কমান্ডো যদি পাঠাতে-ই হয়, তাহলে এক্ষুণি প্রেরণ করুন। আগুনের ভয়ে কার্কের যেসব নাগরিক পালিয়ে এসেছিল, তারা অবশ্যই ফিরে যাবে। তাদের ছদ্মাবরণে আমরা শহরে কমান্ডো ঢুকিয়ে দিতে পারি। এরপর কিন্তু সম্ভব হবে না। অনুমতি দিন, তাদের নিয়ে আজই আমি রওনা হয়ে যাই। সঙ্গে কোন অস্ত্র নিতে হবেনা। অস্ত্র ওখান থেকেই সংগ্রহ করা যাবে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বলার মাঝে বলে উঠলেন বারজিস।
সিদ্ধান্ত হল, আজ রাতে-ই বারজিরে নেতৃত্বে কমান্ডো রওনা হয়ে যাবে। যতদূর পর্যন্ত ঘোড় নিয়ে যাওয়া সম্ভব, ঘোড়ায় চড়ে যাবে। তার পরে পায়ে হেঁটে। সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত লোক যাবে। তারা ঘোড়াগুলোকে মাঝ পথ থেকে ফিরিয়ে আনবে।
তৎক্ষণাৎ জাহেদানকে নির্দেশ দেয়া হল, বারজিসের নির্দেশনা মোতাবেক কমান্ডোদের অসামরিক পোশাকের ব্যবস্থা কর এবং সন্ধ্যার পর রওনা করিয়ে দাও।
সেনা কমান্ডারদের জরুরী নির্দেশনা দিতে শুরু করেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। বললেন
তোমাদের মনে রাখতে হবে, যে বাহিনীটি দিয়ে আমরা কার্ক আক্রমণ করাতে যাচ্ছি, এটি সেই বাহিনী নয়, যারা শোবক জয় করেছিল। এরা মিসর থেকে আগত সেইসব সৈনিক, যাদের মধ্যে দুশমন অস্থিরতা সৃষ্টি করে রেখেছিল। অবরোধ করে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। কাজেই সর্বক্ষণ কমান্ডারদের সতর্ক থাকতে হবে। আমার তো এ-ও সন্দেহ হচ্ছে যে, এ বাহিনীর মধ্যে বিকৃত চিন্তার সৈন্যও আছে। যে বাহিনীটিকে আমি নিজের হাতে রেখেছি, তারা তুর্কী ও শামী। নুরুদ্দীন জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীটিকেও আমি আমার কাছে রিজার্ভ রাখব। পরিস্থিতি তোমাদের প্রতিকূলে চলে গেলে ভয় পেয়ে পিছনে সরে এস না। আমি তোমাদের পিছনে থাকব। আর হ্যাঁ, তোমরা কার্কের মুসলমানদের আশায় বসে থেক না। আমি তাদের জন্য যে পয়গাম প্রেরণ করব, তা কক্ষনো এমন হবে না যে, তার এমন ঝুঁকিবরণ করে নেবে যে, তাদের মহিলাদের ইজ্জতও নিরাপদ থাকবে না। আমি তাদের কাছে এত বেশী কোরবানী চাইব না। তারা খৃস্টানদের শাসনাধীন, অসহায়, অপারগ। নির্যাতনের শিকার। আমরা যাচ্ছি তাদের আযাদী ও মুক্তির জন্য তাদের ভরসায় নয়।
***
কার্কের মুসলমানদের ঘরে ঘরে খৃস্টানদের হানা অব্যাহত থাকে পাঁচদিন পর্যন্ত। সন্দেহবশতঃ গ্রেফতার হয় বেশ কজন মুসলমান। বেগার ক্যাম্পের যে কয়েদীদের মুক্তি দেয়ার ওয়াদা দিয়ে আগুন নেভাতে নেয়া হয়েছিল, মুক্তি দেয়া হয়নি তাদের। মুসলিম নির্যাতনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে খৃস্টানরা। অগ্নিকান্ডে তাদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অস্বাভাবিক। তাদের জানা ছিল যে, মুসলমান ছাড়া এমন দুঃসাহসী অভিযান চালাতে পারে না অন্য কেউ।
গ্রেফতারকৃতদের দুজন হল ওসমান সারেমের বন্ধু। মেয়েদের মুক্তি অভিযানে শরীক ছিল তারা। নির্মম নির্যাতন চালানো হয় তাদের উপর। তবু কোন তথ্য মিলছে না খৃস্টানদের। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে এই দুযুবকের হৃদয়ে লুকায়িত আছে সব তথ্য। কিন্তু মুখ তাদের বন্ধ। নির্মম নির্যাতনে শরীরের জোড়াগুলো আলগা হয়ে গেছে তাদের। তবু মুখ খুলছে না তারা।
অবশেষে নিজে কয়েদখানায় এসে উপস্থিত হন হরমুন। দৃষ্টি তার এই দুযুবকের উপর। হরমুনের মুসলমান গুপ্তচররা জানিয়েছে যে, এরা দুজন আগুন লাগানোর ঘটনায় জড়িত। সংবাদদাতা দুজন মুসলমান। দুজন-ই এ দুযুবকের প্রতিবেশী। অর্থে-বংশে সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখন চলে ঘোড়াগাড়ীতে করে। খৃস্টানদের দ্বারে তাদের অবাধ যাতায়াত। এক একজনের দু-তিনটি করে বউ। মদ চলে রীতিমত।
গ্রেফতারকৃত এই দুযুবককে তারা আগুন লাগার ঘটনার রাতে কোথাও সন্দেহজনক অবস্থায় দেখেছিল। তারা-ই ধরিয়ে দিয়েছে যুবকদের।
কয়েদখানায় এসে যুবকদের অবস্থা দেখে হরমুন বুঝতে পারলেন যে, নির্যাতনে মুমূর্ষ অবস্থায় এসেও যুবকরা যখন কিছু বলছে না, তো এদের নিকট থেকে আর তথ্য পাওয়ার আশা করা যায় না। নির্যাতন এদের গা-সহা হয়ে গেছে।
যুবকদের সঙ্গে করে নিয়ে যান হরমুন। উন্নত খাবার খাওয়ান। মমতা দেখান তাদের প্রতি। ডাক্তার এনে চিকিৎসা করান, ঔষধ খাওয়ান। তারপর তাদের শুইয়ে দেন আরাম বিছানায়। মুহূর্তের মধ্যে তারা গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়।
হরমুন বসে পড়েন দুজনের মধ্যখানে। কিছুক্ষণ পর বিড়বিড় করে উঠে একজন। ঘুমের ঘোরে স্পষ্ট ভাষায় বলতে শুরু করে, আমি কিছু জানি না। আমার দেহটা কেটে টুকরো টুকরো করে ফেল। আমি কিছুই বলতে পারব না। কোন কথা জানা থাকলেও বলব না। তোমরা তোমাদের গলায় ক্রুশ ঝুলিয়ে রাখ আর আমি আমার গলায় বেঁধে রেখেছি পাক কুরআন।
তুমি আগুন লাগিয়েছ- হরমুন বললেন- তুমি খৃস্টানদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছ। তুমি বাহাদুর। মরে গেলে মানুষ তোমাকে শহীদ বলবে।
আমি যদি মরে যাই- আবার বিড়বিড় করে যুবক- আমি যদি মরে যাই, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেহে প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানও থাকবে। প্রাণ বের হয়ে যাবে তো ঈমান বের হবে না।
যুবকের ঘুমন্ত মস্তিষ্কে নিজের মনের কথা ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন হরমুন। কিন্তু যুবকের মস্তিষ্ক কোন কথা-ই গ্রহণ করছে না তার।
এমন সময়ে বিড়বিড় করে উঠে অপর যুবকও। এবার তার প্রতি মনোনিবেশ করেন হরমুন। ঘুমের ঘোরে তার থেকেও কথা নেয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সঙ্গে তার আরো তিন-চারজন গোয়েন্দা। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে হরমুন বললেন, আর চেষ্টা করা বৃথা। এদের মুখ থেকে তোমরা কোন কথা বের করতে পারবে না। মনে হয় লোকগুলো নির্দোষ। তবে কিন্তু আপন বিশ্বাস ও চেতনায় বড় পাকা। তৈলাক্ত খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে আমি এদেরকে যে পরিমাণ হাশীশ খাইয়েছি, তা যদি একটি ঘোড়াকে খাওয়াতাম, তাহলে ঘোড়া কথা বলতে শুরু করত। কিন্তু এদের উপর কোন ক্রিয়া-ই হল না। তার অর্থ, এদের জাতীয় চেতনা- এরা যাকে ঈমান বলে- এদের আত্মায় ঢুকে পড়েছে। আর এদের আত্মার উপর তোমরা নেশা প্রয়োগ করতে পারবে না। অন্যথায় বলতে হবে এরা নির্দোষ, ঘটনার সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই।
