এরূপ আরো কিছু জরুরী নির্দেশ-উপদেশ দিয়ে কার্ক অবরোধকারী সৈন্যদের রওনা করার আদেশ দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
সূর্যাস্তের পর বাহিনী রওনা হল। দূরত্ব বেশী নয়। সোবহে সাদেকের আগে আগে ই শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায় বাহিনী। অবরোধের বিন্যাসে সম্মুখে অগ্রসর হয় এখান থেকে।
পথে কোন খৃস্টান সৈনিক চোখে পড়ল না তাদের। এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। তারা শুনেছিল, খৃস্টান বাহিনী শহরের বাইরে ছাউনি ফেলে অবস্থান নিয়ে আছে।
কার্ক দুর্গ অবরোধ করে ফেলে মুসলিম বাহিনী। দুর্গের প্রাচীরের উপর থেকে তীরবর্ষণ শুরু হয়। তীব্র জবাবী হামলা থেকে বিরত থাকে মুসলিম বাহিনী। কোথায় প্রাচীর ভেঙ্গে বা ছিদ্র করে ভিতরে প্রবেশ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে কমান্ডাররা। তীরন্দাজদেরও বিরত রাখেন তারা। কার্ক সম্পর্কে অভিজ্ঞ গুপ্তচররা শহরের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে কমান্ডারদের।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী দুর্গ অবরোধ করেছে, এ সংবাদ এখনো পায়নি নগরবাসী। অবরোধ এখনো সম্পন্ন হয়নি। পিছনটা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। দুটি ফটক আছে সেদিকটায়।
হঠাৎ অগ্নিগোলা নিক্ষিপ্ত হতে শুরু করে দুর্গের ভিতরে সেনা অবস্থানের উপর। মিনজানিকের মাধ্যমে বাইরে থেকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে সেগুলো। এটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর আবিস্কার।
টের পেয়ে গেছে নগরবাসী। তারা দেখতে পাচ্ছে, তাদের সৈন্যরা দুর্গের প্রাচীরে উঠে বাইরের দিকে তীর ছুড়ছে সমানে। আতংক ছড়িয়ে পড়ে জনমনে। নিজ নিজ ঘরে লুকিয়ে পড়ে ইহুদী ও খৃস্টান নাগরিকরা। সেজদায় পড়ে যায় মুসলমানরা। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিজয়ের জন্য দুআ করছে তারা। বিপদজ্জনক তৎপরতায় লিপ্ত কিছু মুসলমান। তারা সমাজের যুবক শ্ৰেণী। মেয়েরাও আছে এদের মধ্যে। আছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পনেরজন কমান্ডো। নগরবাসীদের অস্থিরতার সুযোগে একস্থানে সমবেত হয়েছে। এ দুর্গের প্রধান ফটক খুলে দেয়ার কিংবা ভেঙ্গে ফেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তারা।
ফটক ভাঙ্গার জন্য গোলা ছুড়ল মুসলিম বাহিনী। মোটা কাঠের তৈরী মজবুত ফটক। কাঠের উপর লোহার পাত মোড়ানো। গোলার আঘাতে ভাঙ্গল না দুর্গের ফটক। উপর থেকে বৃষ্টির মত তীর ছুঁড়ে চলেছে খৃস্টানরা। অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে আঘাত হানছে তীর। কামানের সাহায্যে গোলা নিক্ষেপ করা হচ্ছে যেখান থেকে, তীর পৌঁছে যাচ্ছে সে পর্যন্ত। তীরের আঘাতে শহীদ হয়ে গেছে কয়েকজন মুসলিম সৈনিক। আহত হয়ে পড়েছে অনেকে। আত্মরক্ষার জন্য কামানগুলো সরিয়ে নেয়া হয় আরো পিছনে। ব্যর্থ হয়ে পড়ে গোলা নিক্ষেপের প্রক্রিয়া।
প্রাচীরের উপর অবস্থিত দুশমনদের উপর তীর নিক্ষেপ করার নির্দেশ পায় মুসলিম সৈনিকরা। উপর দিক থেকে তীর ছোঁড়াছুড়ি চলতে থাকে দিনভর। শূন্যে তীর উড়তে-ই দেখা যাচ্ছে শুধু। ক্ষয়-ক্ষতি বেশী হচ্ছে মুসলমানদের।
প্রাচীর ভাঙ্গার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে মুসলমানরা। বিশেষজ্ঞরা ঘুরে-ফিরে দেখার চেষ্টা করে চারদিক। কিন্তু তীরের জন্য কাছে ভিড়তে পারছে না তারা।
সন্ধার খানিক আগে আটজনের একটি দল এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এখনো প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি তারা। হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুটে আসে উপর থেকে। সেই সাথে আসে বর্শা। শহীদ হয়ে যায় আটজন জানবাজের সব কজন। একাধিক তীর-বর্শা বিদ্ধ হয় তাদের এক একজনের গায়ে।
.
রাতের প্রথম প্রহর। রাইনি তার ঘরে বসা। অবসন্ন দেহে ঘরে আসে তার পিতা। রাতে-ই আমার ডিউটি আছে, তাড়াতাড়ি উঠতে হবে বলেই বিছানায় গা এলিয়ে দেন তিনি। বালিশে মাথা রেখে তিনি বললেন, সংবাদ পেয়েছি, শহরের মুসলমানরা ভিতর থেকে ভয়ানক কিছু একটা করতে যাচ্ছে। প্রতিটি মুসলিম পরিবারের উপর নজর রাখতে হচ্ছে। বলেই ঘুমিয়ে পড়ে রাইনির পিতা।
কিছুক্ষণ পর করাঘাত পড়ে দরজায়। চাকরের পরিবর্তে উঠে গিয়ে দরজা খুলে রাইনি। একজন বিত্তশালী মুসলমান বাইরে দাঁড়িয়ে। নতুন বড় লোক। খৃস্টানদের দালালী করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ। রাইনি লোকটাকে চিনে। তাই আগমনের হেতু জিজ্ঞেস না করেই বলল, আব্বা এইমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছেন। জাগবেন কিছুক্ষণ পর। সংবাদটা আমাকে বলে যান, আমি আব্বাকে বলব। আগন্তুক বলল, না, ওনার সঙ্গে আমার সরাসরি কথা বলতে হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
কথাটা আমি জানতে পারি কি? জিজ্ঞেস করে রাইনি।
মুসলমানদের বেশ কিছু যুবক-যুবতী এই আজ রাতে ভিতর থেকে প্রাচীর ভেঙ্গে আইউবীর বাহিনীকে ভিতরে ঢোকবার সুযোগ করে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে জবাব দেয় আগন্তুক- আমি বন্ধু সেজে তাদের কাছে গিয়ে এ তথ্য সংগ্রহ করেছি। আমি আরো সংবাদ পেয়েছি যে, এদের সঙ্গে বাইরে থেকে আসা কমান্ডোও আছে। সবচে চাঞ্চল্যকর তথ্য হল, ঐ যে মুচিটি রাস্তায় বসে জুতা মেরামত করে, লোকটা আইউবীর গুপ্তচর। নাম বারজিস। তথ্যগুলো আমি তোমার পিতাকে জানাতে চাই, যাতে সময় থাকতে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
রাইনি কয়েকজন মুসলমানের নাম উল্লেখ করে ওসমানের নাম বলে জিজ্ঞেস করল, এ ছেলেটাও কি অভিযানে আছে?
আছে মানে? সারেমের পুত্র ওসমান-ই তো এ দলের নেতা। আর তার নেতা হল ইমাম রাজী। জবাব দেয় আগন্তুক।
