আপনি খানিক পরে আবার আসুন। আব্বাকে একটু ঘুমুতে দিন। অনুযোগের স্বরে বলল রাইনি।
কিন্তু যেতে চাচ্ছে না দালালটা। খৃস্টানদের খুশী করে পুরস্কার গ্রহণ করার এটি তার এক মোক্ষম সুযোগ। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছে না লোকটা। লোকটা যে কুরআনের পরিবর্তে ক্ৰশের অফাদার, বিষয়টা জানে না মুসলমানরা।
.
তথ্যটা ভুল নয়। আজ রাত-ই প্রাচীর ভাঙ্গার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মুসলিম যুবক ও কমান্ডোরা। এ গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিল বেশ কজন আলেম-ইমাম। ছিল এই দালাল মুসলমানটাও। সবচে বেশী আবেগ জাহির করেছিল এই লোকটা। লোকটা দুশমনের পোষা সাপ হতে পারে কল্পনাও করেনি কেউ।
ফিরে যেতে চাইছে না লোকটা। ভাবনায় পড়ে গেল রাইনি। মনে বুদ্ধি আঁটে মেয়েটা। তাকে ভিতরে বসতে না দিয়ে চলুন বলে হাতের ইশারায় নিয়ে যায় বাইরে। ঘটনাটা বিস্তারিত বলুন বলে লোকটার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে মেয়েটা। নিয়ে যায় একটি কূপের ধারে।
রোমাঞ্চ অনুভব করে লোকটি। এত বড় একজন অফিসারের একটি রূপসী মেয়ে হাঁটছে তার পাশাপাশি! লোকটা ভাগ্যবান মনে করে নিজেকে।
কূপের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায় রাইনি। লোকটাও দাঁড়িয়ে আছে ভার পাশ ঘেঁষে। কথা বলছে দুজনে। দুজনেই তাকিয়ে আছে কূপের প্রতি। আলতো পরশে লোকটার কাঁধের উপর নিজের ডান হাতটা রাখে রাইনি। উষ্ণতা অনুভব করে লোকটা। মুখের কথা বন্ধ হয়ে যায় তার। চলে যায় অন্য জগতে।
কাঁধ থেকে হাতটা আস্তে আস্তে নীচে নামিয়ে আনে রাইনি। লোকটার পিঠ বরাবর এসে থেমে যায়। নিজে খানিকটা সরে আসে পিছনে। অম্নি একটা ঠেলা। লোকটা পড়ে যায় কূপের ভিতর। কূপটা যেমন নোংরা, তেমনি গভীর। একটা চীঙ্কার ভেসে আসে রাইনির কানে। ধড়াম শব্দের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায় তার আর্তচীৎকার।
বিজয়ের হাসি ফুটে উঠে রাইনির মুখে। ওসমান সারেমকে মৃত্যুমুখে নিক্ষেপ করতে পারত এমন একটি তথ্য কূপের গভীরে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এই তার আনন্দ।
***
সেখান থেকেই রাইনি দ্রুত ছুটে যায় ওসমান সারেমের ঘরে। ওসমান ঘরে নেই। জিজ্ঞেস করে মাকে। ওসমানের মা জানালেন, ছেলেটা সন্ধ্যার পরপরই কোথায় যেন গেল, এখনো ফিরেনি। ঘটনাটা বুঝে ফেলে রাইনি। বন্ধুদের নিয়ে প্রাচীর ভাঙ্গার অভিযানে-ই গেছে ওসমান। ওসমানকে বারণ করতে এসেছিল রাইনি। এক দালাল শেষ হয়েছে ঠিক, ওদের ভিতরে আরো কেউ দালাল যে নেই, তার গ্যারান্টি কি? অন্য কেউ যদি খৃস্টানদের কাছে তথ্যটা জানিয়ে দেয়, তবে তো ধরা পড়ে যাবে ওসমান।
হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে রাইনি। দুর্গের যেদিক থেকে ওসমানরা প্রাচীর ভাঙ্গার পরিকল্পনা নিয়েছিল, ছুটে যায় সেদিকে। যে মুসলমানটিকে রাইনি কূপে নিক্ষেপ করে এসেছে, সে তাকে বলেছিল, আইউবীর কমান্ডোরা প্রাচীরের উপরে উঠে তীরন্দাজ খৃস্টানদের এমনভাবে হত্যা করে ফেলবে যে, কেউ টের-ই পাবে না। যুবক-যুবতী নীচ থেকে খুড়ে খুড়ে প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলবে। দুর্গের প্রাচীর মাটির তৈরী। এত চওড়া যে, দুটি ঘোড়া পাশাপাশি দৌড়াতে পারে অনায়াসে। এই প্রাচীর খুড়ে খুড়ে ভেঙ্গে ফেলা শুধু কষ্টসাধ্য-ই নয়- দুঃসাধ্যও বটে।
প্রয়োজনে যুদ্ধ করার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে ওসমান বাহিনী। সঙ্গে আছে তাদের খঞ্জর ও বর্শা। সে এক দুঃসাহসী অভিযান, যা ব্যর্থ হওয়ার আশংকা-ই প্রবল। প্রাচীর ভাঙ্গার জন্য তারা প্রাচীরের এমন একটি স্থান নির্বাচন করে নিয়েছে, যেখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম।
নির্দিষ্ট স্থান অভিমুখে রওনা হয়ে গেছে ওসমান বাহিনী। রাইনিও ছুটে চলেছে সেদিকে। ওসমান সারেমকে এ বিপজ্জনক অভিযান থেকে ফেরাতেই হবে রাইনির। রাইনি নিশ্চিত, লোকগুলো ধরা পড়বে আর ওসমান সারেম মারা যাবে।
ওসমান বাহিনী যাচ্ছে এক পথে আর রাইনি ধরেছে অন্য পথ। ওরা যাচ্ছে ধীরগতিতে সন্তর্পণে আর রাইনি যাচ্ছে দৌড়িয়ে। ওসমানদের আগেই গন্তব্য পৌঁছে যায় রাইনি।
অন্ধকারে এদিক-ওদিক তাকায় রাইনি। পাগলের মত হয়ে গেছে মেয়েটা। হঠাৎ পেছন থেকে কে একজন ধরে ফেলে তাকে। টেনে নিয়ে যায় আড়ালে। লোকটা একজন খৃস্টান ফৌজি। রাইনির পরিচয় জানতে চায় ফৌজি। পিতার নাম উল্লেখ করে পরিচয় দেয় রাইনি। তাকে সেখান থেকে সরে যেতে বলে ফৌজি। কিন্তু রাইনি নড়ছে না এক পা-ও। ওসমানকে বাঁচাতে-ই হবে তার।
খৃস্টানদের বিশাল এক বাহিনী লুকিয়ে আছে এখানে। ফৌজি রাইনিকে বলে, মুসলমানদের একটি দল দেয়াল ভাঙ্গার জন্য রাতে এখানে আসার কথা। ওদের ধরার জন্য আমরা ওঁত পেতেছি…। অপর এক মুসলমান চর খৃস্টানদের কানে দিয়েছে সংবাদটা।
খৃস্টান সৈনিকদের এখান থেকে চলে যেতে বলতে পারে না রাইনি। তার উদ্দেশ্য ওসমানকে রক্ষা করা। একজন মুসলমান যুবকের ভালবাসা অন্ধ করে তুলেছে। মেয়েটাকে। ইত্যবসরে একজন সৈনিক বলে উঠল, তথ্য ভুল নয়, ওরা আসছে।
কেঁপে উঠে রাইনি। চীৎকার করে বলে, ওসমান! ফিরে যাও, ফিরে যাও বলছি ওসমান!
রাইনির মুখে হাত চেপে ধরে কমান্ডার। বলে, মেয়েটা গুপ্তচর মনে হয়। একে বন্দী কর।
কিন্তু রাইনিকে গ্রেফতার করার সুযোগ আর পেলনা খৃস্টানরা। প্রচন্ড কোলাহল ভেসে এল দূর থেকে।
