.
খৃস্টানদের ফাঁদে এসে আটকা পড়েছে ওসমান বাহিনী। সংখ্যায় খৃস্টানরা বিপুল। জানবাজ মুসলিম বাহিনীটি নিজেদের সামলে নেয়ার আগেই বেষ্টনীতে পড়ে গেছে খৃস্টানদের। প্রদীপ জ্বলে উঠে চারদিকে। আলোকিত হয়ে যায় সমগ্র এলাকা। মুসলমানদের হাতে খনন-যন্ত্র, বর্শা ও খঞ্জর। পালাবার কোন সুযোগ নেই তাদের। গ্যাড়াকলে আটকা পড়ে গেছে দুঃসাহসী এই মুসলিম জানবাজ বাহিনীটি। এগারজন মেয়ে আছে দলে। খৃস্টান কমান্ডার উচ্চকণ্ঠে বলল, মেয়েগুলোকে জীবিত গ্রেফতার করে নাও। জানবাজদের একজন ঘোষণা করল, মুজাহিদগণ! পালাবে না কিন্তু। মেয়েগুলোকে একজন একজন করে সঙ্গে রেখে লড়াই চালিয়ে যাও।
দুদলে যুদ্ধ শুরু হল। তীব্র এক রক্তক্ষয়ী লড়াই। মুসলমানদের সব কজনই প্রশিক্ষিত লড়াকু। সংখ্যায় নগন্য হওয়া সত্ত্বেও তারা খৃস্টানদের অস্থির করে তুলে। বীর বিক্রমে লড়াই করছে মেয়েরাও। উত্তেজিত করছে যুবকদের। তাদের ধরতে আসা বেশ কজন খৃষ্টানকে খঞ্জরের আঘাতে যমের হাতে তুলে দেয় তারা।
ইতিমধ্যে এসে পড়ে খৃস্টানদের আরো দুপ্লাটুন সৈনিক। যুদ্ধ চলছে ঘোরতর। ভেসে আসে উচ্চকিত এক নারীকণ্ঠ। বেরিয়ে যাও ওসমান! ওসমান তুমি যে করে তোক পালাও।
এটি রাইনির কণ্ঠ। প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছে ওসমান। একজন খৃস্টান চলে আসে তার সামনে। ওসমানের হাতে খঞ্জর আর খৃস্টান সৈনিকটির হাতে তরবারী। এই বুঝি শেষ হয়ে গেল ওসমান। হঠাৎ- নিতান্ত-ই হঠাৎ একটি খঞ্জর এসে ঢুকে যায় খৃস্টান সৈনিকের পিঠে। খৃস্টান লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। ছুটে পড়ে যায় হাতের তরবারীটা। এটি রাইনির খঞ্জর। ওসমানকে তরবারীর আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য রাইনি খঞ্জর সেঁধিয়ে দিল তার এক স্বজাতির পিঠে। ছুটে আসে আরেক খৃস্টান। তুলে নেয় মাটিতে পড়ে থাকা তরবারীটা। ঝাঁপিয়ে পড়ে রাইনির উপর।
রাইনির সাহায্যে এগিয়ে যায় ওসমান। মোড় ঘুরিয়ে দাঁড়ায় খৃস্টান। আঘাত হানে ওসমানের উপর। তরবারীর আঘাত খেয়ে ওসমান পড়ে যায় মাটিতে। শহীদ হয়ে যায় ওসমান।
একজন একজন করে শহীদ হয়ে গেছে সব কজন জানবাজ। বেঁচে আছে শুধু দুজন। দুটি মেয়ে। খৃস্টানদের ঘেরাওয়ে এখন আবদ্ধ তারা। হাতে তাদের খঞ্জর। ঘেরাও সংকীর্ণ হয়ে আসে ধীরে ধীরে। খৃস্টানরা অস্ত্রসমর্পণ করতে বলে তাদের। পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে অসহায় মেয়ে দুটো। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে চোখের ইশারায়। জীবন্ত ধরা খাওয়া যাবে না। আত্মহত্যা করে হলেও খৃস্টান পশুদের হাত থেকে সম্ভ্রম রক্ষা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে সতীর্থদের।
মুহূর্তের মধ্যে হাতের খঞ্জর বুকে স্থাপন করে মেয়ে দুটো। তারপর সেঁধিয়ে দেয় নিজ নিজ হৃদপিন্ডে। একই সময়ে দুজন ধড়াম করে পড়ে যায় মাটিতে।
খৃস্টানদের হাতে আহত অবস্থায় বন্দী হয় রাইনি। ওসমানকে বাঁচাতে পারল না মেয়েটি। এই দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেছে সে।
.
দুর্গের দেয়াল ভাঙ্গার আশা শেষ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে ভিতরের মুসলমানদের তৎপরতা। শহীদ হয়ে গেছে আইউবীর প্রেরিত পনেরজন জানবাজ। শাহাদাতবরণ করেছেন বারজিস। কিন্তু শুধু এ কজন-ই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একমাত্র ভরসা নয়। কার্ক দুর্গের পতন ঘটিয়েই ছাড়বেন তিনি। অবরোধের সবেমাত্র দ্বিতীয় দিন। অপরদিকে খৃস্টনরাও সংকল্পবদ্ধ। কার্ক দুর্গের দখল তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে ছাড়বে না কিছুতেই।
৩.১ ফিলিস্তীনে আসব আমি
ফিলিস্তীনে আসব আমি
খৃস্টানদের চোখে ধূলি দিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী দুর্গ অবরোধ করে ফেললেন। খৃস্টানরা যখন টের পেল, ততক্ষণে সুলতান আইউবী কার্ক অবরোধ করে ফেলেছেন। কিন্তু সেই অবরোধ ছিল অসম্পূর্ণ- ত্রিমুখী। গুপ্তচররা সুলতান আইউবীকে নিশ্চয়তা দিয়েছিল যে, তিনি আগেভাগেই কার্ক শহরে যে কমান্ডোদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা ভেতর থেকে দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলবে। কিন্তু অবরোধের চতুর্থ দিন ভেতর থেকে এসে দূত সুলতানকে সংবাদ দিল যে, আপনার প্রেরিত কমান্ডো বাহিনী এবং কয়েকজন স্থানীয় মুসলিম নাগরিক কার্কের প্রাচীর ভাঙ্গতে গিয়ে শহীদ হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন মুসলিম মেয়েও রয়েছে। আছে একটি খৃস্টান মেয়েও। সুলতান আইউবী এ তথ্যও পেলেন যে, কে একজন ঈমান-বিক্রেতা নামধারী মুসলমান আপনবেশে কমান্ডোদের দলে ভিড়ে তথ্য নিয়ে খৃস্টানদের কাছে ফাঁস করে দেয়। ফলে খৃস্টানরা অভিযানের প্রাক্কালে ওঁৎ পেতে দলের সব কজন সদস্যকে হত্যা করে ফেলে। সুলতান আইউবীকে এ সংবাদও প্রদান করা হয় যে, এখন ভেতর থেকে প্রাচীর ভাঙ্গার আর কোন আশা নেই।
খৃস্টানরা দেখতে পেল, প্রাচীর ভাঙ্গার অভিযানে নিহতরা কার্কের-ই মুসলিম যুবক-যুবতী। সেই সূত্র ধরে তারা গণহারে মুসলমানদের ধর-পাকড় শুরু করে দেয়। মুসলিম মহিলারাও তাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়নি। যুবকদেরকে ধরে ধরে বেগার ক্যাম্পে নিক্ষেপ করে। বৃদ্ধদেরকে নিজ নিজ ঘরে এবং যুবতী মেয়েদেরকে দুর্গের সামরিক ব্যারাকে বন্দী করে রাখে। খৃস্টানদের হাতে বন্দী হয়ে কতিপয় মেয়ে আত্মহত্যাও করে ফেলে। কারণ, কাফেররা তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, তা তাদের জানা ছিল। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীও ধারণা করলেন যে, এর জন্য কার্কের মুসলমানদের চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হবে। জানবাজদের সংবাদ শুনে তিনি তার নায়েবদের উদ্দেশে বললেন
