কয়েদীর ছোট ভাই এ অভিযানে ছিল বারজিস ও ওসমান সারেমের সঙ্গে। মেয়ে দুটোকে ঘরে রেখে-ই কোথাও চলে গেছে সে।
হঠাৎ ঘরে ফেরে আসে ছেলেটা। মেয়েদের বলে, এক্ষুণি উঠে আসুন, শহর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছি। আফাকের সংবাদটা জানানো হল তাকে। তাকেও সঙ্গে নিয়ে নিল সে। বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে।
বাইরে তিনটি ঘোড়া দন্ডায়মান। এ ব্যবস্থাপনা বারজিসের। দুবোনকে দুটি ঘোড়ায় চড়িয়ে বসান তিনি। নিজে যখন তৃতীয়টিতে আরোহণ করতে উদ্ধত হন, তখন আফাকের কথা বলা হল তাকে। আফাককে নিজের ঘোড়ায় তুলে নেন বারজিস।
শহরের পিছনের ফটক অভিমুখে ছুটে চলে তিনটি ঘোড়া। আতংকিত নগরবাসী পালাচ্ছে দলে দলে। বেরিয়ে যাচ্ছে শহর থেকে। কিন্তু বারজিস তখন মেয়েদের নিয়ে ফটকের নিকটে পৌঁছে, তখন ফটক বন্ধ হয়ে গেল বলে। বিপুল পরিমাণ জনতা আটকা পড়ে যায় ফটকের মুখে। হুলস্থুল পড়ে যায় ফটকের মুখে। বারজিস পিছন থেকে চীৎকার করে বলতে শুরু করে, পিছন থেকে ফৌজ আসছে। ফটক খুলে দাও। পালাও, মুসলমানরা আসছে।
জনতার ভীড় ধাক্কা মারে সামনের দিকে। বন্ধ হতে হতেও খুলে যায় ফটক। ঢলের মত বিপুল লোক এক ঠেলায় বেরিয়ে যায় ফটক অতিক্রম করে।
ফটক পার হয়ে বেরিয়ে এসে বারজিস আফাককে বলল, তুমি তোমার এক বোনের ঘোড়ায় চড়ে বস। দুজন পুরুষের ভার বহন করা এক ঘোড়ার পক্ষে কষ্টকর হবে। আমাদের সফর অনেক দীর্ঘ।
এক বোনের পিছনে চড়ে বসে আফাক। অপর বোনকে বলে, ভয়ের কিছু নেই, ঘোড়া তোমায় ফেলবে না। ঘোড়া হাঁকায় তারা।
পথে স্থানে স্থানে খৃস্টানদের চৌকি বসানো আছে, তা জানা আছে বারজিসের। কোন্ পথে গেলে খৃস্টান সেনাদের নজরে পড়তে হবে না, তাও তিনি জানেন। সেই পথ ধরেই এগুতে শুরু করেন তিনি।
কার্ক থেকে পালিয়ে আসা মানুষজন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এদিক-সেদিক। লেলিহান আগুনে আলোকিত হয়ে গেছে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত।
আফাক ও তার বোনেরা জানে না, তারা কিভাবে মুক্তি পেল। বারজিস বলছে না কিছু-ই। মাঝে-মধ্যে মুখ খুললেও আফাকের পার্শ্বে এসে তার কুশল জিজ্ঞেস করছে আর তার একাকী সওয়ার মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করছে, ভয় পাচ্ছ বোন!
পিছনে সরে যাচ্ছে কার্কের লেলিহান অগ্নিশিখা। ধাবমান ঘোড়াগুলোর গতির তালে কেটে যাচ্ছে রাত।
***
রাত শেষে ভোর হল। সূর্যোদয়ের আগেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীর এলাকায় পৌঁছে যান বারসিজ। এক কমান্ডারের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে সুলতান কোথায় আছেন জানতে চান তিনি। কমান্ডার বারজিসকে নিয়ে যান সিনিয়র এক কমান্ডারের নিকট। সুলতান এ মুহূর্তে কোথায় থাকতে পারেন বারজিসকে ধারণা দেন কমান্ডার। বারজিস উৎফুল্ল। অভিযান তাঁর ফুলসাকসেস। তিনি শুধু দুটো মেয়েকেই খৃষ্টানদের কবল থেকে মুক্ত করেননি- কার্কে আগুন লাগানোর মত নাশকতামূলক অভিযান চালিয়ে খৃস্টান ফৌজ ও নাগরিক সাধারণের মনে চরম এক ভীতিও সঞ্চার করে এসেছেন। তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরামর্শ দিতে চান যে, এক্ষুণি কার্ক আক্রমণ করা হোক।
কার্কের সকালটা ছিল নিদারুণ ভয়ানক। দাবানল নিভে গেছে বটে, তবে আগুন জ্বলছে এখনো। ধোঁয়ার কুন্ডলীও দেখা যাচ্ছে মাঝে-মধ্যে। খৃস্টান বাহিনীর সমুদয় রসদ উট-ঘোড়ার খাদ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জ্বলে গেছে সেনা ছাউনি ও বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ-সরঞ্জাম। রাতভর ছুটাছুটি করা ক্লান্ত-অবসন্ন উট ঘোড়াগুলো এখন লা-ওয়ারিশ ঘুরে ফিরছে দিগ্বিদিক। স্থানে স্থানে পড়ে আছে অসংখ্য মানুষের লাশ। রাতে উট-ঘোড়ার পায়ের তলায় পিষে মারা গেছে এরা। সেনাসদস্য ও বেগার ক্যাম্পের কয়েদীরা কূপ থেকে পানি তুলে আগুন নেভানোর কসরত চালিয়ে যাচ্ছে এখনো।
খৃস্টান নেতৃবর্গের এখনো ধারণা, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ শহরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোন আলামত। দুর্গের প্রাচীর পরীক্ষা করে দেখে তারা। কিন্তু কই, ইসলামী ফৌজ তো দেখা যাচ্ছে না দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত কোখাও। চারপার্শ্বে ঘোরাফেরা করছে শুধু খৃস্টান ফৌজ। এবার তদন্তের পালা, আগুন লাগল কিভাবে।
আগুন লাগানোর প্রাক্কালে মেয়েরা খঞ্জরের আঘাতে যে সেন্ট্রিকে হত্যা করেছিল, পাওয়া গেল তার মৃতদেহ। কিন্তু উট-ঘোড়ার পেষা খেয়ে লাশটি এমনভাবে থেতলে গেছে যে, খঞ্জরের জখম ধরা যাচ্ছে না। সেখান থেকে সমান্য দূরে পাওয়া গেল আরো চারটি লাশ- চারটি মেয়ের লাশ। খৃস্টানদের উট-ঘোড়া বাঁধার স্থানে পড়ে আছে লাশগুলো। তদন্ত করছেন গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
হরমুন লাশগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ান। তাকিয়ে আছেন অপলক নেত্রে। অশ্বক্ষুরের পেষা খেয়ে খেয়ে বিকৃত হয়ে গেছে লাশের মুখমন্ডল। অক্ষত নেই শরীরের কোন অংশ। লাশগুলো পড়ে আছে একটি থেকে আরেকটি দূরে দূরে। ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে পরিধানের পোষাক। রক্ত-মাটি মেখে আছে কাপড়গুলোতে। আসল রং বুঝবার কোন উপায় নেই। শুধু এতটুকু বুঝা যাচ্ছে যে, এগুলো মহিলার পোষাক। লাশ দেখেও বুঝা যায় যে, এরা নারী। সব কজনের সমস্ত দেহের চামড়া ছিলে গেছে। গোশত আলগা হয়ে গেছে কোন কোন স্থানে। হাড় দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। প্রতিটি লাশের গলায় একটি করে চেইন। চেইনের সঙ্গে বাঁধা আছে একটি ছোট্ট ক্রুশ। ক্রুশ প্রমাণ করছে মেয়েগুলো খৃস্টান।
