সুলতান আইউবী তার দুতিনজন কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠালেন। তাদেরকে নতুন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে বললেন
খৃস্টানরা আমাদের ফাঁদে এগিয়ে আসছে। দুর্গের পেছন দিকে আমরা যে স্থানটুকু অবরোধের বাইরে রেখেছি, তা আরো সম্প্রসারিত করে দাও। ডান ও বামের বাহিনীকে জানিয়ে দাও যে, তোমাদের পেছন থেকে হামলা আসছে। পার্শ্ব বাহিনীকে আমাদের মধ্যস্থলে এসে পড়ার সুযোগ করে দাও। খবরদার, কোন তীরন্দাজ আদেশ ছাড়া যেন তীর না ছুঁড়ে।
এসব দিক-নির্দেশনা প্রদান করে সুলতান আইউবী নিজের স্পেশাল পদাতিক ও অশ্বারোহী তীরন্দাজ বাহিনীকে সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে সেই স্থানে পৌঁছে যাওয়ার আদেশ দেন, যা খৃস্টানদের সম্ভাব্য আক্রমণের নিকটবর্তী : জায়গা। এলাকাটা না সমতল, না বালুকাময়। এলাকার কোথাও টিলা, কোথাও বড় বড় পাথর খণ্ড, কোথাও গুহা। সুলতান আইউবী কমান্ডো বাহিনীর কমান্ডারকেও ডেকে আনান। তার উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন যে, খৃস্টান ফৌজের পেছনে অমুক পথে তাদের রসদ আসছে। সেই রসদের বহর রাতেই পথে ধ্বংস করতে হবে। এ জাতীয় আরো কিছু নির্দেশনা দিয়ে সুলতান আইউবী তাঁবু থেকে বেরিয়ে যান এবং ঘোড়ায় চড়ে বসেন। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে সঙ্গে করে সুলতান রণাঙ্গন অভিমুখে রওনা হয়ে যান।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আবেগপ্রবণ মানুষ নন। তিনি দূর থেকে অবরোধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন এবং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বললেন, খৃস্টানদের হাত থেকে এই দুর্গ ছিনিয়ে আনা সহজ নয়। অবরোধ দীর্ঘসময় পর্যন্ত বহাল রাখতে হবে। সুলতান দেখলেন যে, দুর্গের সামনের প্রাচীর থেকে বৃষ্টির মত তীরবর্ষণ হচ্ছে। দুর্গের ফটক পর্যন্ত পৌঁছা অসম্ভব। তার বাহিনীর অবস্থান তীরের আওতার বাইরে। কাজেই জবাবী তীরন্দাজী অনর্থক। সুলতান আইউবী দুর্গের সম্মুখ থেকে এক পার্শ্বের দিকে চলে যান। সেখানে তিনি বিস্ময়কর এক দৃশ্য দেখতে পান। তার বাহিনীর একটি ইউনিট বৃষ্টির ন্যায় দুর্গের প্রাচীরের উপর তীর নিক্ষেপ করছে। অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করছে ছয়টি মিনজানিক। প্রাচীরের উপর যেখানে তীর ও অগ্নিগোলা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, সেখানে কোন খৃস্টান সেনা চোখে পড়ছে না। তারা পেছনে সরে গেছে। সুলতান আইউবী দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা অবলোকন করছেন। এ সময়ে তার বাহিনীর চল্লিশজন সৈনিক হাতে বর্শা ও কোদাল তুলে নিয়ে দ্রুতগতিতে প্রাচীরের দিকে ছুটে যায়। তারা প্রাচীরের সন্নিকটে পৌঁছে যায়। দুর্গের প্রাচীর পাথর ও মাটি দ্বারা নির্মিত। তারা প্রাচীর ভাঙ্গতে শুরু করে। প্রাচীরের উপরে তীর ও আগুনের গোলাবর্ষণ এ জন্যই চলছিল যে, যাতে প্রাচীর ভাঙ্গার সময় দুশমন উপর থেকে তীর ছুঁড়তে না পারে।
সুলতান আইউবীর মুখ থেকে অলক্ষ্যে বেরিয়ে আসে শাবাশ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠেন তিনি। দুর্গের প্রাচীরের উপর হট্টগোলের শব্দ শুনতে পান। সুলতানের জানবাজরা যে স্থানে প্রাচীর ভাঙ্গছিল, ঠিক তার সোজা প্রাচীরের উপর হঠাৎ বেশকিছু খৃস্টান সৈন্যের মাথা ও কাঁধ আত্মপ্রকাশ করে। পরপরই বড় বড় বালতি ও ড্রাম চোখে পড়ে। প্রাচীরের অপর দিক থেকে মাথা জাগিয়েই খৃস্টান সৈন্যরা বালতি ও ড্রামগুলো প্রাচীরের উপর দিয়ে বাইরের দিকে উল্টিয়ে ফেলে দেয়। সেগুলো থেকে জ্বলন্ত কাঠ ও অঙ্গার বেরিয়ে আসে। এগুলো নীচে প্রাচীর ভাঙ্গার কাজে রত মুজাহিদদের উপর নিক্ষিপ্ত হয়। দূরের মুজাহিদরা সামনে এগিয়ে গিয়ে তীর ছুঁড়তে শুরু করে। তাদের তীরের আঘাতে বেশকিছু খৃস্টান সেনা ঘায়েল হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীরের অন্য একদিক থেকে অনেকগুলো তীর মুজাহিদদের দিকে ধেয়ে আসে। তাতে তীরন্দাজ মুজাহিদদের অনেকে আহত হয়, অনেকে শহীদ হয়ে যায়। তারপর উভয় দিক থেকে বৃষ্টির মত এত অধিক তীর আসতে শুরু করে যে, যেন শূন্যে তীরের জাল বোনা হচ্ছে। জানবাজদের প্রাচীর ভাঙ্গার কাজ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু কাজটি বেশ দুরূহ। প্রাচীরের উপর দিক অপেক্ষা নীচের দিকটা বেশী প্রশস্ত। তাদের গায়ে উপর থেকে তীর ছোঁড়া সম্ভব নয় বটে, কিন্তু তাদের উপর জ্বলন্ত কাঠ ও অঙ্গার নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। জ্বলন্ত কয়লাভরা বালতি ও ড্রাম নিক্ষেপকারী খৃস্টান সেনারা কেউ-ই বাহ্যত মুসলিম তীরান্দাজদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু তারা তীরের আঘাত খেয়ে নীচে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই বাইরের দিকে আগুন ফেলে দিচ্ছে।
একদিকে উপর থেকে আগুন পড়ছে, অপরদিকে সুলতান আইউবীর জানবাজরা নিক্ষিপ্ত আগুন উপেক্ষা করে প্রাচীর ভেঙ্গে চলেছে। আরেকদিকে দুপক্ষের মধ্যে চলছে তীর বিনিময়। অবশেষে প্রাচীর ভাঙ্গার কাজে রত মুজাহিদরা আগুনের কাছে ঘায়েল হয়ে যায়। আগুনে অনেকের গা ঝলসে যায়। তাদের কয়েকজন এমন অবস্থায় পেছনে ছুটে যায় যে, তাদের গায়ের কাপড়-চোপড়ে আগুন জ্বলছে। তারা প্রাচীরের সন্নিকট থেকে সরে যাওয়া মাত্র উপর থেকে তীর আসতে শুরু করে। তীর তাদের পিঠে বিদ্ধ হয়। তীরের আঘাত খেয়ে তাদের সব কজনই শাহাদাতবরণ করে।
এবার অপর দশজন জানবাজ মুজাহিদ প্রাচীর ভাঙ্গার জন্য এগিয়ে আসে। উপর থেকে দুশমনের নিক্ষিপ্ত তীর উপেক্ষা করে তারা প্রাচীরের নিকটে পৌঁছে যায়। তারা প্রাচীর ভাঙ্গার কাজ অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যায়। উপর থেকে তাদের গায়েও আগুনের বালতি ও ড্রাম নিক্ষেপ করা হয়। নিক্ষেপকারীদের কয়েকজন এতো উপরে উঠে আসে যে, তারা বুকে মুজাহিদদের তীর নিয়ে পেছন দিকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে সামনের দিকে প্রাচীরের বাইরে পড়ে যায় এবং নিজেদেরই নিক্ষিপ্ত আগুনে পুড়ে ছটফট করে মরে যায়। তবে প্রাচীর ভাঙ্গার কাজে রত এই মুজাহিদদেরও সবাই শহীদ হয়ে যায়।
