আমি একজন ধর্মীয় নেতা জনাব! আপনার দরবারে আমি মিথ্যা বলতে আসিনি বললেন ইমাম সাহেব- আমি আপনাকে জানিয়ে যেতে চাই যে, আপনি আমাদের ধমক দিতে পারেন, আপনার পুলিশ বাহিনীকে নির্দোষ বলতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর নিকট থেকে সত্যকে গোপন রাখতে পারেন না। আপনি আমাদের শাসক-খোদা নন। এ লোকগুলো আপনাদের রক্ষা করার জন্য সারা রাত আগুনের সাথে যুদ্ধ করল, আর আপনি কিনা তার পুরস্কার এই দিচ্ছেন যে, আপনার পুলিশ মেয়েগুলোকে তুলে নিয়ে গেল আর আপনি তার স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত দিচ্ছেন না। এই কি আপনাদের নীতি?
দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর পুলিশ প্রধান বললেন, ঠিক আছে, আমি খুঁজে দেখব। এতটুকু প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়া-ই ছিল ইমাম সাহেবের উদ্দেশ্য।
বাইরে এসে ইমাম বলে দিলেন, তোমরা প্রচার করে দাও যে, পুলিশ রাতে আমাদের মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তারা তা-ই করল। প্রতিবেশী অমুসলিমরা কথাটা বিশ্বাস করে নিল। বস্তুত রাতের শহরের অবস্থা এমন-ই ছিল যে, চারটি মেয়ে অপহরণ হওয়া ছিল স্বাভাবিক।
.
বারজিস সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তাবুতে বসে আছেন। আফাকের ব্যাণ্ডেজ-চিকিৎসা সেরে ফেলেছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ডাক্তার। আফাকের বোন দুটিও তাঁবুতে বসা। সুলতানকে রাতের ঘটনাপ্রবাহ শোনাচ্ছেন বারজিস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বারবার দৃষ্টিপাত করছেন মেয়ে দুটোর প্রতি। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে তাঁর।
বারজিস জানান, কার্ক শহরকে তিনি এমন এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে রেখে এসেছেন যে, এক্ষুণি যদি হামলা করা যায়, তাহলে হামলা সফল হতে পারে। শহরে সেনাবাহিনীর রসদ নেই। উট-ঘোড়ার খাদ্যও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পশুগুলো ভীত সন্ত্রস্ত। জনগণ আতংকিত। ভয়ে সেনাবাহিনীও কাঁপছে থরথর করে।
গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। দীর্ঘক্ষণ পর মাথা তুলে নায়েব-উপদেষ্টাদের তলব করেন। আদেশ দেন, মেয়ে দুটো ও তার ভাইকে কায়রো পাঠিয়ে দাও এবং তাদের ভাতা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দাও।
আমার বোন দুটোকে আপনি আপনার হেফাজতে নিয়ে নিন- আফাক বলল আমি আপনার সঙ্গে থাকব। আমাকে আপনি সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে নিন। আমি আমার বাবা-মায়ের খুনের প্রতিশোধ নেব। যদি আমাকে কার্ক পাঠিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমি খৃষ্টানদের আরো অস্থির করে তুলব।
যুদ্ধ আবেগ দিয়ে লড়া যায় না- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন-মুজাহিদ হতে হলে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। তুমি তো শুধু তোমার পিতা-মাতার খুনের বদলা নেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়েছ। আর আমার নিতে হবে, সেইসব পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী কন্যাদের রক্তের বদলা, যারা জীবন-সম্ভ্রম খুইয়েছে খৃস্টান হায়েনাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে। তুমি শান্ত হও। ভেবে-চিন্তে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ কর।
আবেগ প্রশমিত হচ্ছে না আফাকের। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য জিদ ধরেছে ছেলেটা। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বাধ্য করছেন তাকে বোনদের সাথে কায়রো চলে যেতে। সুলতান তাকে বললেন, কায়রো গিয়ে আগে নিজের চিকিৎসা করাও। সুস্থ হও। তারপর আমি তোমার আকাংখা পূরণ করব।
ইত্যবসরে এসে উপস্থিত হন নায়েব সালার ও চীফ কমান্ডার। গোয়েন্দা উপ প্রধান জাহেদানও আছেন তাদের সঙ্গে। আফাক ও তার বোনদের বাইরে পাঠিয়ে দেন। তাদের নিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বৈঠকে বসেন।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয় উপস্থাপন করলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। এক্ষুণি কার্ক অবরোধ করার পরামর্শ দিয়েছে বারজিস। এ ব্যাপারে আপনারা যার যার মতামত বলুন। কার্কের সর্বশেষ পরিস্থিতির বিবরণ দিলেন সুলতান। আলোচনা শুরু হল।
মুখ খুললেন জাহেদান। নিজ গোয়েন্দাদের রিপোর্টের আলোকে তিনি বললেন, খৃস্টান বাহিনী কেবল কার্ক দুর্গে-ই নয়- বাইরেও অবস্থান করছে। তাদের একটি অংশ বাইরে থেকে আমাদের অবরোধ ভেঙ্গে দেয়ার মত পজিশন নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। তারা রসদ সরবরাহে নিরাপত্তা বিধানের জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য প্রস্তুত করে রেখেছে। সাময়িকের জন্য রসদের কিছু ঘাটতি দেখা দিলেও এ জন্য আমাদের আক্রমণ সফল হবে ধারণা করা আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। পুড়ে যাওয়া রসদ-সরঞ্জাম ছাড়াও তাদের আরো বিপুল আয়োজন রয়েছে। তাদের প্রত্যেক সৈনিকের সঙ্গে পর্যাপ্ত রসদ-সরঞ্জাম থাকে সব সময়। তাছাড়া তাদের সৈন্যসংখ্যাও আমাদের চেয়ে পাঁচ-ছয়গুণ বেশী। নিজ নিজ অভিমত পেশ করে বৈঠকে উপস্থিত অন্যরাও। অধিকাংশের অভিমত, বিলম্ব না করে এক্ষুণি আক্রমণ করা হোক। আরো কিছুদিন অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন কেউ কেউ। সকলের পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। কমান্ডারের তীব্র স্পৃহা দেখে যারপরনাই প্রীত হন সুলতান। তাদের অধিকাংশের পরামর্শ হল, হামলা এক্ষুণি হোক বা কদিন পরে হোক, হামলা করে একথা যেন শুনতে না হয়, অবরোধ তুলে নাও। চুপচাপ সকলের পরামর্শ শুনতে থাকেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। অবশেষে ফৌজের মানসিক ও অন্যান্য অবস্থা জানতে চাইলেন তিনি। সন্তোষজনক জবাব পেলেন সুলতান।
আমি অবিলম্বে হামলা করতে চাই- সবশেষে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী- তবে আমি তাড়াহুড়ার পক্ষে নই। দুর্গের শক্ত প্রাচীর-ই কেবল আমাদের প্রতিবন্ধক নয়-বাইরে ছড়িয়ে থাকা খৃস্টান বাহিনীর সঙ্গেও মোকাবেলা করে আমাদের বিজয় অর্জন করতে হবে। জাহেদান ঠিক-ই বলেছে যে, কার্কের ভিতরের ধ্বংসযজ্ঞে আমাদের প্রবঞ্চিত হওয়া যাবে না। তথাপি হামলা হবে অবিলম্বে। দূরত্ব তো বেশী নয়। একরাতে-ই আমাদের বাহিনী কার্ক পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারবে। কিন্তু একটি লড়াই তাদের দুর্গের বাইরে লড়তে হবে। রওনা হওয়ার আগে কার্কের মুসলমানদের প্রস্তুত করে নিতে হবে। আমি ভিতরের যেসব তাজা খবর পেয়েছি, তা হল, সেখানকার মুসলমানরা তলে তলে সংঘবদ্ধ হয়ে গেছে। আশা করা যায় আমরা দুর্গ অবরোধ করলে তারা ভিতরে নাশকতা চালিয়ে যাবে। তাদের বোন-কন্যারাও মাঠে নেমে এসেছে। চারটি মাত্র মেয়ে খৃস্টানদের যে পরিমাণ ক্ষতিসাধন করেছে, পঞ্চাশ সদস্যের চারটি বাহিনীর পক্ষেও তা সম্ভব ছিল না। আমরা শহরে আমাদের কমান্ডো ঢুকিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করব।
