.
এখনো সেন্ট্রি পর্যন্ত পৌঁছুতেই পারেনি মেয়েরা। সেন্ট্রির সঙ্গে মেয়েদের যেখানে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা, সেখানে কোন সেন্ট্রি নেই। সেন্ট্রিকে না পাওয়া আশংকার ব্যাপার। কারণ, আগুন লাগাতে হবে সেন্ট্রিকে হত্যা করে। অন্যথায় আগুন লাগানো অবস্থায় মেয়েদের হাতেনাতে ধরা পড়ার আশংকা আছে।
সেন্ট্রিকে খুঁজতে শুরু করে মেয়েরা। শুক্ননা খড়ের গাদার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তারা। অন্ধকারে তাঁবুর সারি চোখে পড়ছে না। চারজন হাঁটছে একত্রে। একস্থানে লাঠির মাথায় বাঁধা প্রদীপের শিখা দেখতে পায় তারা। এগিয়ে যায় সেদিকে। ঐ তো সেন্ট্রি। প্রদীপের কাছে সেন্ট্রিকে পেয়ে গেল মেয়েরা। প্রদীপের লাঠিটি মাটিতে গাড়া। সেন্ট্রি হাতে তুলে নেয় প্রদীপটি। এগিয়ে আসে মেয়েদের প্রতি। পথরোধ করে তাদের। সুসজ্জিত তিনটি সুন্দরী যুবতী মেয়ে। সঙ্গে একজন চাকরানী। মাথায় তার টুকরি। অল্পতে-ই কাবু হয়ে যায় সেন্ট্রি? প্রভাবিত হয়ে পড়ে মেয়েগুলোর প্রতি।
তোমরা কারা? যাচ্ছ কোথায়? জিজ্ঞেস করে সেন্ট্রি। কণ্ঠে তার নমনীয়তা।
মনে হয় আমরা ভুল পথে এসে পড়েছি- মুখে হৃদয়কাড়া হাসি টেনে বলল আন নূর- সম্রাট রেনাল্ডের দাওয়াতপত্র পেয়েছিলাম। কথা ছিল আমরা রাতে আসব। ঘর থেকে বের হতে দেরী হয়ে গেল। একজন বলল, এ পথটা নাকি সোজা। কিন্তু সামনে দেখছি ঘোড়া বাঁধা। পথ কোন্ দিকে? কোন্ দিকে যাব?
একজন সাধারণ সেন্ট্রিকে প্রভাবিত করতে সম্রাট রেনাল্ডের নাম-ই যথেষ্ট। খৃস্টান সম্রাটদের কার চরিত্র কেমন, সব তার জানা। রেনাল্ড যদি আমোদ করার জন্য এ মেয়েগুলোকে তলব করে থাকেন, তো বিচিত্র কিছু নয়। মেয়েগুলোর রূপ-লাবণ্য, পোষাক-পরিচ্ছদ, বয়স ও গঠন-আকৃতি সর্বোপরি আন-নূর এর নির্ভীক কণ্ঠ ও ভাব ভঙ্গি-ই প্রমাণ করছে যে, এরা তার বড় স্যারদের মতলবের মেয়ে।
রেনাল্ডের ভবনের পথ দেখাতে শুরু করে সেন্ট্রি। তার পিছনে চলে যায় একটি মেয়ে। নষ্ট করার মত সময় তাদের হাতে নেই। এমনিতেই সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে অনেক। খঞ্জরটা শক্ত করে ধারণ করে সে। নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তীব্র এক আঘাত হানে সেন্ট্রির পিঠে। এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায় সেন্ট্রির দেহ। হৃদপিন্ড ভেদ করে খঞ্জরটা বেরিয়ে যায় সামনে দিয়ে। হাতের মশালটা ছুটে পড়ে যায় তার। দুপা দ্বারা পিষ্ট করে প্রদীপের আগুন নিভিয়ে ফেলে আন-নূর। সেন্ট্রি লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। আঘাত হানে অন্য মেয়েরাও। আহ! বলার সুযোগও দেয়া হল না লোকটাকে। দম যেতে সময় লাগল না তেমন।
বারজিস বলেছিলেন, শুকনো খড়ে আগুন ধরে গেলে তার আলোতে সেনা ছাউনির সারি ও গাড়ির বহর চোখে পড়বে। খড়ের গাদাগুলো দেখা যাচ্ছে অন্ধকারে-ই। চাকরানীবেশী মেয়েটি টুকরিটা নামায় মাথা থেকে। তাতে আগুন লাগাবার সরঞ্জাম। ডিবায় ভরা কেরসিন, দেয়াশলাই ইত্যাদি।
প্রথমে তারা খড়ের একটি গাদায় আগুন ধরায়। তারপর আরেকটিতে, তারপর আরো একটিতে। এভাবে সবগুলোতে। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠে সবগুলো খড়ের গাদায়। আলোকিত হয়ে উঠছে চারদিক। ঐ তো ছাউনিগুলো দেখা যায়, ঐ তো গাড়ির বহর। এবার তারা দেখতে পাচ্ছে সবকিছু।
তাঁবুগুলো কাপড়ের তৈরী। গাড়ীগুলোও একটার সঙ্গে একটা লাগানো। মেয়েগুলো দ্রুত দৌড়ে যায় সেদিকে। আগুন ধরিয়ে দেয় তাবুতে। জ্বলে উঠে কাপড়ের তাঁবুগুলো। অস্বাভাবিক আনন্দের ঢেউ জেগে উঠে মেয়েগুলোর মনে। তিন চারটি গাড়ীতে কেরসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তাতেও।
এতক্ষণে আকাশ ছুঁয়ে যেতে শুরু করেছে খড়ের আগুন। মেয়েগুলো দৌড়ে যায় ঘোড়ার আস্তাবলের দিকে। এখনো সজাগ হয়নি কেউ। মেয়েরা খঞ্জর দ্বারা কেটে দেয় ঘোড়ার রশিগুলো। এক রশিতে চল্লিশ-পঞ্চাশটি করে ঘোড়া বাঁধা। কাজেই সময় বেশী ব্যয় হল না। কয়েকটি ঘোড়ায় খঞ্জরের আঘাত হানে তারা। চীৎকার করে উঠে ঘোড়াগুলো। ভয়ানক শব্দে হ্রেষাধ্বনি দিয়ে ছুটাছুটি করতে শুরু করে পশুগুলো। উটগুলো আগে থেকেই খোলা। আগুনের লেলিহান শিখা আর ঘোড়ার ডাক-চীৎকার ছুটাছুটি দেখে এলোপাতাড়ি ছুটতে শুরু করে সেগুলোও। বলতে না বলতে এক প্রলয়কান্ড ঘটে যায় সেখানে।
ছুটন্ত উট-ঘোড়র কবলে পড়ে গেল মেয়ে চারটি। প্রজ্বলিত আগুনের তাপে দূর থেকে পুড়ছে তাদের দেহ। পশুগুলোর ডাক-চীৎকার আর পদশব্দে জেগে উঠে সৈন্যরা।
***
বধূসাজে সাজানো হল অপহৃতা মেয়ে দুটোকে। একই সময়ে একজন একজন করে পুরুষ প্রবেশ করে তাদের কক্ষে। এরা খৃস্টানদের সামরিক কর্মকর্তা। নেশাগ্রস্ত। পানশালা থেকে বেরিয়ে এসেছে এইমাত্র। সেবিকারা বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে।
হঠাৎ ভয়ে আতংকিত হয়ে উঠে মেয়ে দুটো। হায়েনার কবল থেকে পালাবার পথ খুঁজতে শুরু করে তারা। এই মুহূর্তে একমাত্র আল্লাহ-ই তাদের ইজ্জতের হেফাজতকারী।
হাটু গেড়ে বসে পড়ে এক মেয়ে। হাতজোড় করে, কেঁদে কেঁদে সাহায্য প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে লোকটি। লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায় মেয়েটির প্রতি…।
হঠাৎ বাইরে গোলযোগের শব্দ শুনতে পায় সে। অস্বাভাবিক এক শোরগোল, ডাক-চীৎকার। দরজা ফাঁক করে তাকায় বাইরের দিকে। একি! শহরে আগুন লেগে গেছে মনে হয়! কি ব্যাপার, উট-ঘোড়াগুলো এভাবে ছুটাছুটি করছে কেন!
