ঠিক-ই এরা নির্দোষ। খৃস্টানরা যাকে অপরাধ মনে করে, এই মুসলমান যুবকদের কাছে তা সওয়াবের কাজ। খৃস্টানদের দৃষ্টিতে যা সন্ত্রাস, এই মুসলমানদের কাছে তা জিহাদ। আগুন লাগানো ও অপহৃত মেয়ে দুটোর উদ্ধার অভিযানের এরা সক্রিয় কর্মী। তবে এরা নিরপরাধ।
হাশীশ তাদের অজ্ঞান করে তুলেছিল। নেশার প্রভাবে বিবেক ঘুমিয়ে পড়েছিল তাদের। কিন্তু তাদের আত্মা ছিল সজাগ। তাদের মুখ থেকে সামান্য ইংগিতও নিতে পারেনি খৃস্টানরী। অগত্য তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ছেলেগুলো বেকসুর।
যুবক দুটোর যখন চোখ খুলে, তখন জনমানবহীন একস্থানে পড়ে আছে তারা। অচেতন অবস্থায় খৃস্টানরা তাদের সেখানে ফেলে এসেছিল। জাগ্রত হয়ে চোখাচোখী করে দুজন। তারপর উঠে চলে আসে যার যার বাড়ীতে।
কার্কের পরিস্থিতি এখন শান্ত। আগুনও নিভে গেছে। মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ সংবাদের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এবার দলে দলে ফিরে আসতে শুরু করেছে পালিয়ে যাওয়া নাগরিকরা। দুর্গের ফটক খুলে দেয়া হল। স্রোতের মত ঢুকতে শুরু করল জনতা। এদের-ই সঙ্গে ঢুকে পড়েছিলেন বারজিস। সঙ্গে তার পনেরজন কমান্ডো।
.
কার্কের মানুষ দেখল, নিতান্ত সরল-সোজা যে মুচি রাস্তায় বসে মানুষের জুতা মেরামত করত, তিনদিনের অনুপস্থিতির পর আবার এসে বসে পড়েছে রাস্তায়। পনেরজন কমান্ডোকে ওসমান সারেম ও তার বন্ধুদের সহযোগিতায় রাতারাতি মুসলমানদের ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। তাদের কেউ এখন দোকানের কর্মচারী। কেউ খৃস্টানদের আস্তাবলের সহিস। কেউ মসজিদের খাদেম।
এবার তাদের দেখতে হবে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী শহর আক্রমণ করলে ভিতর থেকে তারা কি সহযোগিতা করতে পারবে। খুঁজে-পেতে কর্তব্য স্থির করে তারা। তা হল, কোন এক স্থান দিয়ে দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে সুলতানের বাহিনীকে ভিতরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়া। এ কাজের জন্য পরিবেশ তৈরি করতে শুরু করেছে তারা।
যুব সংগঠনের সদস্য বৃদ্ধি করেছে ওসমান। প্রস্তুত করে তুলেছে অনেক মেয়েকে। কিন্তু ছায়ার মত তার পিছনে লেগে আছে রাইনি আলেকজান্ডার। রাইনি পথ আগলে ধরছে ওসমান সারেমের। ঘন ঘন যাওয়া আসা করছে তার বাড়িতে। একদিন কৌতূহলবশত মেয়েটি ওসমান সারেমকে জিজ্ঞেস করে বসে, আন-নূর কোথায় ওসমান?
তোমার জাতির কোন এক পাপিষ্টের কাছে-জবাব দেয় ওসমান- ওর উপর আল্লাহর লানত।
লানত নয়- রহমত বল ওসমান- রাইনি বলল- যারা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করে, তাদের তোমরা শহীদ বল। আন-নূর শহীদ হয়ে গেছে।
হঠাৎ চমকে উঠে ওসমান। কোন জবাব খুঁজে পেল না সে।
আর মেয়ে দুটোকে উদ্ধার করে আনার কাজে তুমিও ছিলে- রাইনি বলল তবে এখনো তুমি গ্রেফতার হওনি। আমি না বলেছিলাম, তোমার ও কয়েদখানার মাঝে আমার অস্তিত্ব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। বল, ওসমান! আর কত ত্যাগ চাও তুমি!
ওসমান সারেম যুবক। দেহে জোশ-জযবা যতটুকু, বুদ্ধি-বিবেক ততটুকু নেই। বিচক্ষণতা অভাব আছে ছেলেটার। রাইনির কথাগুলো অস্থির করে তুলে তাকে। মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে, রাইনি! আমার কাছে কি চাও তুমি?
প্রথমতঃ তুমি আমার ভালবাসা বরণ করে নাও। দ্বিতীয়তঃ এসব গোপন সন্ত্রাসী তৎপরতা থেকে ফিরে আস। জবাব দেয় রাইনি।
তুমি তোমার সরকার ও তোমার জাতিকে ভালবাস। তোমার হৃদয়ে আমার ভালবাসা যদি এতই গম্ভীর হয়ে থাকে, তাহলে আমার জাতির প্রতি সমবেদনা দেখাচ্ছ না কেন? বলল ওসমান সারেম।
আমার না নিজ জাতির প্রতি ভালবাসা আছে, না তোমার জাতির প্রতি- বলল রাইনি- আমি বুঝি শুধু তোমাকে। এসব ভয়ংকর তৎপরতা থেকে আমি তোমাকে ফিরে আসতে বলছি এজন্য যে, তুমি মারা যাবে। অর্জন হবে না কিছুই। আমি আবেগতাড়িত নই। যা বাস্তব, তা-ই শুধু তোমাকে বলছি। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কার্ক জয় করতে পারবেন না। আমি আব্বার নিকট থেকে শুনে বলছি। এবার যুদ্ধ অবরোধের হবে না। যুদ্ধ হবে কার্কের বাইরে অনেক দূরে। আমাদের কমান্ডাররা আইউবীর কৌশল ধরে ফেলেছেন। শোবকের পরাজয় থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছেন। আইউবীর বাহিনী এবার দুর্গ অবরোধের সুযোগ-ই পাবে না। এমতাবস্থায় তোমরা যদি শহরের ভিতর থেকে কোন তৎপরতা চালাও, তা হলে ফল একটা-ই। তোমরা হয়ত মারা পড়বে কিংবা ধরা খেয়ে অবশিষ্ট জীবন আমাদের বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুকে ধুকে অতিবাহিত করবে। আমি তোমাকে শুধু জীবিত ও নিরাপদ দেখতে চাই।
মনোযোগ সহকারে রাইনির কথাগুলো শোনে ওসমান সারেম। তারপর অবনত মস্তকে হাঁটা দেয় সেখান থেকে। আবারো রাইনির কণ্ঠ শুনতে পায় ওসমান। ভেবে দেখ ওসমান, ভেবে দেখ। বিধর্মী মেয়ে বলে আমার কথাগুলো ফেলে দিও না ভাই!
***
আমি আপনাদের আবারো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, কার্ক আর শোবক এক নয়- শেষবারের মত নির্দেশনা দিতে গিয়ে কমান্ডারদের উদ্দেশে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী- খৃস্টানরা এখন আগের চে বেশী সজাগ ও সতর্ক। আমি গুপ্তচর মারফত জানতে পেরেছি যে, একটি যুদ্ধ আমাদের কার্কের বাইরে লড়তে হবে। শহরের ভিতর থেকে মুসলমানরা যদিও কোন গোপন তৎপরতা চালায়, বোধ হয় তা আমাদের উপকারে আসবে না। তার পরিণতি এ-ও হতে পারে যে, লোকগুলোর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। আমি তাদেরকে এত কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে চাই না। তীব্র আক্রমণ-ই তাদের রক্ষা করার একমাত্র পথ।
