সুলতান আইউবী ঘোড়া ছুটান। অপারেশনরত বাহিনীর কমান্ডারের নিকট গিয়ে বললেন, তোমার উপর এবং তোমাদের জানবাজদের উপর আল্লাহ রহম করুন। ইসলামের ইতিহাস তোমার সেই জানবাজদের আজীবন স্মরণ রাখবে, যারা আল্লাহর নামে আগুনে পুড়ে জীবন দিয়েছে। তবে এই পন্থা আপাতত বন্ধ করে দাও। পেছনে সরে যাও। এখনই এত মানুষ ও তীর নষ্ট কর না। খৃস্টানরা এই দুর্গের জন্য এত আয়োজন করে রেখেছে, যা আগে আমি কল্পনাও করিনি।
আর আমরাও এত অধিক কোরবানী দেব, যা খৃস্টানদের কল্পনার অতীত- কমান্ডার বলল- কার্ক দুর্গের প্রাচীর এখান থেকেই ভাঙ্গব এবং আপনাকে আমরা এখান দিয়েই ভেতরে নিয়ে যাব।
আল্লাহ তোমার আকাঙ্খা পূর্ণ করুন- সুলতান আইউবী বললেন- তবে আপাতত তুমি তোমার মুজাহিদদের বাঁচিয়ে রাখ। খৃস্টানরা বাইরে থেকে হামলা করতে যাচ্ছে। তোমাদেরকে সম্ভবত দুর্গের বাইরেই যুদ্ধ করতে হবে। অবরোধ শক্ত রাখ। আমরা খৃস্টানদেরকে দুর্গের ভেতরে না খাইয়ে মারব।
বাহিনীটিকে পেছনে সরিয়ে নেয়া হল। কিন্তু কমান্ডার সুলতান আইউবীকে বলল, সালারে আজমের অনুমতি হলে আমি শহীদদের লাশগুলো তুলে আনতে চাই।
হ্যাঁ, তুলে নিয়ে আস- সুলতান আইউবী বললেন- আমি কোন শহীদের লাশ যেখানে-সেখানে ফেলে রাখতে চাই না।
সুলতান আইউবী সেখান থেকে চলে যান। তার জানবাজ বাহিনীটি সঙ্গীদের লাশগুলো তুলে আনে। সে এক বিস্ময়কর দৃশ্য। যে কটি লাশ তুলে আনা হল, সে পরিমাণ মুজাহিদ নতুন করে শাহাদতবরণ করল। সুলতান আইউবী ততক্ষণে অনেক দূর চলে গেছেন। যুদ্ধের সময় তিনি তাঁর পতাকা সঙ্গে রাখেন না, যাতে দুশমনরা বুঝতে না পারে যে, তিনি এখন কোথায় আছেন। ফৌজ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়ে সুলতান এক পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়েন। তিনি ঘোড়া থেকে অবতরণ করেন এবং একটি টিলার উপর উঠে শুয়ে পড়েন, যাতে দুশমন তাকে দেখতে না পায়। এখন তিনি কার্ক দুর্গ ও নগরীর প্রাচীর দেখতে পাচ্ছেন। অন্তত দীর্ঘ এক মাইল এলাকা এখন তার চোখের সামনে। খানিক পর তিনি শয়ন থেকে উঠে দাঁড়ান এবং সাবধানে চারদিক ঘুরে-ফিরে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
সূর্য ডুবে গেছে। সুলতান আইউবী সেখানেই আছেন। কিছুক্ষণ পর সংবাদ এল, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক পদাতিক ও অশ্বারোহী তীরন্দাজ বাহিনী এগিয়ে আসছে। তিনি দূতকে বললেন, কমান্ডারদের ডেকে আন। মুহূর্ত মধ্যে কমান্ডাররা এসে সুলতানের সামনে উপস্থিত হল। কমান্ডো বাহিনীর কমান্ডারও আছে তাদের সঙ্গে। পথ-নির্দেশনা দিয়ে সুলতান আইউবী তাকে অপারেশনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তারপর অন্যান্য কমান্ডারদের দিক-নির্দেশনা দিতে শুরু করেন।
***
মধ্যরাত। দূর থেকে ঘোড়ার পদশব্দ কানে আসতে শুরু করেছে, যেন বাঁধভাঙ্গা মহাপ্লাবন ধেয়ে আসছে। জ্যোৎস্না রাত। চাঁদের আলোয় ফকফক করছে চারদিক। খৃষ্টানদের বিশাল এক অশ্বারোহী বাহিনী পার্বত্য এলাকার খানিক দূরে এসে পড়েছে। তাদের পেছনে উষ্ট্রারোহী বাহিনী। তাদের সংখ্যার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অমুসলিম ঐতিহাসিকদের মতে, তিন হাজারের কম। মুসলিম ঐতিহাসিকদের মতে পাঁচ থেকে আট হাজার। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা ছিল দশ থেকে বার হাজারের মধ্যে। তাদের কমান্ডার ছিল প্রখ্যাত খৃষ্টান সম্রাট রেমান্ড। দুজন ঐতিহাসিকের মতে কমান্ডারের নাম রেনা। তবে সঠিক তথ্য হল, রেনাল্ট নয়- রেমান্ডই ছিল সেই বাহিনীর কমান্ডার। এই অভিযানের লক্ষ্যে এই বাহিনীটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত দূরবর্তী এক স্থানে তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছিল। আজ রাত-ই কিংবা কাল প্রত্যূষে তারা সুলতান আইউবীর কার্ক অবরোধকারী বাহিনীটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
খৃস্টান আরোহীরা ঘোড়া ও উটের পিঠ থেকে অবতরণ করে। প্রতিটি ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধা খাবারের থলে। আরোহী সৈন্যদের নির্দেশ দেয়া হল, তারা যেন নিজ নিজ পশুর কাছে থাকে এবং বেশী সময়ের জন্য ঘুমিয়ে না পড়ে। তাদের পশুপালের দানা-পানি পেছনে আসছে। খৃস্টানদের পরিকল্পনা ছিল, মুসলমানদের উপর পেছন থেকে আচানক হামলা করে ঘোড়াগুলোকে দুর্গের ভেতর থেকে পানি পান করিয়ে আনবে। সুলতান আইউবীর গুপ্তচররা খৃস্টান বাহিনীর গতিবিধির প্রতি কড়া নজর রাখছে। খৃস্টান সেনাদের সংখ্যাধিক্য দেখে তারা ঘাবড়ে যায়।
খৃস্টান সৈন্যরা নিজ নিজ বাহনে আরোহন ও তরবারী-বর্শা প্রস্তুত রাখার নির্দেশ পায়। এটি মূলত হামলা করারই নির্দেশ। বিশাল এলাকা জুড়ে সুশৃঙ্খল সারিবদ্ধভাবে তারা সম্মুখপানে অগ্রসর হতে শুরু করে। কিন্তু যেইমাত্র সামনের সারিটি ঘোড়ার পিঠে কষাঘাত করে ছুটতে উদ্যত হয়, অমনি পেছন থেকে বৃষ্টির মত তীর আসতে শুরু করে। যেসব আরোহী সৈন্যের গায়ে তীর বিদ্ধ হয়, তারা কেউ ঘোড়র উপরই মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আর যেসব ঘোড়া তীরবিদ্ধ হয়, তারা নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে। উটগুলোও যেইমাত্র চলতে শুরু করল, অমনি তাদের মধ্যেও হুলস্থুল শুরু হয়ে যায়। শা শা করে তীর এসে বিদ্ধ হতে থাকে তাদের গায়ে। খৃস্টান কমান্ডার বুঝেই উঠতে পারলেন না যে, হসটা কী? তার সৈন্যবিন্যাস এভাবে বিশৃঙ্খল হয়ে যাচ্ছেই বা কেন? তিনি রাগের মাথায় চীৎকার শুরু করে দেন। দিশেহারা উট-ঘোড়াগুলো পুরো বাহিনীর মধ্যে চরম এক আতংক ছড়িয়ে দেয়। ভোরের আলো ফোঁটার পর রেমান্ড টের পেলেন যে, তিনি সুলতান আইউবীর গ্যাড়াকলে আটকা পড়েছেন। মুসলমানদের সংখ্যা কত, তা তার জানা ছিল না। তার ধারণা, সংখ্যায় মুসলমানরা অনেক। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য তিনি মোটেই প্রস্তুত নন। তিনি আক্রমণ অভিযান স্থগিত ঘোষণা করে দেন। কিন্তু ততক্ষণে তার সামনের সারির সৈন্যরা সেই স্থান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যেখানে তার পুরো বাহিনীর পৌঁছানোর কথা।
