আগুন বিস্তার লাভ করছে। ঘোড়াগাড়ী, রসদের স্তূপ আরো নানা রকম সরঞ্জাম। এগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা আবশ্যক। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি নেই! আশ-পাশে না আছে পুকুর, না আছে নদী-খাল। বেশ দূরে দুচারটি কূপ আছে বটে, কিন্তু পানি তুলে আনার লোক যে নেই! নগরবাসী কেউ তো এগিয়ে আসেনি। তাদের কেউ নিজ ঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছে, কেউ বা পালাচ্ছে। ফটক তো ভোলা। বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে লোকজন বেরিয়ে যাচ্ছে শহর থেকে। সেনাবাহিনী তলব করা হল। এর মধ্যে একজনের মনে পড়ে গেল বেগার ক্যাম্পের মুসলমানদের কথা। ওদেরকে কাজে লাগানো যেতে পারে। নির্দেশ দেয়া হল, বেগার ক্যাম্পের কয়েদীদের নিয়ে আস। ঘোষণা দাও, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে কাল সকালেই তাদের মুক্তি দেয়া হবে।
বাইরের কোলাহলে জেগে উঠেছিল কয়েদীরা। লাঠিপেটা করে করে তাদের শুয়ে যেতে বলছে সেন্ট্রি। এর মধ্যে ঘোষণা দেয়া হল, কয়েদীদের আগুন নেভানোর জন্য নিয়ে চল। অভিযানে সফল হলে সকালে মুক্তি দেয়ার ঘোষণাও শোনানো হল।
আফাকও আছে তাদের মধ্যে। জখমের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে সে। ঘোষণা শুনে আফাক এক কয়েদীকে বলল, খৃস্টানদের গোটা সাম্রাজ্য পুড়ে গেলেও আমি আগুন নেভাতে যাব না। বেটারা পেয়েছে কি?
পাগল নাকি!- বলল কয়েদী-ওরা ঘোষণা করেছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে দিতে পারলে কাল সবাইকে মুক্ত করে দেবে। আমি জানি এটি সম্পূর্ণ ধোকা। কাফেররা মিথ্যা বলায় বড় পাকা। তবু তুমি আমাদের সঙ্গে চল, সুযোগ বুঝে পালিয়ে যেও। আমাদের পালাবার সুযোগ নেই। কারণ, ওরা আমাদের ঘর-বাড়ী চেনে। তুমি বেরিয়ে যাও।
কিন্তু যাব কোথায়? আফাকের কণ্ঠে হতাশা।
কয়েদী আফাককে নিজের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বলল, সুযোগমত আমি তোমাকে আমার ঘরে নিয়ে রেখে আসব। কিন্তু সেখানে বেশী দিন থাকবে না। খৃস্টানরা জানতে পারলে আমার গোটা পরিবারকে তছনছ করে দেবে।
আগুন নিভানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয় কয়েদীদের। দলে দলে বিভক্ত করে বিভিন্ন কূপে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাদের। সেনা সদস্যরা কূপ থেকে মশক ভরে ভরে পানি তুলে দিচ্ছে আর তারা পানি নিয়ে নিয়ে আগুনের উপর ছিটিয়ে দিচ্ছে। দুএক চক্কর তাদের সঙ্গে যাওয়া-আসা করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেন্ট্রি। দ্রুত দৌড়াদৌড়ি করে কিছুক্ষণ পানি বহন করার পর নির্জীব হয়ে পড়ে, বলহীন কয়েদীরা। ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেনাসদস্যরাও। বেহাল হয়ে পড়ে সবাই। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ভীত-সন্ত্রস্ত খৃস্টান কমান্ডার অশ্লীল ভাষায় গালি দিতে শুরু করে সকলকে। হঠাৎ একদিক থেকে ছুটে আসে আতংকিত একপাল ঘোড়া। আগুন নির্বাপনকারী কয়েদী ও সেনাসদস্যরা পড়ে যায় ঘোড়াগুলোর কবলে। এদিক-ওদিক পালাতে শুরু করে তারা। ঘোড়র পায়ের তলায় পিষ্টও হয় অনেকে। এ সুযোগে আফাককে সঙ্গে করে কেটে পড়ে সেই পুরাতন কয়েদী।
শহরের মুসলমানদের মনে কোন শংকা নেই। তারা জানে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ এসে পড়েছে। আফাককে নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায় কয়েদী। ঘরের সব মানুষ জাগ্রত। তাকে দেখে আনন্দিত হয় সকলে। কিন্তু সে আফাককে তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলে, একে আপাততঃ লুকিয়ে রাখুন এবং অল্প সময়ের মধ্যে শহর ত্যাগ করে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। খৃস্টানরা ওয়াদা দিয়েছে, কাল সকালে আমাদের মুক্তি দেবে। একে এখনো কেউ চেনে না, এসেছে মাত্র একদিন হতে চলল। আমি থেকে গেলে আমার কারণে হয়ত ক্যাম্পের একজনও মুক্তি পাবে না।
আচ্ছা, সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ নাকি শহরে ঢুকে পড়েছে, কথাটা কি সত্য? জিজ্ঞেস করে কয়েদীর পিতা।
জানি না- জবাব দেয় কয়েদী- আগুন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। ঠিক নেই, কবে নিভবে।
আমাদের ফৌজ যদি না-ই এসে থাকে, তাহলে আমরা এই ঝুঁকি মাথায় নেই কিভাবে? বললেন কয়েদীর পিতা।
ইনি নিজেই বের হয়ে যাবেন- কয়েদী বলল- কাল-ই ইনি এখান থেকে বেরিয়ে যাবেন।
না, এর ব্যাপারে আমাদের কোন ভয় নেই- কয়েদীর পিতা বললেন- এই একটু আগে তোমার ছোট ভাই দুটি মুসলিম মেয়েকে নিয়ে এসেছে। ও, সারেমের পুত্র ওসমান এবং তাদের আরো কয়েকজন সঙ্গী মিলে মেয়ে দুটোকে খৃস্টাদের রাজপ্রাসাদ থেকে উদ্ধার করে এনেছে। দুজনকে আমরা আমাদের ঘরে লুকিয়ে রেখেছি।
কারা ওরা? জিজ্ঞেস করে কয়েদী।
ওরা বলছে, গতকাল একটি কাফেলা থেকে খৃস্টানরা ওদেরকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছিল- পিতা জবাব দেন- ওদের এক ভাই নাকি বন্দী অবস্থায় আছে।
হঠাৎ চমকে উঠে আফাক। জিজ্ঞেস করে, কই, ওরা কোথায়?
.
খানিক পর।
দুবোনকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে আফাক। তিনজনের চোখেই আনন্দের অশ্রু। বুকভরা কৃতজ্ঞতা। সে এক আবেগঘন দৃশ্য। বাবা-মা মারা গেছেন খৃস্টান দস্যুদের হাতে। লুণ্ঠিত হয়ে বন্দী হয়েছিল তিন ভাই-বোন। সাহায্য করার মত কেউ ছিল না তাদের। ফরিয়াদ করেছিল আল্লাহর দরবারে। আল্লাহ তাদের আকুতি কবুল করেছেন। এই অবিশ্বাস্য মিলন ছিল তাদের কল্পনারও অতীত।
কয়েদী আর দাঁড়ায় না। দ্রুত বেরিয়ে পড়ে সে। আবার গিয়ে হাজিরা দিতে হবে তাকে বেগার ক্যাম্পে। বন্দীদশা থেকে পালাবার ইচ্ছে নেই তার।
