হরমুন ও খৃস্টান সেনা অফিসারগণ বিস্মিত হয়ে পড়েন যে, নারীর লাশ পড়ে আছে কেন এখানে! এটি তো সামরিক এলাকা। কোন নাগরিকের তো এখানের আসার অনুমতি নেই! সাধারণ মানুষের চলাচলের পথও তো নয় এটি! এ তো পশু বাধা, রসদ রাখার জায়গা! নারীর লাশ কেন এখানে?
সেখানে পড়ে আছে আরো কয়েকটি লাশ। এগুলো সেনাসদস্যদের। রাতের আঁধারে মেয়েগুলো এখানে কেন এসেছিল, জবাব আছে এ প্রশ্নের। কিন্তু জবাবদাতা নেই কেউ।
যাক, এ প্রশ্ন মুখ্য নয়। আসল প্রশ্ন হল, আগুন লাগল কিভাবে? শহরের মুসলমানদের উপর সন্দেহ করা যায়। স্বাভাবিক। কিন্তু অপরাধীদের খুঁজে বের করা সহজ নয়। হানা শুরু হয়ে গেল সন্দেহভাজন মুসলমানদের ঘরে ঘরে। মসজিদে মসজিদে, মাদ্রাসায়-মাদ্রাসায়। গ্রেফতারকৃতদের সংখ্যা বাড়তে লাগল দিন দিন। জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন। তারপর জেল।
.
আন-নূর ও তার বান্ধবীদের পরিজন বেজায় পেরেশান। মেয়েগুলো ফিরে আসল না এখনো। তা হলে কি তারা ধরা পড়ে গেল? তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে পূর্ণ সাফল্যের সাথে। কিন্তু এখনো তারা নিখোঁজ। ঘরের কোণে আত্মগোপন করেনি ওসমান সারেম ও তার সঙ্গীরা। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তথ্য সংগ্রহ করছে।
আগুন লাগার স্থানে উৎসুক জনতার প্রচন্ড ভীড়। বন্ধুদের নিয়ে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে ওসমান সারেম। শুনতে পায়, চারটি মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে।
খানিক পরে জনতার উদ্দেশ্যে ঘোষণা হল, লাশ চারটি অমুক স্থানে রেখে দেয়া হয়েছে। লাশগুলো দেখে তোমরা সনাক্ত করার চেষ্টা কর। জনতার ভীড় চলে যায় সে দিকে। একত্রিতভাবে রাখা লাশ চারটি দেখে ওসমান সারেম ও তার সঙ্গীরা। কুশগুলো রেখে দেয়া হয়েছে লাশের বুকের উপর। কেউ চিনল না এরা কারা। যারা চিনল, তারা কি বলবে, এরা কারা? না, জীবন গেলেও নয়।
দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে ওসমান সারেমের। ঝর ঝর করে নেমে আসে অশ্রু। ওসমান বেরিয়ে আসে জনতার ভীড় থেকে। বন্ধুরাও এসে মিলিত হয় তার সঙ্গে। তারা জানে, লাশগুলো কাদের। ওসমান সারেমের বোন আন-নূর এর লাশও আছে এখানে। অবশিষ্ট তিনটি লাশ তার বান্ধবীদের। রাতে কর্তব্য পালন করে শহীদ হয়ে গেছে চারজন। তাদের শাহাদাঁতের চাক্ষুষ সাক্ষী নেই কেউ। লাশের সুরতহাল যে কাহিনী বর্ণনা করছে, তার বিবরণ অনেকটা হতে পারে এ রকম–
সেন্ট্রিকে হত্যা করে মেয়েরা আগুন লাগায়। তারপর ঘোড়ার রশি কাটে। তারপর তারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য ছুটন্ত ঘোড়ার কবলে পড়ে যায়। অবশেষে ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারায়। আল্লাহ মালুম, কত শত উট-ঘোড়া দলিত করেছে লাশগুলো।
দুটি মেয়ের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য জীবন দিল চারটি মেয়ে। নিজ হাতে মেয়েগুলোর গলায় ক্রুশ ঝুলিয়ে দিয়েছিল বারজিস, যাতে প্রয়োজনে তারা দাবি করতে পারে, আমরা খৃস্টান।
মেয়েগুলোর জানাযা হল না। খৃস্টান মনে করে ক্রুসেডাররা তাদের-ই গোরস্তানে তাদের রীতি অনুসারে দাফন করে রাখে লাশগুলো। কেউ বিলাপ করল না তাদের জন্য। তবে, ঈসালে সাওয়ারের জন্য কুরআন পাঠ করা হল, গায়েবানা জানাযা পড়া হল ঘরে ঘরে গোপনে।
মুসলমানদের ঘরে তল্লাশী শুরু করে খৃস্টানরা। সক্রিয়-নিষ্ক্রিয়, মুজাহিদ অমুজাহিদ কারো ঘর-ই বাদ পড়ল না অভিযান থেকে। প্রবলভাবে দুটি আশংকা দেখা দিল। প্রথমতঃ মুসলমানরা ঘরে ঘরে যেসব অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিল, তল্লাশীতে ধরা পড়ে যাবে সব। তাই ভিটার মাটি খুড়ে খুড়ে অস্ত্রগুলো দাফন করে রাখল তারা। দ্বিতীয় আশংকা এই ছিল যে, যে চারটি মেয়ে শহীদ হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে জবাব দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে যে, তারা কোথায়। আগুন লাগার রাতের পরদিনই ইমাম সাহেবকে যখন মেয়েদের শাহাদাঁতের সংবাদ দেয়া হল, তখন শুনে তিনি প্রথম কথাটি এই বললেন যে, কেউ যদি জিজ্ঞেস করে মেয়েগুলো কোথায়, তাহলে জবাব কি দেবে?
ইমাম সাহেব অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী মানুষ। প্রশ্নটা মুখ থেকে বের করে-ই মাথাটা নীচু করে, চোখ দুটো অর্ধমুদ্রিত করে গভীর চিন্তায় হারিয়ে যান। খানিক পর মাথা তুলে চোখ খুলে বললেন, মেয়েগুলোর বাপ-ভাইদের আমার কাছে নিয়ে আস।
সংবাদ পেয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে চলে আসে শাহাদাতপ্রাপ্ত চার মেয়ের পিতা ও ভাইয়েরা। তাদের সামনে প্রশ্নটা পুনর্ব্যক্ত করে ইমাম সাহেব তাদের একটি বুদ্ধি শিখিয়ে দেন এবং সকলকে নিয়ে খৃস্টান পুলিশ প্রশাসনের অফিসে চলে যান। অনুমতি নিয়ে পুলিশ প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন
আমি এদের ইমাম। মসজিদে নামায পড়াই। গত রাতে যখন শহরে আগুন লাগে, তখন এরা আগুন নেভানোর জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। রাতভর এরা কূপ থেকে পানি তুলে আগুনে ছিটাতে থাকে। শহরে হুলস্থুল কান্ড ঘটে গিয়েছিল। কারো কোন হুঁশ-জ্ঞান ছিলনা। সকালে ঘরে ফিরে এরা জানতে পায় যে, আপনার লোকেরা এদের ঘরে ঢুকে এই চার ব্যক্তির চারটি যুবতী মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। আমরা মেয়েগুলোর এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ পাইনি।
আমাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করার আগে ভাল করে ভেবে দেখুন ইমাম সাহেব! আপনি একজন দায়িত্বশীল মানুষ। ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে পরে নিজেই ফেঁসে যাবেন। কঠোর ভাষায় বলল পুলিশ প্রধান।
