এটা একজন ঈমান-বিক্রেতার গাদ্দারীর ফল। একজন মাত্র গাদ্দার ইসলামের এত বিশাল একটি বাহিনীকে ব্যর্থ করে দিল। কেউ আল্লাহর নামেনিজের জান কোরবান করছে, আবার কেউ নিজের অমূল্য ঈমানটা কাফেরদের পায়ে উৎসর্গ করছে। গাদ্দাররা ইসলামের ইতিহাসের ধারাই পাল্টে দিচ্ছে…!
বলতে বলতে সুলতান ক্ষুব্ধ হয়ে বসা থেকে ওঠে দাঁড়ান এবং প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে বললেন, অতি শীঘ্রই আমি কার্ক জয় করব এবং ঐ গাদ্দারদের উপযুক্ত শাস্তি দেব।
সুলতান আইউবীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগের অফিসার জাহেদান কক্ষে প্রবেশ করেন। সুলতান তখন বলছিলেন
আজ রাতেই অবরোধ সম্পূর্ণ হওয়া চাই। কার্কের পেছন দিকে কোন্ বাহিনীকে পাঠাবে, একটু পরেই আমি তা জানাব।
ব্যাঘাত সৃষ্টি করার জন্য ক্ষমা চাই মহামান্য আমীরে মেসের- জাহেদান বললেন- বোধ হয় এখন আর আপনি অবরোধ পরিপূর্ণ করতে পারবেন না। আমরা সময় নষ্ট করে ফেলেছি।
তুমি কি নতুন কোন সংবাদ নিয়ে এসেছ? সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন।
দুশমনকে অসচেতন রেখে যেরূপ সফলতার সাথে অগ্রসর হয়েছিলেন, তার পূর্ণ সাফল্য আপনি উঠাতে পারলেন না- জাহেদান জবাব দেন।
তিনি এমন অবলীলায় কথা বলছিলেন, যেন নিম্নপদস্থ অধীন কাউকে দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। এমনটা হবেই-বা না কেন। সুলতান তার সব সিনিয়র-জুনিয়র কমান্ডার ও প্রশাসনের সব বিভাগের কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বলে রেখেছেন যে, তারা যেন তাকে রাজা ভেবে মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম না করে। সাহসিকতা ও পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে পরামর্শ দেয় এবং খোলাখুলি সমালোচনা করে। জাহেদান সুলতানের সেই নির্দেশনার উপরই আমল করছিলেন। তাছাড়া তিনি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানও বটে। তিনি এমন একটি চোখ, যে চোখ অন্ধকারেও দেখে। তিনি এমন একটি কান, যে কান শত শত মাইল দূরের ফিসফিস কানাঘুষাও শুনতে পায়। তিনি কত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তা সম্পূর্ণ অবগত। সুলতান জানেন, সফল গুপ্তচরবৃত্তি ছাড়া যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। বিশেষত খৃস্টানরা যেখানে সালতানাতে ইসলামিয়ায় গুপ্তচর ও নাশকতাকারীদের জাল বিছিয়ে রেখেছে, সেখানে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অতিশয় উন্নত, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ একটি গোয়েন্দা বাহিনীর একান্ত প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ সফল। তার গোয়েন্দা বিভাগের তিনজন অফিসার আলী বিন সুফিয়ান, তাঁর দুনায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ও জাহেদান হলেন জানবাজ গুপ্তচর। বিচক্ষণতার সাথে তারা খৃস্টানদের বহু পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
আপনার তো জানা ছিল যে, খৃস্টানরা কার্কের প্রতিরক্ষা শক্ত করার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সৈন্য কার্ক থেকে খানিক দূরে প্রস্তুত করে রেখেছে জাহেদান বললেন- আপনাকে এ তথ্যও দেয়া হয়েছিল, এই বাহিনীটিকে বাইরে থেকে অবরোধ ভাঙ্গার কাজে ব্যবহার করা হবে। আমার গুপ্তচরদের তথ্যাদি দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, খৃস্টানরা দুর্গের বাইরে লড়াই করবে। তারপরও আপনি সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ পরিপূর্ণ করেননি। তা থেকে দুমশন উপকৃত হয়েছে।
তা তারা কি আক্রমণ করে ফেলেছে? বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আজ সন্ধ্যা নাগাদ তাদের বাহিনী সেই স্থান পর্যন্ত এসে পৌঁছবে, যেখানে আমাদের কোন সৈন্য নেই- জাহেদান জবাব দেন- আমার গুপ্তচররা যেসব তথ্য নিয়ে এসেছে, তার সারমর্ম হল, খৃস্টান বাহিনী থাকবে অশ্বারোহী ও উজ্জ্বারোহী। এ অভিযানে তাদের পদাতিক বাহিনী থাকবে কম। তারা আমাদের অবরোধের স্থানগুলোতে এসে পৌঁছবে এবং ডানে-বাঁয়ে হামলা করবে। তার ফল এছাড়া আর কী হবে যে, আমাদের অবরোধ ভেঙ্গে যাবে? খৃস্টানরা সংখ্যায় বিপুল বলেও সংবাদ পেয়েছি।
আমি তোমাকে আর তোমার সেইসব গোয়েন্দাদের ধন্যবাদ জানাই, যারা এসব তথ্য সংগ্রহ করে এনেছে- সুলতান আইউবী বললেন- এটা কত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, আমি তা বুঝি। তবে আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, যেসব খৃস্টান সৈন্য আমাদের অবরোধ ভাঙ্গতে এবং শূন্যস্থান পূরণ করতে আসছে, আমি তাদেরকে সেই শূন্যস্থানেই খুইয়ে ফেলব। আল্লাহর সাহায্যের উপর আমার ভরসা আছে। তোমাদের কেউ যদি গাদ্দার না হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়দান করবেন।
এখনো সময় আছে- এক নায়েব বললেন- আপনার আদেশ পেলে আমরা এক্ষুণি তিন-চারটি ইউনিট পাঠিয়ে দিচ্ছি এবং অবরোধের শূন্যস্থানগুলো পূরণ করে ফেলছি। এতে খৃস্টানদের হামলা ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ।
সুলতান আইউবীর চেহারায় অস্থিরতার সামান্য ছাপও নেই। তিনি জাহেদানকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার রিপোর্ট যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে কি তুমি বলতে পারবে যে, খৃস্টানরা ঠিক কোন্ সময়টিতে আক্রমণের স্থানে পৌঁছবে?
তাদের অগ্রযাত্রা বেশ দ্রুত- জাহেদান জবাব দেন- তবুও রসদ তাদের সঙ্গে আসছে না; আসছে তাদের পেছনে। এতে বুঝা যাচ্ছে, পথে তারা কোথাও বিরতি দেবে না। যদি তারা এ গতিতেই অবিরাম এগুতে থাকে, তাহলে দুপুররাত নাগাদ তারা হামলার স্থলে পৌঁছে যাবে।
আল্লাহ রহম করুন, যেন তারা পথে কোথাও না থামে- সুলতান আইউবী বললেন- কিন্তু তারা এসেই তো আর ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত উট-ঘোড়া নিয়ে হামলা করবে না। হামলার স্থানে এসে তারা পশুদেরকে দানা-পানি গ্রহণ ও বিশ্রামের সুযোগ দেবে। এই অবসরে তারা দেখে নেবে যে, আমাদের অবরোধে কোন ফাঁক-ফোকড় আছে কিনা। খৃস্টানরা এত নির্বোধ নয় যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি না বুঝেই হামলা করে বসবে।
