নেশা কেটে যায় লোকটির। বেরিয়ে আসে বাইরে। অন্য কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে অপরজনও। হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসে দুতিনজন লোক। ভয়জড়িত কাঁপা কণ্ঠে বলে, খড়ের গাদা-তাঁবু-ঘোড়াগাড়ীতে আগুন লেগে গেছে। ছুটন্ত উট-ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা গেছে কয়েকজন।
আগুন যদি লোকালয়ে, জনবসতিতে লাগত, তাহলে সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করত না এই শাসকমন্ডলী। কিন্তু এ অগ্নিকান্ড ঘটেছে যে তাদের ব্যারাকে, সামরিক সরঞ্জামে, সেনাছাউনিতে!
মুহূর্তের মধ্যে প্রাসাদে অবস্থানরত সকল সম্রাট, প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকর্তা যে যেখানে ছিল ছুটে যান ঘটনাস্থলে। নিজ তত্ত্বাবধানে আগুন নির্বাপিত করার চেষ্টা করছে তারা। প্রাসাদের চারপাশের ডিউটিরত সশস্ত্র প্রহরীরা ছুটে যায় পিছনে পিছনে। এমনি একটি মুহূর্তের-ই অপেক্ষায় বসে আছেন বারজিস ও ওসমান। উচ্চশব্দে হাঁক দেন বারজিস। চল বলে সংকেত দেন সহকর্মীকেঁদের। ছুটে যান প্রাসাদ অভিমুখে। সঙ্গে তাঁর ওসমান। পিছনে পিছনে ছুটে আসে অন্যরা। সকলের হাতে খঞ্জর।
প্রাসাদের অলিন্দে প্রবেশ করে বারজিস তার সেই দুসহকর্মীকে খুঁজতে শুরু করে, যারা খৃস্টান বেশে এখানে চাকুরী করছে। পাওয়া গেল একজনকে। বারজিস তাকে জিজ্ঞেস করেন, এই আজ যে মেয়ে দুটোকে আনা হল, ওরা কোথায়? বিষয়টি পরিস্কার জানা ছিল না লোকটির। তবু হাতের ইশারায় দেখিয়ে দেয় একটি কক্ষ। নিজেও সঙ্গে যান বারজিসের। প্রাসাদে দায়িত্বশীল কেউ নেই। প্রহরীরা যারা আছে, এদিকে তাদের কোন খেয়াল নেই। আগুনের তামাশা দেখতেই ব্যস্ত সকলে।
খৃস্টান সম্রাট-কর্মকর্তাদের উপভোগের জন্য ধরে আনা মুসলিম মেয়েরা যেসব কক্ষে অবস্থান করে, সেই কক্ষগুলোর দিকে এগিয়ে যান বারজিস। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কর্মচারী। অলিন্দে দন্ডায়মান কয়েকটি মেয়ে। তাদের কেউ কেউ অর্ধনগ্ন। বারজিস তাদের জিজ্ঞেস করেন, আজ যে দুটো মেয়েকে ধরে আনা হয়েছে, ওরা কোথায়? বলতে পারল না তারাও। অবশেষে একটি কক্ষে পাওয়া গেল একজনকে। বিহ্বলচিত্তে কক্ষে বসে আছে সে। ওসমান সারেম ও তার কয়েকজন সঙ্গী দিনের বেলা দেখেছিল মেয়েটিকে। বারজিসের দলটির সকলেই মুখোশপরিহিত। তাদের দেখে চীৎকার করে উঠে মেয়েটি। বারজিস তাকে জানায়, আমরা মুসলমান। আমরা তোমাদের দুবোনকে উদ্ধার করতে এসেছি। কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না সন্ত্রস্ত মেয়েটির। বারজিসের হাতে ধরা দিচ্ছে না সে। কিন্তু সময় তো আর নষ্ট করা যাবে না। বারজিস জোরপূর্বক তুলে নেয় মেয়েটিকে।
আরেক কক্ষে পাওয়া গেল অপর মেয়েটিকে। একই প্রতিক্রিয়া দেখায় সেও। আগন্তুকদের দস্যু মনে করে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে সে। জোর করে তুলে নেয়া হল তাকেও। এ দৃশ্য দেখে লোকগুলোকে ডাকাত ভেবে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায় পুরনো মেয়েরা। চীৎকার করছে নতুন দুজন। বারজিস রাগত স্বরে তাদের বললেন, চুপ কর হতভাগীরা! আমরা মুসলমান। আমরা তোমাদের মুক্ত করে নিয়ে যাচ্ছি! বড় কষ্টে মেয়ে দুটোকে থামানো হল। তাদের নিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেল জানবাজ মুসলিম কমান্ডোরা।
***
বড় ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে আগুন। লকলকিয়ে আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা। চারদিক ছড়িয়ে পড়েছে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত। আরো ছড়াচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। শহরময় প্রলয় সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে ধাবমান উট-ঘোড়াগুলো। জেগে উঠেছে গোটা শহর। পশুগুলোর পায়ে পিষ্ট হয়ে জীবন হারাবার ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেউ। প্রায়-বারশত উট-ঘোড়ার জ্ঞানশূন্য ছুটাছুটি যা তা ব্যাপার নয়। আগুনের ভয়ে ঘর ছেড়ে পালাবার প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে অনেকে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা আছে কার্কে। লোকগুলো সুযোগের সদ্ব্যবহারে বড় পাকা। তারা আগুন, উট-ঘোড়ার ছুটাছুটি ও হুলস্থুল কান্ড দেখে কি ঘটল, তার কোন তত্ত্ব-তালাশ না নিয়েই প্রচার করে দিল যে, সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী শহরে ঢুকে পড়েছে এবং শহরে আগুন লাগিয়ে চলছে।
এই খবর একদিকে যেমন মুসলমানদের জন্য আশাব্যঞ্জক ও সাহসবর্ধক, তেমনি ইহুদী-খৃষ্টানদের জন্য হতাশাব্যঞ্জক। আগুনের মতই মুহূর্তের মধ্যে শহরময় ছড়িয়ে পড়ে এ গুজব। পালাতে শুরু করে দেয় অমুসলিমরাও।
খৃস্টান সম্রাট ও কর্মকর্তাবৃন্দ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন কোন লোক নেই। তারাও ধরে নেন যে, মুসলিম বাহিনী দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। দুর্গের প্রতিরক্ষার জন্য তৎক্ষণাৎ তাদের বাহিনীকে সমরবিন্যাসে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। দুর্গের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য আদেশ দেন একদল সৈনিককে।
দু-তিনজন কমান্ডার দৌড়ে গিয়ে পাঁচিলের উপর উঠে তাকায় বাইরের দিকে। কিন্তু বাইরে কোন শব্দ-সাড়া নেই। কোন দিক থেকে আক্রমণ এসেছে বলে মনে হল না। রাতে দুর্গের ফটক খোলা হয় না কখনো। কিন্তু আজ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডো বাহিনী ভিতরে ঢুকে প্রলয় সৃষ্টি করেছে এই আশংকায় দুর্গের পিছনের ফটক খুলে দেয়া হল। এটি বাইরের আক্রমণের পূর্বাভাস। ঘটনা যদি এমন ই হয়ে থাকে, তাহলে আইউবীর বাহিনীও এগিয়ে আসছে নিশ্চয়। তাই শহর থেকে দূরেই তাদের প্রতিহত করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করতে হবে।
