পরাজয় ও পিছুহটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাই না? সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন।
সেই লক্ষণ স্পষ্ট- কমান্ডার জবাব দেয়- আমি আপনার আদেশ নেয়ার জন্য এসেছি যে, এখন আমরা কী করব? আমাদের স্পেশাল সৈন্যের একান্ত প্রয়োজন। যদি তার ব্যবস্থা না হয়, তাহলে পেছনে সরে না এসে উপায় নেই।
সুলতান আইউবীর অবর্তমানে তাঁর ভাই তকিউদ্দীন মিসরের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি সুদান ও মিসরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ফেরাউনী আমলের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে খৃস্টানদের সৃষ্ট ভয়ংকর এক ড্রামা আবিষ্কার করেছিলেন। তারপরই তিনি এই ভেবে সুদান আক্রমণ করেন যে, সেখানে মিসরের উপর আক্রমণ করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তার উপদেষ্টাবৃন্দ ও সালারগণ বলেছিলেন, কাজটা সুলতান আইউবীর অনুমতি নিয়ে করা হোক। কিন্তু তকিউদ্দীন তা না করে এই বলে সুদান আক্রমণ করে বসেন যে, তিনি সুলতানকে এর জন্য বিরক্ত করতে চান না। এখন এই কমান্ডার সংবাদ নিয়ে এল, সুদানে তারা পরাজিত হতে চলেছে। সাধারণ দূতের পরিবর্তে তকিউদ্দীন একজন কমান্ডার এ জন্য প্রেরণ করেছেন যে, সে সুলতানকে ময়দানের সঠিক চিত্র সম্পর্কে ভালভাবে অবহিত করতে পারবে। তার আগে সুলতান শুধু এতটুকু সংবাদ পেয়েছিলেন যে, তকিউদ্দীন সুদান আক্রমণ করেছে।
