এক এক করে প্রাসাদের পানশালায় এসে উপস্থিত হয় সকলে। আসর জমে উঠে। আজকের আলোচ্য বিষয় অপহৃতা নতুন দুই মুসলিম নারী আর কাফেলা-লুষ্ঠিত সম্পদ। মেয়ে দুটো আর কী কাজে আসতে পারে, জিজ্ঞেস করে একজন। জবাবে সেনা কমান্ডার বলে, এরা পরিণত বুদ্ধির মেয়ে। গুপ্তচরবৃত্তি ইত্যাদিতে এদের ব্যবহার করা যাবে না। একজনের বয়স ষোল-সতের, অপর জনের বাইশ-তেইশ। কিছুদিন আনন্দ-উপভোগে-ই ব্যবহার করা যেতে পারে শুধু।
তারপর দুজন সামরিক অফিসারের হাতে তুলে দিলেই হবে। তারা এদের বিয়ে করে নেবেন। বলল পদস্থ এক সেনা অফিসার।
আসরে হাসি-ঠাট্টা আর অশ্লীল আলোচনা চলছে অপহৃতা এই দুটো মুসলিম মেয়েকে নিয়ে। ঠাট্টা চলছে ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে। মেয়ে দুটো অবস্থান করছে আলাদা আলাদা দুটি কক্ষে। কাঁদতে কাঁদতে বেহাল হয়ে যাচ্ছে তারা। একজনের অবস্থা জানে না অন্যজন। দুজনের কাছে দুজন সেবিকা। মধ্যবয়সী মহিলা। মেয়ে দুটোকে গোসল করিয়েছে তারা। এখন রাতের পোশাক পরাচ্ছে। সাজাচ্ছে বধূসাজে। সেই থেকে কিছু-ই মুখে দেয়নি তারা। সামনে পড়ে আছে এমন এমন খাবার, যা এর আগে তারা কখনো স্বপ্নেও দেখেনি। কিন্তু তা ছুঁয়েও দেখেনি তারা।
দুবোনের কে কোথায় আছে, কি হালে আছে, জানে না অপরজন। দুজনকে স্বপ্নের সবুজ বাগান দেখাচ্ছে সেবিকারা। একজনকে বলা হল, ফ্রান্সের সম্রাট তোমাকে পছন্দ করেছেন। তুমি হবে রাণী। অপরজনকে বলা হল, জার্মানীর রাজার তোমাকে মনে ধরেছে, জীবনটা বদলে যাবে তোমার। পাশাপাশি সাদরে হুমকিও দেয়া হচ্ছে তাদের যে, সম্রাটদের যদি অসন্তুষ্ট কর, তাহলে তোমাদেরকে সৈন্যদের হাতে তুলে দেয়া হবে।
মেয়ে দুটো মরু অঞ্চলের বাসিন্দা। ভীরু নয়। কিন্তু এখন তো অসহায়-নিরূপায়। আত্মরক্ষার জন্য কিছুই করার নেই তাদের। তাদের ইজ্জত রক্ষা করার-ই জন্য তাদের বাবা-মা ও বড় ভাই তাদের নিয়ে খৃস্টান অধ্যুষিত এলাকা ছেড়ে হিজরত করছিল। কিন্তু খৃস্টান হায়েনাদের-ই ফাঁদে পড়ে গেল তারা। বাবা-মা মারা গেলেন। ভাই বন্দী হল। আর তারা এসে পড়ল খৃস্টান সম্রাটদের হাতে। এখন তাদের সাহায্য করার আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। বন্দীদশা থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগও দেখছে না তারা। বসে বসে তারা কাঁদছে, চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছে আর আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছে। ভাই আফাকের জন্যও অস্থির তারা। বেগার ক্যাম্পে ছটফট করছে আফাক। আফাক আহত। খৃস্টানরা খুব পিটিয়েছে তাকে।
আগের কয়েদীরা নিত্যদিনের খাটুনির পর ফিরে এসেছে ক্যাম্পে। নতুন বন্দীদের দেখতে পায় তারা। তাদের কাহিনী শোনে। সব কজনের মধ্যে আফাক-ই শুধু আহত। এ পর্যন্ত কেউ তার ব্যান্ডেজ করেনি। মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে আফাক। পুরাতন কয়েদীরা রাতে আফাকের জখম পরিস্কার করে। লুকিয়ে রাখা কিছু ঔষধ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেয় তাতে।
***
শরীরে এতগুলো জখম। কিন্তু কোন ব্যাথা অনুভব হচ্ছে না আফাকের। নিজের কথা ভুলে গিয়ে ভাবছে শুধু বোনদের কথা। বোন দুটো কোথায় থাকতে পারে কয়েদীদের কাছে জানতে চায় আফাক। এখান থেকে কিভাবে পালানো যায়, তাও জিজ্ঞেস করে। বোনরা কোথায় থাকতে পারে, তাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ হয়ে থাকতে পারে, আফাককে স্পষ্ট ধারণা দেয় কয়েদীরা। কয়েদীরা তাকে জানায়, এ বন্দীশালার কোন দেয়াল নেই। কারো পায়ে বেড়ীও পরানো হয় না। তারপরও কেউ এখান থেকে পালাতে পারে না। কারণ, এখানে সারাক্ষণ প্রহরা থাকে। তাছাড়া কেউ পালাতে পারলেও যাবে কোথায়। কোথাও না কোথাও ধরা পড়তেই হবে। পালাবার পর ধরা পড়লে এমন যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুবরণ করতে হবে, যা কল্পনাও করা যায় না। আফাককে জানানো হয়, এখানে বছরের পর বছর ধরে এমন অনেক কয়েদী পড়ে আছে, যারা কার্কের বাসিন্দা ছিল। কিন্তু পালাবার কোন সাহস তারা করতে পারছে না। তারা জানে যে, পালাবার পর যদি তারা ধরা না পড়ে, তাহলে তাদের গোটা পরিবার বন্দীশালায় নিক্ষিপ্ত হবে। কিন্তু এতসব অপারগতা ও আশংকা সত্ত্বেও নিজের পলায়ন ও বোনদের উদ্ধারের কথা ভাবছে আফাক। অথচ, উঠে দাঁড়াবার শক্তিও নেই তার দেহে। সারাদিনের ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত কয়েদীরা শুয়ে পড়ে। গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায় তারা। জেগে আছে শুধু আফাক।
***
মেয়েগুলো ধরা না পড়লেই হল। ফিসফিস্ করে বলল ওসমান সারেম।
আল্লাহকে স্মরণ কর ওসমান!- বারজিস বললেন- এ মুহূর্তে আমরা মৃত্যুর মুখে আছি। মন থেকে সব ভীতি ঝেড়ে ফেল, আল্লাহকে স্মরণ কর…….। আচ্ছা অপর মেয়েগুলোর উপর তোমার আস্থা কতটুকু?
একশ ভাগ-ওসমান বলল- এ ব্যাপারে আপনার ভাবতে হবে না। আমি ভাবছি, ওরা ধরা পড়ে যায় কিনা!
আল্লাহ আল্লাহ কর-বারজিস বললেন-আমরা চুরি করতে আসিনি। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।
অপহৃত মেয়ে দুটোকে যে প্রাসাদে রাখা হয়েছে, তার থেকে সামান্য দূরে ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে আছে ওসমান সারেম ও বারজিস। তার-ই সামান্য ব্যবধানে নির্দেশের অপেক্ষায় কানখাড়া করে বসে আছে তাদের অন্য সাথীরা। কোন্ সংকেতে কি করতে হবে, তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে আগেই।
ফৌজি সরঞ্জাম ও খড়ের গাদায় আগুন দিতে পাঠানো হয়েছে যে চারটি মেয়েকে, তাদের নিয়ে উদ্ধিগ্ন হয়ে পড়েছে ওসমান সারেম। বোন আন-নূরও তাদের একজন। এতক্ষণে আগুন ধরে যাওয়ার কথা। পরিকল্পনা সফল হলে আগুনের শিখা উঠবে, ছড়িয়ে পড়বে চারদিক। প্রাসাদের সব সম্রাট-কমান্ডার ছুটে যাবে সেদিকে। এ সুযোগে প্রাসাদে ঢুকে পড়ে মেয়ে দুটোকে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে ওসমান ও তার সঙ্গীরা। কিন্তু মেয়েরা গেল অনেক সময় হল। বোধ হয় সেন্ট্রি পথরোধ করে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।
